সরকারি শ্রমিক-কর্মচারীদের বাসা সংস্কার

নাটোরে কাজ না করেই প্রকল্পের টাকা উত্তোলন

চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের কোয়ার্টার (বাসা) ও একটি মেকানিক্যাল শেড সংস্কারের জন্য ২০১৯-২০ অর্থবছরে দুটি প্রকল্প গ্রহণ করে নাটোর সড়ক ও জনপথ বিভাগ। এর মধ্যে একটি প্রকল্পের আওতায় ১০টি কোয়ার্টার সংস্কারের জন্য বরাদ্দ দেয়া হয় ১৯ লাখ টাকা।

চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের কোয়ার্টার (বাসা) ও একটি মেকানিক্যাল শেড সংস্কারের জন্য ২০১৯-২০ অর্থবছরে দুটি প্রকল্প গ্রহণ করে নাটোর সড়ক ও জনপথ বিভাগ। এর মধ্যে একটি প্রকল্পের আওতায় ১০টি কোয়ার্টার সংস্কারের জন্য বরাদ্দ দেয়া হয় ১৯ লাখ টাকা। অন্য প্রকল্পের আওতায় সওজের অফিস চত্বরে স্থাপন করা শেডের সংস্কারের জন্য ১৫ লাখ ৬০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। কিন্তু কোয়ার্টার সংস্কারের জন্য বরাদ্দকৃত টাকা কাজ না করেই উত্তোলন করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পের ঠিকাদারের যোগসাজশে শুধু কাগজ-কলমে শ্রমিক-কর্মচারীদের কোয়ার্টার সংস্কার দেখিয়ে প্রকল্পের ১৯ লাখ টাকা উত্তোলন করেন উপবিভাগীয় প্রকৌশলী (এসডি) ইউনুস আলী। এছাড়া মেকানিক্যাল শেড সংস্কার প্রকল্পের যে কাজ হয়েছে, তা নিয়েই ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এ প্রকল্পে ৬৫০ টাকার একটি টিনের দাম ধরা হয় ৫ হাজার টাকা। এছাড়া সরকারি অফিসের অন্তত ১০টি গাছ কাটার পাশাপাশি গাড়ি ব্যবহার নীতিমালা ভঙের অভিযোগও রয়েছে ওই প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে।

নাটোর সড়ক ও জনপথ বিভাগের অফিস চত্বরের উত্তর পাশে পরিবার-পরিজন নিয়ে সরকারি কোয়ার্টারে বসবাস করেন সওজের চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী সাজ্জাদ হোসেন। কম ভাড়া হওয়ার কারণে পরিবার-পরিজন নিয়েই জরাজীর্ণ ভবনে বসবাস করে আসছেন তিনি। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে কোয়ার্টার সংস্কার না হওয়ার কারণে চরম দুর্ভোগের মধ্যে বসবাস করতে হচ্ছে তাদের। টিনের চালা ফুটো থাকায় সামান্য বৃষ্টিতেই পরিবারের সবাইকে নিয়ে এক কোনায় থাকতে হয়।

সাজ্জাদ হোসেন বলেন, কোয়ার্টার সংস্কারের জন্য একাধিকবার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বলা হয়েছে। কিন্তু সংস্কার না হওয়ায় চরম দুর্ভোগের মধ্যে দিন পার করতে হচ্ছে।

সাজ্জাদ হোসেনের স্ত্রী বলেন, ঘরের চালার সব টিন ফুটো হওয়ার কারণে বৃষ্টির সময় চারদিক দিয়ে পানি পড়ে। তখন বসে থেকে রাত কাটাতে হয়। গত এক বছরের মধ্যে আমাদের কোনো ঘর সংস্কার করা হয়নি।

অনুসন্ধানে জানা যায়, সওজের কর্মচারীদের কোয়ার্টার সংস্কারের জন্য গত ১৪ মে স্থানীয় একটি পত্রিকায় ১৯ লাখ টাকার টেন্ডার দেয় সওজ বিভাগ। কিন্তু সংস্কারকাজ না করেই পুরো টাকা তুলে নেন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আলী কনস্ট্রাকশন কোম্পানির ঠিকাদার আলী হোসেন মিন্টু। তবে ঠিকাদার মিন্টু ঠিকাদার হলেও পুরো টাকা যায় এসডি ইউনুস আলীর পকেটে। কোয়ার্টারের সংস্কারকাজ না করায় বর্তমানে জরাজীর্ণ ভবনেই পরিবার নিয়ে বসবাস করতে হচ্ছে চতুর্থ শ্রেণীর ১০ কর্মচারীকে।

এ বিষয়ে ঠিকাদার আলী হোসেন মিন্টু বলেন, কাজ করেই টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। কোনো অনিয়ম করা হয়নি। তবে ঠিকাদারের এ কথার পরিপ্রক্ষিতে প্রতিবেদক সরেজমিন ঘুরে কোয়ার্টার সংস্কারের সত্যতা না পাওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে কোনো উত্তর দেননি তিনি।

এদিকে সওজের ল্যাব ও মেকানিক্যাল শেড সংস্কারের জন্য একই অর্থবছরে ১৫ লাখ ৬০ হাজার টাকার কাজের টেন্ডার আহ্বান করেন উপবিভাগী প্রকৌশলী ইউনুস আলী। গত ২ ফেব্রুয়ারি একটি ইংরেজি পত্রিকায় টেন্ডার বিজ্ঞপ্তিটি প্রকাশ করা হয়। ল্যাব ও মেকানিক্যাল শেড সংস্কারের কাজটি পান মেসার্স গোলাপ কনস্ট্রাকশনের ঠিকাদার গোলাপ উদ্দিন আহমেদ।

সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, ল্যাব ও মেকানিক্যাল শেডের শুধু পুরনো টিন পরিবর্তন করা হয়েছে। অন্তত ৩০০ নতুন টিন লাগানো হয়েছে। এছাড়া আর কোনো কাজ করা হয়নি। অথচ প্রকল্পের পুরো টাকাই উত্তোলন করা হয়েছে। শেডে পিএইচপি কোম্পানির যে টিন ব্যবহার করা হয়েছে, তার বাজারমূল্য (এক বান্ডেল) ৪ হাজার ৫০০ টাকা। সে হিসেবে প্রতিটি টিনের (এক বান্ডেলে সাত পিস টিন) দাম আসে ৬৫০ টাকার মতো। সেক্ষেত্রে প্রকল্পে টিন বাবদ ১ লাখ ৯৫ হাজার টাকা খরচ হওয়ার কথা। কিন্তু সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার ও প্রকৌশলী প্রতিটি টিনের দামই দেখিয়েছেন ৫ হাজার টাকা করে।

এ বিষয়ে ঠিকাদার গোলাপ উদ্দিন আহমেদ বলেন, তিনি কাজ করেই টাকা উত্তোলন করেছেন। কোনো অনিয়ম করেননি।

৬৫০ টাকার টিনের মূল্য ৫ হাজার টাকা দেখানোর বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে কোনো উত্তর দেননি তিনি। তবে তিনি এসডি ইউনুস আলীর মাধ্যমে কোনো টাকা উত্তোলন করেননি বলে দাবি করেছেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দুটি প্রকল্পে অনিয়মের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন নাটোর সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী ইউনুস আলী। ঠিকাদারের সহযোগিতায় প্রকল্প দুটিতে অনিয়ম করে হাতিয়ে নিয়েছেন ৩৫ লাখ টাকা। শুধু প্রকল্প নয়, সওজের অফিস চত্বরের টেন্ডার ছাড়াই অন্তত ১০টি গাছ কাটার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া সরকারি গাড়ি ব্যবহার করে প্রতিদিন রাজশাহী থেকে নাটোরে যাতায়াত করেন তিনি। এতে সরকারি তেল অপচয় করার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

এসব অভিযোগের বিষয়ে নাটোর সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের উপবিভাগী প্রকৌশলী ইউনুস আলী বণিক বার্তাকে বলেন, প্রকল্প দুটিতে কোনো অনিয়ম করা হয়নি। নিয়ম অনুযায়ী প্রকল্পের কাজ হয়েছে। কোনো টাকা কাজের আগে উত্তোলন করা হয়নি। সরেজমিন কোয়ার্টার সংস্কারের সত্যতা না পাওয়ার বিষয়ে তাকে প্রশ্ন করা হলে তিনি এড়িয়ে যান।

গাছ কাটার বিষয়ে তিনি বলেন, অফিস চত্বরের কোনো গাছ কাটা হয়নি। ঝরে পড়া গাছগুলো শুধু সরিয়ে নেয়া হয়েছে। ওই প্রকল্প দুটি যখন বাস্তবায়ন করা হয় তখন সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী ছিলেন নওজিস রহমান বিশ্বাস। এ বিষয়ে তার বক্তব্য জানতে একাধিকবার তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সাড়া দেননি।

এ বিষয়ে নাটোর সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুর রহিম বলেন, উপবিভাগীয় প্রকৌশলী (এসডি) ইউনুস আলীর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

আরও