জনসংখ্যার ঘনত্ব শহরকে মহামারীর ঝুঁকিতে ফেলে না

কভিড-১৯ মহামারীর শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু নেতা ও পণ্ডিত নিউইয়র্ক, মিলান ও উহানে ভাইরাসের বিস্তৃতির হটস্পট হওয়ার জন্য জনসংখ্যার ঘনত্বকে দায়ী করেন। কিন্তু কেবল এ জনঘনত্বই যুক্তরাষ্ট্রে সংক্রমণের অবস্থা সম্পর্কে উপযুক্ত চিত্র তুলে ধরতে পারে না। যেখানে নতুন করোনাভাইরাস শহুরে এলাকা থেকে শুরু করে গ্রামাঞ্চলেও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে।

কভিড-১৯ মহামারীর শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু নেতা ও পণ্ডিত নিউইয়র্ক, মিলান ও উহানে ভাইরাসের বিস্তৃতির হটস্পট হওয়ার জন্য জনসংখ্যার ঘনত্বকে দায়ী করেন। কিন্তু কেবল এ জনঘনত্বই যুক্তরাষ্ট্রে সংক্রমণের অবস্থা সম্পর্কে উপযুক্ত চিত্র তুলে ধরতে পারে না। যেখানে নতুন করোনাভাইরাস শহুরে এলাকা থেকে শুরু করে গ্রামাঞ্চলেও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে।

অনেক জনস্বাস্থ্য ও নগর পরিকল্পনাবিদ একমত পোষণ করেছেন যে নির্দিষ্ট অঞ্চলের মানুষের ওপর মনোযোগ দেয়া পুরো গল্পটির আসল রূপ তুলে ধরে না। এ সময় তারা উদাহরণ দিয়ে হংকং, সিউল ও তাইপের কথা বলেন। যেখানে দৃঢ় ও বিস্তৃত হস্তক্ষেপের ফলে (যেমন সামাজিক দূরত্ব, মাস্ক পরা ও কন্টাক্ট ট্র্যাকিং) সফলতার সঙ্গে কভিড-১৯-এর সংক্রমণ ও এতে মৃত্যুর হারকে সীমিত রাখা সম্ভব হয়েছে। পাশাপাশি মহামারীকে লক্ষ্য করে চালিত হওয়া গবেষণাগুলো অন্যান্য ফ্যাক্টর যেমন সম্প্রদায়গুলোর মাঝে যোগাযোগ, স্বাস্থ্যসেবায় প্রবেশযোগ্যতা এবং ছোট এলাকায় গিয়ে ভিড় করার বিষয়গুলোও রোগের বিস্তৃতিকে কীভাবে প্রভাবিত করতে পারে, তা নিয়ে আলোকপাত করেছে।

পরিবেশবিষয়ক স্বাস্থ্য গবেষক দীপ্তি আদলাখা বলেন, মহামারীর শুরুর দিনগুলো থেকেই বেশকিছু আর্টিকেল সামনে এসেছিল, যেখানে অনুমান করা হচ্ছিল কভিড-১৯ শহরগুলোর অবসান ঘটাবে। যদিও শুরু থেকেই বিষয়টি আমার কাছে ভুল বলে মনে হচ্ছিল।

একটি বিষয় হচ্ছে একটি শহরের জনসংখ্যা ঘনত্ব এটা তুলে ধরে না যে কীভাবে মানুষ ছোট ছোট জায়গার মাঝে জড়ো হয়। যেমন কলেজের অভ্যন্তরে কিংবা স্বতন্ত্র আবাসিক বিল্ডিংগুলোতে। পরিবেশবিষয়ক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ সীমা হামিদি বলেন, বেশির ভাগ মানুষ যখন ঘনত্ব এবং কভিড-১৯ নিয়ে কথা বলে তারা আসলে কথা বলে ভিড় নিয়ে। হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির আন ফোরসিথ উল্লেখ করেন, কোনো কোনো সময় ভিড় তৈরি হয় যখন মানুষ কোনো একটি আয়োজনে হাজির হয় যেমন কনসার্ট কিংবা পার্টি। এ সমাবেশ আর্থসামাজিক পরিস্থিতির একটি ফলাফলও বটে, যা কিনা মানুষকে ছোট জায়গায় থাকতে বাধ্য করে। বাস ও যাতায়াতের অন্য ক্ষেত্রগুলোও ভিড়সম্পন্ন হয়ে উঠতে পারে। এমনকি ছোট মফস্বলীয় এলাকায়ও।

ভিড়সম্পন্ন প্রতিটি পরিস্থিতি বিস্তৃত ভাইরাল ট্রান্সমিশনের দিকে চালিত করে না। কিন্তু কোনো কোনোটা আবার সুপারস্প্রেডার ইভেন্ট হয়ে উঠতে পারে। যেমনটা যুক্তরাষ্ট্রে হয়েছিল। এখানে কানেকটিকাটের একটি হাউজ পার্টি, বোস্টন হোটেলের একটি বায়োটেক কনফারেন্স, আরকানসাস চার্চে একটি বাইবেল স্টাডি এবং জর্জিয়া ও মিসৌরিতে একটি ক্যাম্প সুপারস্প্রেডারের ভূমিকা নিয়েছিল। নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটির এপিডেমিওলজিস্ট লোরনা থর্প বলেন, ভাইরাস বেশ কার্যকরভাবে জনগণের মাঝে ছড়াতে পারে। এটা সব সময় ঘটতে দেখা যায় না। কিন্তু এটা ঘটতে পারে।

উচ্চঘনত্বসম্পন্ন শহর হয়তো ভিড় সংগঠিত হওয়ার জন্য অনেক বেশি সুযোগ দিতে পারে। কিন্তু এশিয়ায় যথাযথ জনস্বাস্থ্য সতর্কতা অনেকগুলো বড় শহরকে খারাপ অবস্থা থেকে রক্ষা করেছে। এমনকি ব্যাপকভাগে ক্ষতির মুখে পড়া নিউইয়র্কের ম্যানহাটনও জনসংখ্যার উচ্চঘনত্ব থাকার পরও কভিড-১৯ নিম্ন হার বজায় রাখতে পেরেছে। অন্যদিকে কুইন্স ও ব্রংকসের মতো কিছু কম ঘনত্বসম্পন্ন প্রতিবেশী এলাকা উচ্চহারে সংক্রমণ ও মৃত্যু দেখেছে।

হামিদি কিছু ফ্যাক্টরের দিকে দৃষ্টি দিয়েছেন—মহানগরের আকার, নাগরিকদের আর্থসামাজিক অবস্থা, স্বাস্থ্যসেবার মান ও সামাজিক দূরত্ব মানা না মানা। তিনি এবং তার সহকর্মীরা বিশ্লেষণ করে দেখেছেন যে ঘনত্বের সঙ্গে সংক্রমণের হারের কোনো উল্লেখযোগ্য সম্পর্ক নেই। এমনকি উচ্চঘনত্বসম্পন্ন অনেক রাজ্য নিম্ন মৃত্যুহারের সঙ্গে জড়িত। এর কারণ হতে পারে নাগরিকরা বেশ কঠোরতার সঙ্গে সামাজিক দূরত্বের নীতিগুলো মেনে চলছে কিংবা স্বাস্থ্যসেবা তাদের জন্য অধিক উপলব্ধ। স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদ ব্রুক নিকোলস বলেন, যদি আপনি কভিড-১৯ থেকে সুরক্ষিত থাকার জন্য গ্রামীণ এলাকায় যাওয়ার কথা ভাবেন, সম্ভবত এটা আপনাকে সাহায্য করবে সেখানে আপনি কম মানুষের সংস্পর্শে আসবেন সেজন্য। কিন্তু মৃত্যুর দিক বিবেচনায় আপনি হয়তো উচ্চঝুঁকিতে আছেন, কারণ সেখানকার সেবা হয়তো আপনার স্বাস্থ্য রক্ষায় সঠিকভাবে সাহায্য করতে পারবে না।

সংক্রমণের হারের একটি উল্লেখযোগ্য কারণ হতে পারে মহানগরের আকার। যা গভীরভাবে যুক্ত থাকে সম্প্রদায়, যাতায়াত, আবাসন ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের সঙ্গে। আর এ ধরনের যোগাযোগ সম্প্রদায়গুলোর মাঝে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এখানে দেখায় যে বড় আকারে নগর উচ্চমাত্রার সংক্রমণ ও মৃত্যুর সঙ্গে যুক্ত, যেখানে জনসংখ্যার উচ্চঘনত্ব (বিভ্রান্তিকর ফ্যাক্টরগুলো বাদ দিয়ে) একই সময়ে নিম্ন সংক্রমণ ও মৃত্যুহারের সঙ্গে যুক্ত।  

এখনো বিশেষজ্ঞরা সংক্রমণের ঝুঁকির ওপর উচ্চঘনত্বের সম্ভাব্য প্রভাবকে উড়িয়ে দিচ্ছেন না। বায়োস্ট্যাটিস্টিশিয়ান লরা হোয়াইট বলেন, এটা বলা বিস্ময়কর কোনো সিদ্ধান্ত হবে না যে যদি আপনি ঘনবসতিপূর্ণ শহরে থাকেন তবে সম্ভবত সংস্পর্শ আসা কমাতে কিছুটা বেশি হস্তক্ষেপের প্রয়োজন হবে। তবে অন্য কারণগুলো থেকে ঘনত্বের প্রভাবকে আলাদা করা বেশ কঠিন কাজ হয়ে যায়। 

গবেষক দলটির একটি প্রাথমিক অনুসন্ধান বলে, সংখ্যালঘু এবং স্বল্প আয়ের জনসংখ্যার সঙ্গে পাশাপাশি অবস্থান যেখানে, সে অঞ্চলে সংক্রমণের ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি।  এ পর্যবেক্ষণটি মিলেছে হোয়াইটের বোস্টন ইউনিভার্সিটি দলের একটি প্রিপ্রিন্ট পেপারের সঙ্গে। যেখানে দেখা যায়, নিউইয়র্ক সিটিতে প্রয়োজনীয় কর্মীরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এ আর্থসামাজিক গোষ্ঠী থেকে উঠে আসা এবং অধিকতর ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। জনস্বাস্থ্য গবেষক জেমস সালিস বলেন, ঘনত্ব সম্ভবত প্রধান উল্লেখযোগ্য ফ্যাক্টরগুলোর একটি, যা নির্ধারণ করে শহরের অধিবাসীরা কভিড-১৯-এর জন্য কতটা সংবেদনশীল সেটি এবং এটি হয়তো অন্য আর্থসামাজিক ফ্যাক্টরগুলোর তুলনায় ছোট ভূমিকা রাখে।

আদলাকা বলেন, এখানে এ ঝুঁকিও আছে যে জনঘনত্বকে শত্রু হিসেবে বিবেচনা করার ফলে কিছু স্থানীয় সরকার এবং ডেভেলপারকে উৎসাহিত হতে পারে বিপথগামী হয়ে শহরকে আরো বিস্তার করতে।

তিনি ও সালিস গবেষণা করেছেন বেশ কয়েক ডজন শহরের ছোট কিন্তু বৈচিত্র্যময় নমুনা নিয়ে। যেখানে তারা উচ্চজনঘনত্বের সঙ্গে মাথাপিছু কভিড-১৯ কেস এবং মৃত্যুর হারের কোনো সম্পর্ক খুঁজে পাননি।

তবে ঘনত্ব ও অন্যান্য ফ্যাক্টর কীভাবে কভিড-১৯-এর বিস্তারে ভূমিকা রাখে তা বুঝতে আরো কাজ করা দরকার। যদিও গবেষকরা বলেছেন যে শহর শেষ হয়ে গেছে—এ বলে এখনই শোক প্রকাশ করা অপরিপক্ব আচরণই হবে।

সায়েন্টিফিক আমেরিকান থেকে সংক্ষেপে অনুবাদ

আরও