বৈদেশিক সহায়তা ও ঋণের অর্থ ছাড় বা যথাসময়ে সংশ্লিষ্ট প্রকল্প শেষ করা নিয়ে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা খুব বেশি সুখকর নয়। রোববার বণিক বার্তায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের নিকট প্রতিবেশী ভারত ও বড় বাণিজ্য অংশীদার চীনের ঋণ ছাড়করণ নিয়ে হতাশার চিত্রই উঠে এসেছে। ২০১৬ সালের অক্টোবরে ঢাকা সফরে আসেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। এর মধ্য দিয়ে দুই দেশের সহযোগিতামূলক সম্পর্ক কৌশলগত সম্পর্কে উন্নীত হয়। এ সফরকালে ২৭টি প্রকল্পে ২ হাজার ৪০০ কোটি ডলারের চীনা ঋণ নিয়ে এমওইউ স্বাক্ষরের ঘটনাও ছিল দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের নতুন মাইলফলক। যদিও চলতি বছরের মে পর্যন্ত এই ২৭টি সমঝোতার মাত্র ছয়টি ঋণচুক্তি বাস্তবায়ন হয়েছে। বাকি ২১টি প্রকল্পে মতৈক্যে পৌঁছতে পারেনি চীন-বাংলাদেশ। তবে এর মধ্যেই বাংলাদেশ আরো নয়টি প্রকল্পে ৬৪১ কোটি ৪৮ লাখ ডলার চেয়েছে চীনের কাছ থেকে। আর ২০১৫ সালের জুনে বাংলাদেশে আসেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এ সময় দুই দেশের মধ্যে দ্বিতীয় ঋণচুক্তির আওতায় ১৬টি প্রকল্পে ২০০ কোটি ডলার দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেয় ভারত। যদিও সেখান থেকে এ পর্যন্ত ৮ কোটি ৪০ লাখ ডলার পেয়েছে বাংলাদেশ। প্রকল্প শেষ হয়েছে দুটি, চলমান ১৪টি। চীন ও ভারতের শীর্ষ নেতার বাংলাদেশ সফরের মধ্য দিয়ে যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তার সঙ্গে প্রাপ্তির বেশ বড় ফারাক রয়েছে। আর এ দুটি দেশের জন্য আমাদের বাড়তি গুরুত্ব দেয়ার প্রয়োজন রয়েছে। প্রকল্পে যে গতি নেই, তা পরিষ্কার। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার পুরনো প্রশাসনিক দক্ষতা ও সক্ষমতায় দুই পক্ষের ঘাটতি রয়েছে। সময়মতো প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতা চীনের রয়েছে বলে বিশ্বের অন্যান্য দেশে তারা সে সক্ষমতা প্রমাণ করেছে। এক্ষেত্রে তাদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের প্রশাসনিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের যেকোনো প্রকল্প নিয়ে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সক্ষমতা বাড়ানো দরকার। চীন ও ভারতের ঋণের সুদহার ও
শর্ত কঠিন হওয়ায় প্রকল্প গ্রহণ থেকে শুরু করে অর্থ ছাড় প্রতিটি পর্যায়ে অনেক সময়ের প্রয়োজন হয়। এ সময়ে প্রকল্পের ব্যয়ও বেড়ে যায়। ফলে চীন ও ভারতের আর্থিক প্রতিশ্রুতি ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের যেমন প্রস্তুতি ও প্রশাসনিক ঘাটতি রয়েছে, তেমনি অর্থ ছাড়করণ ও প্রকল্প অনুমোদনে চীন-ভারতের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দায়ী।
চীন ও ভারতীয় ঋণের শর্তের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কতটুকু দরকষাকষি করতে পারছে, সেটি দেখার বিষয়। চীন, ভারত থেকে নেয়া ঋণের শর্ত অনেক বেশি এবং অপেক্ষাকৃত কঠিন। এমনকি পরিশোধের সময়ও কম এবং স্বস্তিকর নয়। এক্ষেত্রে আগে বিভিন্ন দেশ বা সংস্থা থেকে নেয়া ঋণের শর্ত ছিল তুলনামূলক কম। ফলে আগের প্রকল্পের তুলনায় ঋণভারও বেশি হবে। ঋণ হবে ব্যয়বহুল। সরকারের উচিত হবে ঋণের নানা শর্ত নেগোসিয়েশনের মাধ্যমে কমিয়ে আনা। প্রকল্পের পণ্য কেনাকাটার ক্ষেত্রে যতটুকু সম্ভব স্বস্তিদায়ক অবস্থায় রাখা। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পণ্য কিনতে হবে। প্রয়োজনে দরপত্র দিয়ে কেনাকাটা করতে হবে। এক্ষেত্রে পণ্য সরবরাহকারী যেন একক কোম্পানি না হয়, সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে। উভয় দেশ একটি প্রকল্পে সব শর্তে একমত হওয়া দীর্ঘ প্রক্রিয়া এবং কঠিন। বাংলাদেশ একটি শর্ত দিলে ভারত বা চীন রাজি না-ও হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে কীভাবে একটি উইন উইন সিচুয়েশনে উপস্থিত হওয়া যায়, তাতে সচেষ্ট থাকতে হবে।
ভারত ও চীনের প্রতিশ্রুত ঋণের প্রকল্প অগ্রগতি পর্যবেক্ষণে সরকারের উচ্চপর্যায়ের কমিটি রয়েছে। এক্ষেত্রে তাদের উচিত খতিয়ে দেখা কেন ঋণের অর্থ নির্ধারিত সময়ে সদ্ব্যবহার করা গেল না। চলতি বছরের মধ্যেই চীনা ঋণের অর্থ ব্যবহার করার কথা রয়েছে। ভারতীয় ঋণের সময়সীমা না থাকলেও দ্রুতই এর ব্যবহার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। চীন ও ভারতীয় ঋণের অর্থ ব্যবহারে উভয় দেশের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ আরো বাড়িয়ে তুলতে হবে। যদি এমন হয়, কঠিন শর্ত ও উচ্চ সুদব্যয়ের কারণে ওই দেশের ঋণ ব্যবহারে ধীরে চলো নীতি নেয়া হচ্ছে, তাও স্পষ্ট করা জরুরি। আর্থিক প্রতিশ্রুতি পূরণ না হওয়ার কারণ বিশ্লেষণ করা গেলে ভবিষ্যতে এ ধরনের চুক্তির ক্ষেত্রে আরো সতর্ক ব্যবস্থা গ্রহণ সহজ হবে। তাছাড়া এটি জানাও জরুরি কেন ঋণ ব্যবহার করা গেল না। বাংলাদেশের দুর্বলতা থাকলে তা কাটিয়ে ওঠাও প্রয়োজন। কীভাবে এ ঋণের অর্থ দ্রুত ব্যবহার এবং সর্বোচ্চ উপযোগ লাভ করা যায়, তার পরিকল্পনা গ্রহণ আবশ্যক। একই সঙ্গে শর্ত শিথিল, প্রকল্পের গুণগত মান নিশ্চিতসহ বাংলাদেশের অনুকূলে ঋণের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করতে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণই প্রত্যাশিত। অর্থ ব্যবহারে আমাদের সক্ষমতাও বাড়াতে হবে। এক্ষেত্রে আন্তঃদেশীয় আমলাতান্ত্রিক যোগাযোগ জোরদার করা দরকার। সংশ্লিষ্ট দেশের উপযোগী করে প্রকল্প পরিকল্পনা
তৈরি এবং দরকষাকষির ক্ষমতাও বাড়াতে হবে।