২০২১ সালে বাংলাদেশ তার জন্মের ৫০ বছর পালন করার কথা। সবাই মুখিয়ে আছে সোনালি সেই দিনটির জন্য। বিশেষত গত দুই দশকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার গড়পড়তা ৬ শতাংশ শুধু ওপরের দিকে ধাবমান ছিল না, ছিল স্থিতিশীলও। গেল কয়েক বছর প্রবৃদ্ধির হার ৭ শতাংশ পেরিয়ে বিশ্বব্যাপী ব্যাপক প্রশংসা কুড়ায়। আর এই মোহনীয় কৃতিত্বের পেছনে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ভূমিকা ছিল শক্তিশালী।
সন্দেহ নেই যে অর্থশাস্ত্রের বিভিন্ন শাখা-প্রশাখার বই সহজেই বাজারে পাওয়া যায়। কিন্তু বাজারে সামষ্টিক অর্থনৈতিক বা ম্যাক্রো ইকোনমিক বিষয়াদি নিয়ে মানসম্মত বইয়ের জোগান নিতান্তই স্বল্প, যাকে বলে দুর্লভ। এ বিষয় নিয়ে যারা নিয়মিত লেখাপড়া করেন, তাদের সংখ্যাও অবশ্য খুব সীমিত। এমন অবস্থায় বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতিক প্রবণতা নিয়ে লেখা বা সম্পাদিত যেকোনো বইয়ের সন্ধান লাভ, তাও বিদেশী প্রকাশনা সংস্থা থেকে প্রকাশিত হলে তো কথাই নেই, যেন সোনায় সোহাগা!
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সিনিয়র রিসার্চ ফেলো মনজুর হোসেন অত্যন্ত মেধাবী একজন অর্থনীতিবিদ। বস্তুত, এই প্রজন্মের সামষ্টিক অর্থনীতিবিদদের প্রতিভু বললেও বোধ করি ভুল হবে না। সর্বজন শ্রদ্ধেয় মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম, মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন, ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ, সালেহউদ্দিন আহমেদ, এম কে মুজেরি প্রমুখ প্রতিভাবান ম্যাক্রো ইকোনমিস্টের পর মনজুরদের হাতে মশাল।
সম্প্রতি তার সম্পাদিত বই Bangladesh’s
Macroeconomic Policy - Trends, Determinants and Impact (২০২০) এরই মধ্যে সচেতন মহলে সাড়া ফেলেছে। মূলত তিনটি কারণে বইটি আমার কাছে খুবই গুরুত্ব বহন করে। প্রথমত, ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির এমবিএ প্রোগ্রামে আমার ছাত্রছাত্রীদের ম্যাক্রো ইকোনমিকস ক্লাসে এটি বেশ কাজে লাগছে এবং সম্ভবত সেভাবে সব বিশ্ববিদ্যালয় স্তরে এর উপযোগিতা রয়েছে বলে আমার ধারণা; দ্বিতীয়ত, সামষ্টিক অর্থনীতিক নীতিসংক্রান্ত বইয়ের বিদ্যমান অভাব পূরণ করে নীতিনির্ধারক ও গবেষকদের চাহিদা পূরণে বইটি যে সহায়ক হবে, সে ব্যাপারে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ সিদ্দিকুর রহমান ওসমানী এ প্রসঙ্গে বলছেন, ‘প্রথমবারের
মতো দেশে বিদ্যমান সামষ্টিক অর্থনীতিক বিষয়ের ওপর চিন্তাশীল বিশ্লেষণধর্মী কাজ একটা শূন্যস্থান পূরণ করেছে।’ এবং প্রায় ৫০০ পাতার বইখানির প্রকাশক পালগ্রেইভ ম্যাকমিলান এবং সেই সূত্র ধরে এটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে স্বীকৃত একটা বই। প্রত্যাশা যে শুধু বাংলাদেশে নয়, অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের পরিস্থিতি বিশ্লেষণে বইটি কাজে লাগতে পারে।
মোট চারটি অংশে বিভক্ত বইতে ১৭টি প্রবন্ধ পেশ করেছেন বাংলাদেশের কিছু কৃতী অর্থনীতিবিদ। এর মধ্যে ১৪টি লেখায় মনজুর হোসেন প্রথম বা অন্যতম লেখক হিসেবে জড়িত থেকে তার মেধা ও মননের পরিচয় দিয়েছেন।
বিধৃত চারটি অংশের শিরোনাম হচ্ছে: সামষ্টিক অর্থনীতিক নীতি, প্রবৃদ্ধি এবং দারিদ্র্য; মুদ্রা এবং রাজস্ব নীতি; আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও অর্থায়ন এবং অর্থায়ন ও প্রবৃদ্ধি।
প্রতি অধ্যায়ে তথ্য-উপাত্তভিত্তিক চমত্কার সব আলোচনা রয়েছে। তবে সময় ও সুযোগের অভাবে আপাতত সেগুলো বিস্তারিত বলা সম্ভব নয়। প্রথম প্রবন্ধটি সামষ্টিক অর্থনীতিক নীতি, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও দারিদ্র্য হ্রাস নিয়ে সুন্দর একটা ওভারভিউ। সামাজিক ও উন্নয়ন মাপকাঠিতে তলাবিহীন ঝুড়ি থেকে উন্নয়ন ধাঁধায় রূপান্তরের গল্প যেমন আছে, তেমনি আছে সংশয়বাণী। যেমন রাজস্ব খাতে ঝুঁকি এবং লতিয়ে ওঠা আয়বৈষম্যের কথা। সারকথা হচ্ছে, উচ্চ প্রবৃদ্ধি পেতে চাই মুদ্রা ও রাজস্ব নীতির পরিপূরকতা, সমন্বিত অর্থায়ন কৌশল, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং রাজস্ব আহরণ।
দ্বিতীয় প্রবন্ধ মূল্যস্ফীতি ও খানা পর্যায়ে কল্যাণ শীর্ষক আলোচনা। ফিলিপাইনসের ওপর এক অধ্যয়ন বলছে ওই দেশে খাদ্যের দাম ১০ শতাংশ বাড়লে অতিরিক্ত দরিদ্র হয় ২ দশমিক ৭২ মিলিয়ন, আয়বৈষম্য সূচক বা জিনি সহগ বাড়ে শূন্য দশমিক ৫৫ এবং গড় জীবনযাত্রার মান পড়ে যায় ৪ দশমিক ১৬ শতাংশ। বইটিতে ইনফ্লেশনের প্রভাব দেখানো হয়েছে বিভিন্ন গোষ্ঠীর ওপর—দিনমজুর ও যাদের আয় স্থির তাদের ওপর। এদের মধ্যে আছে দরিদ্র, নিম্নমধ্যম আয়, উচ্চ মধ্যম আয় এবং উচ্চ আয় গোষ্ঠী; মোট ইনফ্লেশনে খাদ্য ইনফ্লেশনের প্রভাব প্রবল; খাদ্য মূল্যস্ফীতিতে বিশেষত মোটা ও মাঝারি চালের দাম গুরুত্ববহ নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। আন্তর্জাতিক বাজারের চাল ও পণ্যের দাম বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতিতে অবদান রাখে। গ্রাম ও শহরের খাদ্য মূল্যস্ফীতির পার্থক্য প্রধানত চালের বাজারের কারণে।
বাণিজ্য উদারীকরণে উজ্জ্বল বাণিজ্য কৃতিত্বে অবদান রেখেছে। বিশেষত পড়ন্ত বৈদেশিক সাহায্যের মুখে বাণিজ্য সক্ষমতা বেড়েছে। অধিকতর আমদানির ক্ষমতা বেড়েছে শুধু রফতানির জন্য নয়, রেমিট্যান্সতাড়িত অভ্যন্তরীণ চাহিদা চাঙ্গা হওয়ার জন্যও, যার পেছনে কাজ করেছে অবকাঠামোগত সরকারি ব্যয় ও বিদেশ থেকে আসা অভিবাসীদের অর্থ।
তবে রফতানি ঝুড়িতে বহুমুখিতার অভাব এখনো প্রকট।
পঞ্চম প্রবন্ধে দেয় দ্বৈত লক্ষ্যের আলোকে বাংলাদেশের মুদ্রানীতির কার্যকারিতা নিয়ে মূল্যায়ন। লক্ষ্য দুটি হলো মূল্যস্তর স্থিতিশীল রাখা ও দারিদ্র্য হ্রাসের সঙ্গে দ্রুত প্রবৃদ্ধিকে সহায়তা দেয়া। বাংলাদেশে আর্থিক সঞ্চালন খুব দুর্বল বিধায় মুদ্রানীতি তার দ্বৈত লক্ষ্য আদায়ে কম কার্যকর। মুদ্রানীতি পরিচালনে বড় বাধা হচ্ছে নিশানা চলক ঠিক করা বা রাখা। বিধানকৃত সুদহার এবং নির্দেশিত ঋণ বরাদ্দ এদেরকে নিশানা চলক হিসেবে ব্যবহার করতে অসুবিধার সৃষ্টি করে। ফলে বাস্তবে একমাত্র ব্রড মানি সরবরাহ একমাত্র নিশানা চলক, যা বাংলাদেশ ব্যাংক প্রভাবিত করার চেষ্টা চালায়। সুদহার ও মুদ্রা সরবরাহের দুর্বল সংযোগ প্রমাণ করে যে বাংলাদেশের আর্থিক ব্যবস্থা বহুলাংশে দক্ষ ও প্রতিযোগিতামূলক নয়। তাছাড়া মূল্যস্ফীতিতে অর্থ জোগানের দৃশ্যমান কোনো প্রভাব নেই। কারণ বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতিতে খাদ্য মূল্যস্ফীতির প্রাধান্য বেশি, যার সঙ্গে মুদ্রার জোগানের প্রভাব দুর্বল। আর আমদানিনির্ভর একটা দেশের অভ্যন্তরীণ মূল্যস্তর যে আন্তর্জাতিক বাজার দ্বারা প্রভাবিত, সে কথা বলা বাহুল্য।
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির সম্পর্ক ধনাত্মক, কিন্তু জ্বালানির দাম ও জিডিপির সম্পর্ক ঋণাত্মক। তবে অন্যান্য অবস্থার পরিবর্তন ঘটলে পরিস্থিতি পাল্টাতে পারে (প্রবন্ধ চার)।
কৃষি ও অকৃষি খাতের দিনমজুর এবং যারা সংখ্যাগরিষ্ঠ দরিদ্র, খুব দ্রুত মূল্যস্ফীতির সঙ্গে আর্থিক মজুরি বাড়িয়ে প্রকৃত মজুরি সমন্বয় করে নেয়। এ প্রবণতা লক্ষণীয় অসংগঠিত শ্রমবাজারে যেমন নির্মাণ, সেবা, পরিবহন, রিকশা। অন্যদিকে স্বনিয়োজিত ও বেতনভুক দরিদ্রের ওপর মূল্যস্ফীতির প্রভাব নেতিবাচক, কারণ তাদের প্রকৃত আয় পড়ে যায়। আর দরিদ্রের এক-দশমাংশ খানা যারা বেকার, তাদের অবস্থা বলা বাহুল্য (প্রবন্ধ তিন)।
যদিও বাংলাদেশ একটা ভাসমান বিনিময় হার রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, বিদ্যমান বিনিময় হারের বৈশিষ্ট্য ভাসমান বিনিময় হারের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। এখানে ‘নিয়ন্ত্রিত ভাসমান’ ব্যবস্থা ক্রিয়াশীল। ঝুঁকিবাহী অর্থ ব্যবস্থায় ঘন ঘন ক্ষুদ্র হস্তক্ষেপের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত ভাসমান ব্যবস্থার সুপারিশ রাখা যায়। বিনিময় হারের অস্থিতিশীলতা প্রধানত তিনটি পথে অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে ঢুকতে পারে। এর মধ্যে পাস-থ্রু প্রভাব শক্তিশালী। আন্তর্জাতিক বাজারদরে ১ শতাংশ পরিবর্তনের প্রায় পুরোটাই বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে হস্তান্তরিত হয়। এমনিভাবে মুদ্রার অবমূল্যায়ন সহজে মূল্যস্ফীতিতে জ্বালানি জোগায়।
এটা সত্যি যে করাল করোনার কারণে বিশ্ব তথা বাংলাদেশের পরিস্থিতি পাল্টে গেছে এবং সম্ভবত সে কারণে বইটিতে বিধৃত ব্যবস্থাপত্র প্রান্তিক পরিবর্তন, পরিমার্জন প্রত্যক্ষ করতে পারে। তবে সার্বিক বিচারে বইটি যে বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতি নিয়ে লেখা একটা অসাধারণ বই, এতে কোনো সন্দেহ নেই। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে—হোক সে শিক্ষা, শিল্প, ব্যবসা কিংবা ব্যাংক—বইটি থাকা উচিত। অন্তত বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে সামষ্টিক নীতিমালা প্রণয়নে বইটি গুরুত্ববহ সূত্র হিসেবে বিবেচনার দাবি রাখে বলে আমার মত।
আব্দুল বায়েস: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য
অর্থনীতির অধ্যাপক