অতিমাত্রায় সরকারের ওপর নির্ভরশীল হলে বুঝতে হবে সংশ্লিষ্ট শিল্পের বড় অংশ অদক্ষ

ছিলেন জাতিরজনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দীর্ঘ সময়ের ব্যক্তিগত সহকারী। তিনি স্কুলজীবন থেকেই ছিলেন তীক্ষ মেধার অধিকারী। ১৯৫৭ সালে এসএসসিতে প্রথম গ্রেডে বৃত্তি পেয়ে উত্তীর্ণ হন। এইচএসসিতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করেন। এরপর ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯৬২ সালে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান অধিকার করে স্বর্ণপদক জয় করেন। ১৯৬৫ সালে সিএসপি অফিসার হিসেবে যোগদান করেন। অর্থ মন্ত্রণালয়ের বাজেট শাখা, এনবিআর, পরিসংখ্যান ব্যুরো ও ইআরডিতে গুরুত্বপূর্ণ পদে এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থায় দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে মন্ত্রীর পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক বিষয়ক উপদেষ্টার দায়িত্ব পান। তৃতীয় দফায়ও তিনি একই পদ অলংকরণ করছেন। করোনায় দেশের অর্থনীতিতে প্রভাব, প্রণোদনা ও তা বণ্টনে ব্যাংকের অবস্থা, বিনিয়োগ, রফতানি, রেমিট্যান্সসহ নানা বিষয় নিয়ে বণিক বার্তার সঙ্গে কথা হয় তাঁর।

ড. মসিউর রহমান ছিলেন জাতিরজনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দীর্ঘ সময়ের ব্যক্তিগত সহকারী। তিনি স্কুলজীবন থেকেই ছিলেন তীক্ষ মেধার অধিকারী। ১৯৫৭ সালে এসএসসিতে প্রথম গ্রেডে বৃত্তি পেয়ে উত্তীর্ণ হন। এইচএসসিতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করেন। এরপর ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯৬২ সালে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান অধিকার করে স্বর্ণপদক জয় করেন। ১৯৬৫ সালে সিএসপি অফিসার হিসেবে যোগদান করেন। অর্থ মন্ত্রণালয়ের বাজেট শাখা, এনবিআর, পরিসংখ্যান ব্যুরো ও ইআরডিতে গুরুত্বপূর্ণ পদে এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থায় দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে মন্ত্রীর পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক বিষয়ক উপদেষ্টার দায়িত্ব পান। তৃতীয় দফায়ও তিনি একই পদ অলংকরণ করছেন। করোনায় দেশের অর্থনীতিতে প্রভাব, প্রণোদনা ও তা বণ্টনে ব্যাংকের অবস্থা, বিনিয়োগ, রফতানি, রেমিট্যান্সসহ নানা বিষয় নিয়ে বণিক বার্তার সঙ্গে কথা হয় তাঁর।  সাক্ষাৎকার নিয়েছেন এম এম মুসা

নভেল করোনাভাইরাসের প্রভাবে বিশ্বের সবকিছুই পরিবর্তন হচ্ছে। আপনার দৃষ্টিতে আগামীতে বিশ্ব অর্থনীতি কেমন হবে?
বিশ্বের সব জায়গাতেই নভেল করোনাভাইরাসের প্রভাব পড়েছে। সব জায়গাতেই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতি শ্লথ হয়েছে। উৎপাদন ও ভোগের পরিমাণ আগের তুলনায় কমেছে। আমাদের সঙ্গে যেসব দেশের রফতানি বাণিজ্যের সম্পর্ক আছে, যেমন আমেরিকা বা ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্যে আমাদের শ্রমিক কাজ করেন—এসব দেশে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের গতি ও মাত্রা কেমন হবে, তার ওপর নির্ভর করছে রফতানির চাহিদা কেমন হবে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হয়, বিভিন্ন স্থানে পুনরুদ্ধারের গতি বিভিন্ন রকম হবে। বছর দুয়েকের মতো সময় লাগতে পারে—এখন এমন মনে করা যেতে পারে। আমাদের সঙ্গে যাদের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আছে, আগামী এক-দেড় বছর তাদের চাহিদার মাত্রা কম থাকবে ধারণা করা যায়। আয়ের কিছু পুনর্বণ্টন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সব দেশের সরকার জনগণ ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে সাহায্য করছে, অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছে। কিন্তু সরকারের অর্থ প্রদানেরও একটা সীমা থাকে, যার ওপর নির্ভর করবে কত দ্রুত ও কী মাত্রায় অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার হবে। এ মুহূর্তে আমাদের সরকার যে ধরনের নীতি গ্রহণ করেছে, তাতে দেখা যায় কৃষি ও অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের ওপর জোর দেয়া হয়েছে। তাতে গ্রামীণ কর্মসংস্থানের ওপর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। আমরা যে ধরনের পণ্য রফতানি করি, তাতে কিছু বৈচিত্র্য আসতে পারে। পুনরুদ্ধার মানে ঠিক যা ছিল তেমন নয়, তার সঙ্গে নতুন কিছু যুক্ত হবে এবং সেগুলোর দিকে আমাদের খেয়াল রাখতে হবে।

অনেকে বলছেন ব্যবস্থাপনাগত পরিবর্তন আসতে পারে...
নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে মিল রেখে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, চাহিদা, ভোগের ক্ষেত্রে কিছুটা পরিবর্তন আশা করা যায়। অতএব, সেখানে ব্যবস্থাপনাগত পরিবর্তন আসা অস্বাভাবিক নয়। এর সঙ্গে আরেকটি প্রশ্ন সম্পৃক্ত। বিশ্বে ব্যবস্থাপনা ও অর্থনীতি যেভাবে পরিচালিত হবে, তাতে আমাদের যেসব পণ্য আছে সেসব পণ্যের চাহিদার কী হবে; বাইরের সঙ্গে যে সম্পর্ক, সেখানে ব্যবস্থাপনার কী পরিবর্তন হবে। যদি উৎপাদন ও ভোগ দুটোই পরিবর্তন হয় এবং আয়েরও কিছুটা পরিবর্তন হয়, তাহলে করোনা-পরবর্তীকালে আমরা একটা পরিবর্তিত জগতে প্রবেশ করব। যারা ব্যবসায়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রয়েছেন, তারা বুঝতে পারবেন পরিবর্তনটা কী ধরনের হবে এবং তাদের সঙ্গে আলোচনা করেই আমাদের প্রস্তুতি নিতে হবে।

করোনার ধাক্কায় অর্থনৈতিক ধারাবাহিকতায় ছেদ পড়েছে। এ অবস্থায় অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার কার্যক্রম কেমন হওয়া উচিত?
দেশের কয়েক বছরের অর্থনীতির ধারানুযায়ী, বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ স্থবির রয়েছে। বেসরকারি বিনিয়োগ যদি আশানুরূপ না হয়, তাহলে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে এবং সরকারের ব্যয় বাড়াতে হবে—অর্থনীতিতে এটা স্বীকৃত। আমাদের উন্নয়ন নির্ভর করবে প্রথমত বেসরকারি খাতের উন্নয়ন এবং বেসরকারি খাতের প্রসারের ওপর। দ্বিতীয়ত, যেখানে বেসরকারি খাতের ঘাটতি আছে, সেখানে সরকারকে চেষ্টা করতে হবে। নতুন অবস্থার মধ্যে কীভাবে কাজটা আরো বেশি দ্রুত এবং আরো বেশি দক্ষতার সঙ্গে করা যায়, তা সুস্পষ্ট নয়। এ কাজগুলো যেসব প্রতিষ্ঠান করে, তাদের দক্ষতা বাড়ানো দরকার, সেজন্য সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। সরকারের রাজস্ব আয়ের সঙ্গে অর্থনীতির সম্প্রসারণ বা প্রবৃদ্ধির সম্পর্ক রয়েছে। অর্থনীতি যদি সম্প্রসারিত না হয়, শুধু করের হার বাড়িয়ে বা কর বেশি আদায় করে উন্নয়ন সম্ভব নয়। বেসরকারি খাতের উন্নয়ন ও উৎপাদন বৃদ্ধি একান্ত প্রয়োজন। এজন্য সরকারের সহায়তা দরকার। সরকার এরই মধ্যে সেসব পদক্ষেপ নিয়েছে।


স্বাভাবিক সময়েই দেশে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ছিল না...
শুধু আমাদের দেশে নয়, সব দেশেই যখন অর্থনীতিতে একটু মন্দা ভাব দেখা যায়, তখন ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগকারীর মনে একটা সংশয় জাগে—এ অবস্থা কতদিন চলবে। আবার অর্থনীতি যখন চাঙ্গা অবস্থায় থাকে, তখন তাদের মনে সাহস বাড়ে। বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ আশঙ্কা কমাতে সরকারের হস্তক্ষেপ দরকার, যাতে বিনিয়োগকারীদের আশঙ্কা দূর হয়। সরকারের কোনো নীতি বা পদ্ধতির জন্য যদি বিনিয়োগ বাধা পায়, সেগুলো দূর করতে হবে। সরকার যে ধরনের বিনিয়োগ নীতি ঘোষণা করেছে, আমার মনে হয় সেগুলো যথাযথ। বিনিয়োগের পদ্ধতিগত বাধা-বিপত্তি দূর করার জন্য আমাদের উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি।

চীন থেকে অনেকে ব্যবসা গুটিয়ে ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়ায় চলে যাচ্ছেন। বাংলাদেশের সম্ভাবনার কথাও অনেকে বলছিলেন কিন্তু আশানুরূপ ফল আমরা দেখছি না। কেন?
আমাদের যে ইকোনমিক জোন, রফতানি অঞ্চল ইত্যাদি একটা প্রাথমিক প্রয়োজন মেটাচ্ছে—জমি না হলে কারখানা বসানো যায় না। এর সঙ্গে দেখা দরকার যে চীন বা জাপান যেসব ব্যবসা অন্য দেশে রিলোকেট করছে, সেখানে কাজের জন্য কী ধরনের কর্মদক্ষতা দরকার; প্রয়োজনীয় স্কিল আমাদের যথেষ্ট পরিমাণে আছে কিনা। যদি দক্ষতার ঘাটতি থাকে, তাহলে দ্রুত পূরণ করা দরকার। এসক্যাপ (ESCAP) সদস্য দেশগুলোকে নিয়ে একটা তুলনামূলক রিপোর্ট তৈরি করেছিল। তাতে দেখা যায় যে ঘণ্টাপ্রতি সবচেয়ে বেশি উৎপাদন ভিয়েতনামে এবং দেশটি প্রায় ৮-১০ বছর বা তার আগে সবার জন্য উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা নিশ্চিত করেছে। তাদের প্রশিক্ষিত শিক্ষকের অনুপাত আমাদের তুলনায় উন্নততর। যে লেভেল অব টেকনোলজি ওইসব জায়গায় ব্যবহূত হয়, ওই প্রযুক্তি ব্যবহার করার মতো দক্ষতা আমাদের কতটুকু আছে। যদি না থাকে, সে দক্ষতা আমাদের অর্জন করতে হবে। আমরা কর সুবিধা দিচ্ছি, অন্যান্য দেশও দেয়। কিন্তু বিদেশী বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ট্যাক্সবিষয়ক ক্রিটিকাল পয়েন্ট হচ্ছে, যে কোম্পানি বা ব্যক্তি আমাদের এখানে বিনিয়োগ করে, নিজ দেশেও তার ট্যাক্স দেয়ার একটা দায় থাকে। আমাদের দেশে সে যে ট্যাক্স দেয় এবং নিজ দেশে যে ট্যাক্স দেয়, দুটো মিলে যাতে করভার বেশি না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। আমাদের অনেক দেশের সঙ্গে ডবল ট্যাক্স অ্যাভয়ডেন্স বা ট্যাক্স স্পেয়ারিং চুক্তি আছে, যা উপরোক্ত উদ্দেশ্যে করা হয়েছে। আমার যতদূর মনে পড়ে, বিদেশী বিনিয়োগকারীকে ট্যাক্স সুবিধা প্রদানের ক্ষমতা সরকারের আছে। এ আইন পরিবর্তিত হলে তার সংশ্লেষ পরীক্ষা করা দরকার। বর্তমান পরিস্থিতিতে এ-জাতীয় ক্ষমতা সরকারের থাকা দরকার, যাতে কোনো বিশেষ দেশের সঙ্গে এ রকম চুক্তি না থাকলেও সরকার সে দেশের বিনিয়োগকারীকে অভিন্ন সুবিধা দিতে পারে। দেশের সঙ্গে চুক্তির জন্য দেরি করলে বিনিয়োগকারী উৎসাহ হারিয়ে ফেলবেন। দেশের কল্যাণ হবে কিন্তু বর্তমান নিয়মের অধীনে কাজটি করা যাচ্ছে না—এসব ক্ষেত্রে জবাবদিহিতাসাপেক্ষে ব্যতিক্রম করার ক্ষমতা আইনে থাকতে পারে। আমাদের এ বিষয়গুলো দেখতে হবে, যাতে অযথা আমাদের সময় ব্যয় না হয়। সব দেশ সব সেক্টরে বিনিয়োগ করতে চায় না। যেসব খাতে আমাদের বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগ করার যোগ্যতা রয়েছে, সেসব খাতে বাইরের দেশের বিনিয়োগকারীদের আহ্বান করার বিশেষ কোনো অর্থ নেই—দেশী বিনিয়োগের বিকল্প হবে নিট বিনিয়োগ বৃদ্ধির সম্ভাবনা সীমিত বা অনুপস্থিত। আমাদের উদ্দেশ্য দেশী বিনিয়োগকে উৎসাহিত করার পাশাপাশি বাইরে বিনিয়োগ বৃদ্ধি। যেসব খাতে বাইরের দেশের বড় বিনিয়োগের সুযোগ ও প্রয়োজন আছে, সেগুলোকে আমাদের আকর্ষণ করতে হবে।

জালিয়াতি করে ব্যাংকের অর্থ হাতিয়ে নেয়ার কোনো প্রভাব বিনিয়োগের ওপর পড়ছে কী?
ফাঁকি দিয়ে ব্যাংকের টাকা নিয়ে গেছে এ-জাতীয় কিছু লোক আছে। কিন্তু যেসব বিনিয়োগকারীর দৃশ্যমান বিনিয়োগ রয়েছে, তার পক্ষে এভাবে ফাঁকি দিয়ে চলে যাওয়া মুশকিল। ফাঁকিবাজদের জন্য সরকারের আইন প্রয়োগ করা দরকার। আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে কুঋণ-দুষ্ট ঋণ ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণে রাখার কথা বলা আছে; দেউলিয়া আইন আরো কঠিন ও কার্যকর করার কথা বলা হয়েছে। ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়ার পরে ঋণগ্রহীতা ঠিকমতো ঋণ শোধ দিতে পারছেন না, ঋণের ব্যবহার করেছেন, তা যদি সুষ্ঠু না হয়ে থাকে—তা  ইচ্ছাকৃত হোক, সঠিক প্রজেক্ট নির্বাচনের ব্যর্থতার জন্য হোক, পরিচালনার অযোগ্যতার জন্য হোক বা অসততার জন্য হোক—দেউলিয়া আইন কার্যকর হলে এ-জাতীয় উদ্যোক্তার ঋণ ও অন্যান্য প্রাসঙ্গিক সুবিধা পাওয়ার সুযোগ কমে যাবে অথবা থাকবে না। যদি এসব বিধান যথাযথভাবে পালন ও প্রয়োগ করা হয়, তাহলে মানুষের ফাঁকি দেয়ার প্রচেষ্টা অনেক কমবে। যে ব্যক্তি ঋণের অর্থ ভালোভাবে বিনিয়োগ করেছেন এবং যার বিনিয়োগটা ভালোভাবে পরিচালিত হচ্ছে, তার কোনো ভয় নেই। ফটকা বাজারের প্রতি যাদের লোভ, তাদের অবশ্য কিছু ভয় আছে।

ব্যাংকের অর্থ বাইরে চলে গেলে এবং ফিরে না এলে ব্যাংকের ঋণ দেয়ার ক্ষমতা বা পরিমাণ কমে যায়। সেখানে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক রিপো/রিভার্স রিপোর মাধ্যমে ব্যাংকের ঋণ প্রদানের ক্ষমতা বাড়াচ্ছে। এর সঙ্গে সুদহার, অন্যান্য শর্ত ইত্যাদির প্রশ্ন জড়িত। যে অর্থ চলে গেছে, তা উদ্ধার করা, ঋণখেলাপিদের সম্পত্তিগুলো নিয়ে নেয়া এবং শাস্তি প্রদানের ব্যবস্থা করলে অন্যদের মনে আস্থা ফিরে আসবে। দুর্নীতিবাজ ও ঋণখেলাপিদের প্রশ্রয় দেয়া যাবে না। যদিও তথ্যের অভাবে তারা পার পেয়ে যায়। বেশির ভাগ চোরই তো ধরা পড়ে। বেশিসংখ্যক চোর যদি ছাড় পেয়ে যায়, বুঝতে হবে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা আছে, অসততা উৎসাহ পাবে।

ভারত বাইরের দেশে থাকা অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করেও অর্থ আনার উদ্যোগ নিয়েছিল, বাংলাদেশে এমন উদ্যোগ নেয়া যায় কি?
বাইরের দেশ থেকে অর্থ ফ্রিজ করে আনার বিষয়টি কতখানি কাজ করে, সে সম্পর্কে আমি নিশ্চিত নই। যেসব দেশে অর্থ নিয়ে যাওয়া হয়, সেসব দেশের কিন্তু একটা স্বার্থ আছে—সেসব দেশে বিনিয়োগ বেশি হচ্ছে। আমাদের স্বার্থ এবং ওইসব দেশের স্বার্থ এক রকম নয়। আমি যতদূর জানি, ওইসিডি (অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট) দেশগুলো বহুদিন থেকে চেষ্টা করছে বিনিয়োগকারী ট্যাক্স কম-বেশি সুবিধা দেখে যেন অন্য অনুন্নত বা উন্নয়নশীল কোনো দেশে তাদের বিনিয়োগ না যায়। সদস্য রাষ্ট্র ট্যাক্স আপত্তি জানায় যে কর সার্বভৌম ক্ষমতার অংশ, এ ক্ষমতায় হস্তক্ষেপ করা যাবে না। ছোট ছোট স্বার্থ ও সার্বিক কল্যাণ—এ দুটোর ভেতর একটা দ্বন্দ্ব আছে, যা আমরা সবসময় মেটাতে পারি না। তবে ওইসিডি দেশগুলো বোধহয় এখন আরো সচেতন হবে। আর বিদেশে যে অর্থ পাচার হয়েছে, তা আনার জন্য আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। বাংলাদেশ এসব গ্রুপের সদস্য। আইনগত প্রক্রিয়া ব্যবহারে হয়তো আরো উদ্যোগী হতে হবে। সবচেয়ে বড় অংকের যে অর্থ বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সরানো হয়েছে, তা নিয়ে বাংলাদেশ সরকার মামলার উদ্যোগ নিয়েছে। আইন অনুসারে বিচারক যে রায় দেবেন, আমাদের তা মেনে নিতে হবে।

বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশের সরকারও করোনায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য প্রণোদনা দিয়েছে। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে সঠিক ব্যক্তির হাতে তা পৌঁছাচ্ছে না। বণ্টনটা কীভাবে করলে দুর্বলতাগুলো কাটিয়ে ওঠা যাবে?
সরকার যে প্রণোদনা ঘোষণা করেছে, তার কোন খাতে কোনটি যাবে তা উল্লেখ করা হয়েছে। এর একটা দিক হলো গ্রামগঞ্জে যাদের কাজ করার ক্ষমতা নেই, তাদের সহায়তা করা। সরকার ও স্থানীয় সরকারের যে প্রতিষ্ঠান আছে, তারা কাজ করছে। ৯ শতাংশ ঋণের ক্ষেত্রে, সাড়ে ৪ শতাংশ গ্রহীতা দেবেন, বাকিটা সরকার দেবে। তবে ঋণ প্রদান করার দায়িত্ব ব্যাংকের ওপর দেয়া হয়েছে। কারণ সরকারের প্রতিষ্ঠান শিল্পোদ্যোক্তা বা ঋণ গ্রহণকারী সম্পর্কে সবকিছু জানে না। যারা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছে, ব্যাংক তাদের চেনে এবং তাদের সম্পর্কে ব্যাংকের কাছে তথ্য রয়েছে। ভালো গ্রাহকদের ঋণ দিতে ব্যাংকের দ্বিধা নেই। কিন্তু সব গ্রাহকই তো প্রতিশ্রুতিশীল নয়। তাই ব্যাংক তাদের ঋণ প্রদানের বিপরীতে ব্যাংক গ্যারান্টি, মর্টগেজের কথা বলছে। সরকার কিন্তু অনেক দায় নিজের ঘাড়ে নিয়েছে। আমার মনে হয়, বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকারের বিনিয়োগ বিভাগের দায়িত্ব ব্যাংকের বক্তব্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা। সরকার ও  বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে কার্যকরী মনিটরিং ব্যবস্থা রাখা দরকার যেন সঠিক লোকের কাছে সময়মতো পর্যাপ্ত ঋণ যায়। যারা ঋণ পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করছেন, তাদের অসুবিধাগুলো দূর করার সঠিক পথ বের করা দরকার।

ব্যাংকগুলো ভালো গ্রাহক খুঁজে পেতে হিমশিম খাচ্ছিল। তাদেরই আবার এসএমই উদ্যোক্তাদের ঋণ দিতে বলছি?
সাধারণত ব্যাংকগুলো এসএমইর প্রতি আকৃষ্ট নয়। এসএমইতে ঋণের পরিমাণ কম কিন্তু গ্রাহকের সংখ্যা বেশি। এতে ব্যাংকের প্রশাসনিক খরচ বেশি হয়। ব্যাংক বাণিজ্যিক ঋণ দিতে বেশি উৎসাহী। এক্ষেত্রে চার থেকে ছয় মাসের মধ্যে অর্থ ফেরত আসে। গ্রাহক ভালো কি মন্দ, তা এ সময়ের মধ্যে বোঝা যায়। প্রতিষ্ঠিত শিল্প ক্ষেত্রে ব্যাংক এক ধরনের আস্থা পায়। সুদহার কমিয়ে খেলাপি ঋণ পরিশোধের সময় বাড়ানো হয়েছে। বিষয়টিকে সাধারণ নিয়মে আনার কারণে ব্যাংক ভয় পাচ্ছে যে সরকার যদি পরবর্তী সময়ে এ ধরনের আরো আদেশ দেয়, তাহলে তাদের ওপর বেশি দায় এসে পড়বে। এ ধরনের দায়ের ফলে ব্যাংকগুলোর ঋণ দেয়ার ক্ষমতাও কমে যাচ্ছে। ব্যাংক মালিকরাও সাবধানে এগোচ্ছেন। ব্যাংকের ম্যানেজমেন্ট ব্যাংকের মালিকদের উপেক্ষা করতে পারে না। তারা ভালোভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে অতিরিক্ত ঋণের বোঝা এড়ানোর চেষ্টা করে, ফলে ঋণের গতি ও পরিমাণ কমার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়।

আগে থেকেই কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধির বিষয়টি উল্লিখিত। করোনার প্রভাবে অনানুষ্ঠানিক ও আনুষ্ঠানিক খাতে কর্মচ্যুতির সংখ্যা বাড়ছে। বিষয়টিকে কীভাবে দেখেন?
কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধির ধারা শুধু আমাদের এখানে নয়, সারা বিশ্বেই করোনা শুরুর আগে থেকেই এ প্রবণতা দেখা যাচ্ছিল। বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধির ফলে এক ইউনিট বিনিয়োগে যত লোকের যত ঘণ্টার কর্মসংস্থান হয়, তা ক্রমে কমছিল। যুক্তিসংগত কারণেই কৃষি এবং অন্যান্য খাতে যন্ত্রের ব্যবহার বাড়ছে। অন্যান্য দেশের সঙ্গে আমরা যদি প্রতিযোগিতায় টিকতে চাই তাহলে কৃষি ও শিল্প সব ক্ষেত্রেই আমাদের উৎপাদন দক্ষতা বৃদ্ধি করতে হবে। নিম্নমানের প্রযুক্তি ব্যবহার করলে ভ্যালু অ্যাডিশন অনেক কম হবে। মূল্য সংযোজন বৃদ্ধি করতে হলে আমাদের উন্নত যন্ত্রের ব্যবহার বাড়ানো প্রয়োজন। যন্ত্রের ব্যবহার বৃদ্ধির পাশাপাশি বিনিয়োগও বাড়াতে হবে। বিনিয়োগের ফলে উৎপাদন বাড়বে, দেশে ও দেশের বাইরে চাহিদা বাড়বে। রূপান্তর প্রক্রিয়ার একটা সময় পর্যন্ত মনে হবে যে আমরা বোধহয় কিছু হারাচ্ছি। রূপান্তর প্রক্রিয়ার একটা সময় পর্যন্ত সরকারের পক্ষ থেকে সহযোগিতা করতে হবে। সে সময়টা পার হওয়ার পর আমরা দেখব যে নতুন করে ভারসাম্য অবস্থা তৈরি হয়েছে। আমাদের সেদিকে অগ্রসর হতে হবে।

কভিডের ফলে সৃষ্টি হওয়া বেকারত্ব কীভাবে কমানো সম্ভব?
পাস করে বের হওয়ার ছয়-সাত মাসের মধ্যেও যখন কেউ কাজ না পায়, তখন স্বাভাবিকভাবেই তার মনে এক ধরনের ভীতি তৈরি হয়। সে মনে করে, এ অবস্থা কি চলতে থাকবে, না শেষ হবে! অবস্থা পরিবর্তন না হলে অর্থনীতি ও সমাজ সবটাই পঙ্গু হয়ে বসে পড়বে। যেকোনো অর্থনীতিতে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রকম ধাক্কা আসে এবং তার একটা নেতিবাচক প্রভাব থাকে। নেতিবাচক প্রভাবটাকে চিহ্নিত করতে হবে। এ প্রভাব চিরস্থায়ী নয় এবং এর সমাধান আছে। আমাদের সেই সমাধানের পথে যেতে হবে। আমার বিশ্বাস সমাধান হলো বিনিয়োগ বাড়ানো। অভ্যন্তরীণ সঞ্চয়ের ক্ষেত্রে আমাদের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। অভ্যন্তরীণ সঞ্চয়ের সঙ্গে আমরা যদি বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে পারি তাহলে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ ও কর্মসংস্থান বাড়বে। কর্মসংস্থানের জন্য বিদেশী বিনিয়োগ জরুরি হয়ে উঠছে।

রফতানি ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে পোশাক শিল্পের ওপর নির্ভরতা কাটাতে সরকার নতুন কিছু শিল্পকে পৃষ্ঠপোষকতা করলেও ফলপ্রসূ হচ্ছে না কেন?
কতগুলো কারণে গার্মেন্ট শিল্প বেশকিছু সুযোগ পেয়েছিল এবং সে সুযোগ ব্যবহার করে আমরা এ সেক্টরকে অনেক বড় করতে পেরেছি। কিন্তু এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত সবাই দক্ষ নয়। অনেকে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় সক্ষম নয়। সেখানে যদি আরো বিনিয়োগ হয় তাহলে সে বিনিয়োগের সুফল আসবে না; বরং যেখানে দক্ষতা রয়েছে বা নতুন যে প্রতিশ্রুতিশীল খাত-উপখাত রয়েছে, সেখানে বিনিয়োগ হলে বেশি সুফল পাওয়া যাবে। কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে পোশাক শিল্পের অবদান স্বীকার করতে হবে। আমরা যদি সীমিতসংখ্যক খাতের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ি তাহলে বিদেশী ক্রেতারা আমাদের ওপর বিভিন্নভাবে চাপ সৃষ্টি করে। তাদের সঙ্গে দর কষাকষিতেও আমাদের দুর্বলতা আসে। কিন্তু আমরা যদি চাহিদা অনুযায়ী পরিমিত পরিমাণে মানসম্পন্ন পণ্য তৈরি করি তাহলে আমাদের ওপর এ-জাতীয় চাপ আসবে না। আমাদের সেক্টরগুলোকে বৈচিত্র্যময় করা দরকার। আমি মনে করি, আমাদের আরো একটি বিষয়ে উদ্যোগ নেয়া দরকার। আমরা বিভিন্ন খাতকে বিভিন্ন হারে কর রেয়াত ও ক্যাশ ইনসেনটিভ প্রদান করি। সব মিলিয়ে একেকটা খাতে আমরা মোট কত রেয়াত ও প্রণোদনা দিচ্ছি, তা হিসাব করে যদি দেখা যায় যে সরকারের এ বাবদ যে পরিমাণ ব্যয় হচ্ছে, সে তুলনায় যথাযথ পরিমাণে উৎপাদনশীলতা নেই, তাহলে বুঝতে হবে আমরা অদক্ষ খাতের ভেতরে ঢুকে পড়ছি। এখান থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। আমরা সাধারণত একটি পণ্য তৈরি করতে করতে এক ধরনের দক্ষতা অর্জন করি, অভ্যস্ত হয়ে পড়ি। সেখান থেকে সহজে সরে আসতে চাই না। ফলে একই দিকে যাওয়ার একটা প্রবণতা দেখা যায়। তা থেকে ফিরিয়ে আনার জন্য বিভিন্ন খাতের সুবিধার হারগুলোকে কাছাকাছি আনা দরকার। এছাড়া পরিণত শিল্প অর্থাৎ যে শিল্প ২০-৩০ বছর ধরে গড়ে উঠেছে, যদি সরকারের সহায়তার ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে বুঝতে হবে এ শিল্পের একটি বড় অংশ অদক্ষ, উৎপাদনশীলতায় ঘাটতি আছে। এসব শিল্পের সুযোগ-সুবিধা ক্রমান্বয়ে হ্রাস অথবা অবসান করা যেতে পারে। তার জায়গায় নতুন শিল্প ও নতুন খাতকে উৎসাহ দিতে হবে।

আমাদের অনেক শিক্ষার্থী, যারা দেশে ও বিদেশে লেখাপড়া শিখেছে, তারা নিজেদের যোগ্যতা ব্যবহার করে বিভিন্ন ইন্ডাস্ট্রিতে যাচ্ছে। এসব শিল্পে বিনিয়োগের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম, মানবসম্পদের ব্যবহার বেশি। এ ধরনের শিল্প সরকারের পক্ষ থেকে সুবিধা ও উৎসাহ পেলে আমাদের উন্নয়ন ধারা আরো বেগবান হবে।

কভিডের কারণে রাজস্ব আয় আগের তুলনায় কমে গেছে। কেউ কেউ রিজার্ভ থেকে অর্থ ব্যবহারের পরামর্শ দিচ্ছেন। আপনি কী মনে করেন?
আমার মনে হয় দুটোকে আলাদাভাবে দেখা দরকার। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সংকুচিত হলে সরকারের রাজস্ব আয় কমে যায়। এ নিয়ে বিতর্কের অবকাশ নেই। আমরা বিশ্বব্যাংক, এডিবি ইত্যাদি প্রতিষ্ঠান থেকে রেয়াতি হারে ঋণ পাই। এর পরিমাণ বাড়ানোর চেষ্টা করা দরকার এবং ব্যবহার বাড়াতে হবে। এমডিজি বা এসডিজি আন্তর্জাতিকভাবে উৎসাহপ্রাপ্ত নীতি, উভয় ক্ষেত্রেই আমরা সাফল্য দেখিয়েছি। সে সাফল্যের প্রতিদান চাইতে পারি: একটা দেশ ভালো করছে, সে দেশটি যেন পিছিয়ে না পড়ে, এজন্য দেশটির সহায়তা দরকার।

রিজার্ভ থেকে অর্থ নেয়ার বিষয়টি জটিল। কয়েক বছর আগে ভারতে এ রকম একটা উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। তখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর এ ধরনের উদ্যোগ ভ্রান্ত বলে মত দিয়েছিলেন। ভারত সরকার সে পথ থেকে সরে আসে। রিজার্ভের মালিক সরকার কিংবা কেন্দ্রীয় ব্যাংক নয়। রিজার্ভ আসছে রফতানি থেকে। বাংলাদেশের জন্য রেমিট্যান্স একটা বড় উৎস। অফিশিয়াল রিজার্ভ থেকে অর্থ নিতে হলে অন্য যেকোনো ব্যক্তির ন্যায় সরকারকে বিদেশী মুদ্রা কিনতে হবে। বিদেশী মুদ্রা বাজার থেকে কিনলে বাজারে চাহিদা বাড়বে, বেসরকারি খাতের অভিগম্যতা সীমিত হবে। রাজস্বে যদি ঘাটতি থাকে, তার সমাধান রিজার্ভ থেকে খরচ নয়। কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগের জন্য আমদানির প্রয়োজন থাকলে সরকার রিজার্ভ থেকে বিদেশী মুদ্রা কিনে ব্যয় করতে পারে।

অনেকে সভরিন ওয়েলথ ফান্ড গঠনের কথা বলেছে। ওয়েলথ ফান্ড যেসব দেশ গঠন করেছে, তার বেশির ভাগই জ্বালানি তেল রফতানি করে। তাদের খরচ ও বিনিয়োগ করার যে ক্ষমতা, তার তুলনায় রফতানি বাবদ প্রাপ্তি বেশি। এসব দেশ বিনিয়োগের জন্য ওয়েলথ ফান্ড গঠন করে, যা সরকারের বাজেট থেকে আলাদা। বিদেশে বিনিয়োগ করায় বৈদেশিক মুদ্রায় আয় বেড়েছে, ফান্ডের বিনিয়োগযোগ্য সম্পদ বেড়েছে। সুষ্ঠু নিয়মনীতি এবং পেশাদারি পদ্ধতিতে ফান্ড ব্যবস্থাপনা করা হয়। আমাদের এ-জাতীয় উদ্বৃত্ত নেই। রফতানি ও প্রবাসী আয় ঝুঁকির মুখে। করোনার সময় তো বটেই, তার আগেও বেশ দীর্ঘ সময় আমাদের বিনিয়োগের অবস্থা নাজুক ছিল, রফতানি ছিল ট্রেন্ডের তুলনায় কম। এ অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে ৯০ দিনের রিজার্ভ হিসাব করলে তা নির্ভরযোগ্য হবে না। বিনিয়োগ ও আমদানি বৃদ্ধির সংশ্লেষ বিবেচনায় রাখতে হবে।

আমি ফান্ডবিষয়ক যতগুলো দেশের নিয়ম-নীতি দেখেছি, তাতে নরওয়ের বিধান সবচেয়ে ভালো মনে হয়েছে। তিনটি বৈশিষ্ট্য লক্ষণীয়: (ক) বার্ষিক বিনিয়োগের নির্ধারিত উচ্চসীমা; (খ) নির্ধারিত ন্যূনতম মুনাফার হার; (গ) ফান্ডের পরিমাণের অব্যাহত বৃদ্ধি।

কয়েক বছর আগে বাজেট বরাদ্দ ব্যবহার করে বাংলাদেশ ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড (বিআইআইএফএল) গঠন করা হয়েছিল। পিপিপি প্রকল্পে সরকারের বিনিয়োগ এ ফান্ড  থেকে দেয়া হয়। এর আগে বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় সরকারের মালিকানায় ইডকল (ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড) গঠন করা হয়েছিল; প্রতিষ্ঠানটি অবকাঠামো, ইউটিলিটি ইত্যাদি খাতে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের ঋণ দেয়। এগুলোর পারফরম্যান্স পরীক্ষার জন্য পোর্টফোলিও অডিট করা যেতে পারে। ঋণের মান অবনত হলে, এনপিএল বাড়তে থাকলে ট্রানজেকশন অডিট দরকার হতে পারে। ইতিবাচক ফল সক্ষমতার প্রমাণ দেবে। সক্ষমতার ঘাটতি থাকলে এ-জাতীয় তহবিলের সুফল পাওয়া দুষ্কর।

এ প্রসঙ্গে এক্সপোর্টের রিটেনশন কোটা বিবেচনায় আনা যেতে পারে। রফতানিকারক বৈদেশিক মুদ্রা বিক্রয় করে কম দামে, কেনে বেশি দামে; রিটেনশনের পরিমাণ বাড়লে বেশি দামে বৈদেশিক মুদ্রা কেনার পরিমাণ কমে যাবে। ব্যাংকঋণের সুদ বাবদ ব্যয় কমবে। উৎপাদন ব্যয় কম হলে রফতানি বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বাড়বে। অফিশিয়াল রিজার্ভ বৃদ্ধির হার অবশ্য নমনীয় হবে; বৈদেশিক মুদ্রা বিক্রয় বাবদ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আয় হ্রাস পাবে; এক্সচেঞ্জ ব্যবসায়ের কমিশন বাবদ আয় বা মুনাফা কমবে।

এক্সপোর্ট ডেভেলপমেন্ট ফান্ডের ব্যবহার পরীক্ষা করা যেতে পারে। রফতানি সহায়তার উদ্দেশ্যে ১৯৮০-এর দশকে বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় ফান্ড গঠন করা হয়েছিল; প্রাথমিক মূলধন ছিল ৫০ মিলিয়ন ডলার বা তার কম। এ ফান্ডের লেনদেন বৈদেশিক মুদ্রায় হয়। এখন এর পরিমাণ ১ বিলিয়ন ডলার বা তার বেশি। রিটেনশন কোটা ইডিএফের বাজারভিত্তিক বিকল্প হিসেবে কাজ করতে পারে। দক্ষ ও সফল রফতানিকারক মূলত এ সুযোগ ব্যবহার করতে পারবেন।

অনেকে টাকা ছাপানোর কথা বলছেন। এটা কি উচিত হবে বলে আপনি মনে করেন?
অর্থনীতি পুনরুজ্জীবনের জন্য সরকারের ব্যয় বাড়ানো দরকার। অর্থনীতি যখন মন্দা অবস্থায় পড়ে, তখন রাজস্ব আদায়ও কমে যায়। শুল্ক-করহার বৃদ্ধি করলে বেসরকারি খাতের ওপর চাপ সৃষ্টি হবে, যা অর্থনীতি পুনরুজ্জীবনে সহায়ক ভূমিকা রাখে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে সরকার প্রয়োজনীয় ব্যয়ের দাবি মেটায়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সামগ্রিক পর্যায়ে অর্থ সরবরাহ বাড়ায়, যাতে বেসরকারি খাত যুক্তিসংগত সুদে পর্যাপ্ত ঋণ নিতে পারে। সম্প্রসারণমূলক মুদ্রানীতির সাফল্য নির্ভর করে প্রধানত বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তা কর্তৃক দক্ষতার সঙ্গে উৎপাদনের জন্য ঋণ ব্যবহার করা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অর্থ সরবরাহের তুলনায় ঋণ বিতরণ হচ্ছে কম। ব্যয়ের উচ্চমান সংরক্ষণের জন্য সরকারকে যত্নশীল হতে হবে। দক্ষতা ও নিয়মানুবর্তিতা  থেকে দূরে সরার অবারিত সুযোগ নেই।

(সাক্ষাৎকারের বাকি অংশ প্রকাশ হবে আগামীকাল)

শ্রুতলিখন: রুহিনা ফেরদৌস

আরও