মহামারীর বর্ষপূর্তিতে দুনিয়ার চেহারাটা যেমন হতে পারে

আমরা এখন আনুষ্ঠানিকভাবে করোনাভাইরাস মহামারীর ছয় মাস পার করেছি। এখন পর্যন্ত ১০.৫ মিলিয়নের বেশি মানুষ এতে সংক্রমিত হয়েছে। যার এক-চতুর্থাংশ আবার যুক্তরাষ্ট্রের।

আমরা এখন আনুষ্ঠানিকভাবে করোনাভাইরাস মহামারীর ছয় মাস পার করেছি। এখন পর্যন্ত ১০.৫ মিলিয়নের বেশি মানুষ এতে সংক্রমিত হয়েছে। যার এক-চতুর্থাংশ আবার যুক্তরাষ্ট্রের।

এখন পর্যন্ত ভাইরাসের বিস্তৃতি কমানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্র খুব সামান্য সাফল্যই দেখাতে পেরেছে। দেশটি দৈনিক সংক্রমণের নতুন নতুন রেকর্ডও গড়েছে।

কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির মেইলম্যান স্কুল অব পাবলিক হেলথের এপিডেমিওলজিস্ট স্টেফান মোরসে বলেন, এই ছয় মাসে, আমাদের প্রতিক্রিয়ার চেয়ে ভাইরাস অনেক বেশি কার্যকর ছিল। আমি কখনই ভাবিনি যে মহামারী রাজনৈতিক সমস্যা হয়ে উঠবে।

যদিও যুক্তরাষ্ট্রের কভিড-১৯ প্রাদুর্ভাবের অনেকগুলো দিক রয়েছে। কিন্তু ছয় মাস ধরে দেশটির ধীরগতির ও বিচ্ছিন্ন প্রতিক্রিয়া মোরসের মতো বিশেষজ্ঞদের অবাক করেছে। আমরা তার কাছ থেকে এবং জনস হপকিনস ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর হেলথ সিকিউরিটির আরেকজন নেতৃস্থানীয় বিজ্ঞানী আমেশ আডালজাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম আগামী ছয় মাসে মহামারীর অবস্থা নিয়ে। তারা দুজনই আশাবাদী যে যুক্তরাষ্ট্র এবং বাকি বিশ্ব ডিসেম্বরের শেষ নাগাদ মহামারীকে ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণে আনতে পারবে। করোনাভাইরাসময় পৃথিবীকে এক বছর পর তারা কেমন চেহারায় দেখবেন বলে মনে করেন সেটাই নিচে তুলে ধরা হলো।

ভ্যাকসিন আমাদের হাতে থাকবে

মোরসে বলেন, আমি কোনো কিছু নিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করতে নারাজ, তার পরও অবশ্য আশাহত হতে চান না তিনি। ২০২০ সালের ডিসেম্বর ৩০ নাগাদ আমাদের হাতে হয়তো ভ্যাকসিন থাকবে, এ নিয়ে তিনি আশাবাদী।

আদালজাও একই ধরনের ভবিষ্যদ্বাণী করে বলেন, ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা এবং সুরক্ষা সম্পর্কে আমাদের ধারণা থাকবে। অন্তত ৩০টি করোনাভাইরাস ভ্যাকসিন বছর শেষ হওয়ার আগে মানুষের শরীরে পরীক্ষা শুরু করবে বলে আশা করা হচ্ছে এবং ১৬টি ভ্যাকসিন এরই মধ্যে মানুষের শরীরে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শুরু করেছে সংশ্লিষ্টরা।

ভ্যাকসিন আবিষ্কারের প্রচেষ্টারত প্রার্থীদের মাঝে অন্যতম হলো বায়োটেক কোম্পানি মডার্না। যারা মার্চের ১৬ তারিখ ট্রায়াল শুরু করার পর প্রথম মানুষের মাঝে এর ফল প্রকাশ করে। মডার্নার লক্ষ্য জুলাইয়ে বড় আকারে ৩০ হাজার মানুষের মাঝে ট্রায়াল শুরু করা।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের আশা ২০২১ সালের জানুয়ারির মাঝেই ভ্যাকসিনের লাখো ডোজ প্রস্তুত করা। যদি এটা করা সম্ভব হয়, তবে ভ্যাকসিন ইতিহাসে রেকর্ড টাইমলাইন হিসেবে স্বীকৃতি পাবে।

ড. ফাউসিও ২৩ জুনের কংগ্রেসে বলেছেন, তিনি সাবধানী কিন্তু আশাবাদী যে ভ্যাকসিন এ বছরের শেষে কিংবা আগামী বছরের শুরুতে উপলব্ধ হবে।

কিন্তু আদালজা বলেন, এ সম্ভাবনা অনেক বেশি শুরুর ভ্যাকসিন ডোজ কেবল অত্যধিক ঝুঁকিসম্পন্ন মানুষ এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য উপলব্ধ হবে। যুক্তরাষ্ট্রের বেশির ভাগ নাগরিক এটা পাবে না।

ঘরে বসেই টেস্ট করা সম্ভব হতে পারে

মোরসে ও আদালজা উভয়েই আশাবাদী যে যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য দেশ এ বছরের শেষ দিকে আরো অনেক বেশি করোনাভাইরাস টেস্টিংয়ের সুযোগ তৈরি করতে পারবে।

মোরসে বলেন, আমাদের ডায়াগনস্টিক সক্ষমতা এখনো বিশৃঙ্খল অবস্থায় আছে। আমি আশা করি, আগামী ছয় মাসে এটা উন্নত হতে দেখব। সম্ভবত আমরা আসল ঘটনা এবং ভাইরাসের কমিউনিটি বিস্তারের একটা প্রকৃত চিত্রও দেখতে পাব। যা আমরা এখনো পাইনি।

গবেষকরা মনে করেন প্রকৃত সংক্রমণের সংখ্যা এখনো অনেক দূরের ব্যাপার। আনুষ্ঠানিকভাবে যা বলা হচ্ছে তার চেয়ে অনেক বেশি। এখন টেস্টিংয়ের পরিমাণ বাড়ানোর মধ্য দিয়ে বিশেষজ্ঞরাও ধারণা পাবেন কত মানুষ আসলে ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে।

আদালজা বলেন, এমনও হতে পারে যে মানুষ ঘরে বসে নিজেদের টেস্ট করতে পারবে। যদিও মোরসের এ বিষয়টি নিয়ে সন্দেহে আছে। তিনি বলেন, ঘরে বসে র্যাপিড টেস্ট দারুণ ব্যাপার। কিন্তু  আমি জানি না কখন সেটা আমরা করতে সক্ষম হব।

অন্যান্য চিকিৎসাও সামনে আসতে পারে

করোনাভাইরাসের উপসর্গের কার্যকর কোনো চিকিৎসা এখনো সামনে আসেনি। এখন পর্যন্ত সবচেয়ে প্রতিশ্রুতিশীল ওষুধ হচ্ছে রেমডেসিভির। জরুরি অবস্থায় মে মাসের ১ তারিখ ব্যবহারের জন্য যা অনুমোদন করেছে এফডিএ। এটা হাসপাতালে ভর্তি হওয়া করোনাভাইরাসের রোগীদের দ্রুত সারিয়ে তুলতে পারে বলে বিশ্বাস করা হয়। ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল দেখিয়েছে যে সাশ্রয়ী ডেক্সামেথাসোনও কভিড-১৯-এ আক্রান্ত মারাত্মক অসুস্থ রোগীদের মৃত্যুর সম্ভাবনাকে অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছে।

আদালজা আশা করেন যে ডিসেম্বরের মধ্যেই অনেক ডাক্তার ওই ওষুধগুলোকে উপজীব্য করে রোগীদের চিকিৎসা করতে পারবেন, ফলে দুর্ভোগও অনেকটা লাঘব হবে। পাশাপাশি এটি স্বাস্থ্যসেবার ওপর থেকে বোঝাও কমাবে এবং জীবন বাঁচাতে পারবে।

তিনি বলেন, এটা মৃত্যুহারকে কমিয়ে দিতে পারে। পাশাপাশি এখন করোনাভাইরাসকে মোকাবেলা করার অনেক বেশি সরঞ্জাম আছে।

লকডাউন এখন অতীত

যুক্তরাষ্ট্রের অর্ধেকের বেশি রাজ্যে বারগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়েছে এবং পুনরায় খুলে দেয়ার পরিকল্পনাও পিছিয়ে দেয়া হয়েছে। যদিও মোরসে ও আদালজা মনে করেন না ঘরে থাকার অর্ডার আর ফিরে আসবে।

মোরসে বলেন, এখন সম্ভবত মানুষ এবং রাজনৈতিক নেতা কারো মাঝেই লকডাউন নিয়ে আর আগ্রহ নেই।

বিপরীতে আদালজা বলেন, ভাইরাসকে নিয়ন্ত্রণে স্টেটগুলো হটস্পট চিহ্নিত করে তাতে উপযোগী বিধিনিষেধগুলো আরোপ করতে পারে।

২০২১ সালে যেসব চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে

মহামারী যেভাবে ছড়িয়ে পড়েছে, সেখানে সংক্রমণ নিয়ে আমেরিকানদের আত্মতুষ্টিকে উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন মোরসে।

তিনি বলেন, ভাইরাস যা করে করুক, আমি খুব অবাক হব যদি আমাদের আগ্রহ আরো ছয় মাস পর্যন্ত বজায় থাকে। সতর্কতা বজায় রাখা যেমন সামাজিক দূরত্ব মেনে চলা, মাস্ক পরা, হাত ধোয়া ভাইরাসের সংক্রমণকে উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে এসব নিয়ে অবহেলার বিষয়টিও চলে আসবে।

আদালজার মতে, এক বছর পর আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হবে সবার ভ্যাকসিন প্রাপ্তি। তিনি বলেন, ২০২১ সালের মাঝে যদি ভ্যাকসিন আসে, তবে তার বণ্টন ও সবার প্রাপ্তিই হবে জটিল বিষয়।

সায়েন্স অ্যালার্ট

আরও