কখন পৃথিবী আবার সে সময়ে ফিরে যেতে পারবে, যখন আমরা কারো সঙ্গে আবার কফির কাপ হাতে নেব, সিনেমা দেখব কিংবা কনসার্ট উপভোগ করতে পারব? মতামতগুলো দুটো বিকল্পের কথা বলছে—একটি কার্যকর ভ্যাকসিন কিংবা ৬০ থেকে ৮০ শতাংশ মানুষকে সংক্রমিত হতে দিয়ে হার্ড ইমিউনিটি অর্জন করা। এর যেকোনো একটি উপায়ে মানুষ সার্স-কোভ-২ থেকে ইমিউনিটি অর্জন করতে পারে।
নতুন একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা গত সপ্তাহে অনলাইনে প্রকাশিত হয়েছে, যেখানে দেখানো হয়েছে ২০২১ সাল কিংবা তার পরও আমাদের ভবিষ্যৎ কেমন দেখাবে তা। এটা বলছে, সার্স-কোভ-২-এর বিপরীতে আমাদের ইমিউনিটি খুব বেশিদিন থাকে না। কোনো কোনো মানুষের ক্ষেত্রে এটি থাকে দুই সপ্তাহ পর্যন্ত। যদি তেমনটা হয় তবে একটি কার্যকর ভ্যাকসিনই প্রয়োজন এবং হার্ড ইমিউনিটি একেবারেই কার্যকর না।
ইমিউনিটি হ্রাস পায়
অ্যান্টিবডি আমাদের ইমিউন সিস্টেমের গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যা প্রধানত কাজ করে শারীরিকভাবে ভাইরাসের কণাকে আবদ্ধ করে এবং কোষকে সংক্রমিত করা থেকে আটকে দিয়ে।
আমাদের টি-সেলও রয়েছে, আমাদের ইমিউন সিস্টেমের আরেকটি অংশ যা কিনা চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে এবং ভাইরাস সংক্রামক কোষগুলো মারার জন্য অনেক ভালো। কিন্তু কভিড-১৯-এর ক্ষেত্রে অ্যান্টিবডিগুলো ফুসফুসের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এয়ারওয়েতে প্রবেশের ক্ষেত্রে টি-সেল ভালো না। যেখানে ভাইরাস প্রথম আক্রমণ করে।
কিংস কলেজ লন্ডনে কাইটে ডোরস এবং তার দল কর্তৃক সদ্য প্রকাশিত গবেষণা দেখাচ্ছে, কভিড-১৯ আক্রান্ত মানুষের ক্ষেত্রে কত দীর্ঘ সময় পর্যন্ত অ্যান্টিবডির প্রতিক্রিয়া থাকতে পারে। এটি জার্নালে জমা দেয়া হয়েছে কিন্তু এখনো পিআর-রিভিউ করা হয়নি। তাই একে কিছুটা সতর্কতার সঙ্গে দেখাই ভালো।
এখানে ৬৫ জন রোগীর মাঝে ৬৩ জনের শরীরেই অ্যান্টিবডি প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে। গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল এই প্রতিক্রিয়া কতটা ভালো তা। এটি পরিমাপ করা হয়েছে সংক্রামক সার্স-কোভ-২ ভাইরাসের সঙ্গে রোগীর ব্লাড সেরামকে একসঙ্গে রেখে এবং দেখা হয়েছে ভাইরাস ল্যাব ডিশে রাখা কোষকে সংক্রমিত করতে পারে কিনা তা। এটাকে বলা হয়, ‘নিউট্রালাইজেশন অ্যাসে’
এবং এর ফল ভালো এসেছে। প্রায় ৬০ শতাংশ মানুষ উত্পন্ন করেছে খুব শক্তিশালী নিউট্রাল বা নিরপেক্ষ প্রতিক্রিয়া যা কিনা ল্যাব সেলে ভাইরাসের বিকাশকে থামিয়ে দিয়েছে।
সবশেষে, গবেষকরা দেখেছেন অ্যান্টিবডি প্রতিক্রিয়া কতক্ষণ পর্যন্ত টিকে থাকতে পারে। এটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ডাটা। দুর্ভাগ্যজনকভাবে অ্যান্টিবডি লেভেল ২০ দিন পর থেকে নামতে শুরু করে এবং ৫৭ দিন পর কেবল ১৭ শতাংশ রোগী শক্তিশালী স্তর ধরে রাখতে পারে। অনেক রোগী দুই মাস পর পুরোপুরিভাবে তাদের অ্যান্টিবডি হারিয়ে ফেলতে পারে।
এটি বলছে সার্স-কোভ-২-এর বিপরীতে আমাদের ইমিউন প্রতিক্রিয়া আমাদের কল্পনার চেয়েও অতি দ্রুত হারাতে পারে। ফলে মানুষের এর পরও সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কা থেকে যাচ্ছে।
একটি ভ্যাকসিন যথেষ্ট নাও হতে পারে
যা সম্ভাবনা আছে তা হলো কভিড-১৯-এর ভ্যাকসিন আমাদের প্রত্যাশামতো কার্যকর নাও হতে পারে। ব্যাপার হলো অ্যান্টিবডির স্তর সময়ের সঙ্গে কমে যাওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সাধারণত তা অনেক শ্লথভাবে হয়ে থাকে। মাম্পস, হাম ও চিকেন পক্সের ভাইরাসের বিপরীতে অ্যান্টিভাইরাস ৫০ বছর পর্যন্ত টিকে থাকে। একটি টিটেনাস ভ্যাকসিন আরো দ্রুত ক্ষয়ে যায়। তার পরও রিবোস্ট করার আগ পর্যন্ত ৫-১০ বছর পর্যন্ত এটি টিকে থাকতে পারে।
করোনাভাইরাসের চারটি সাধারণ স্ট্রেইন, যা কিনা মানুষের সাধারণ সর্দি-কাশি সৃষ্টি করে তাও দীর্ঘ সময় ধরে ইমিউন রেসপন্স জানাতে ব্যর্থ হয়। যেখানে বেশির ভাগ মানুষ ৬ থেকে ১২ মাসের মাঝেই নিজেদের অ্যান্টিবডি পুরোপুরিভাবে হারিয়ে ফেলে। সাধারণত যা দেখা যায় তা হলো করোনাভাইরাসগুলো আমাদের প্রতিরোধ ব্যবস্থা দ্বারা ভালোভাবে চিহ্নিত হয় না। প্রকৃতপক্ষে সাধারণ ঠান্ডা জ্বরের করোনাভাইরাসগুলোর একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে মানুষ এগুলোতে বারবার সংক্রমিত হয়।
সার্স, আরেকটি করোনাভাইরাস যা কিনা ২০০৩ সালের মহামারীর কারণ, যা কিনা আরেকটু দীর্ঘমেয়াদি অ্যান্টিবডি প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে, যা টিকে থাকতে পারে তিন বছর পর্যন্ত।
হার্ড ইমিউনিটি
সুতরাং কেউ কেউ মনে করেন হার্ড ইমিউনিটি হয়তো কোনো সমাধান না। এর কারণ যদি ইমিউনিটি অল্প সময়ের জন্য প্রাপ্ত হয়, তবে পুনঃসংক্রমিত হওয়ার ধারা চলমান থাকতে পারে। হার্ড ইমিউনিটিকে কার্যকর হতে হলে আমাদের সম্ভবত ৬০ শতাংশ মানুষকে ইমিউন হতে হবে। তার ফলেই সংক্রমণের চেইন নষ্ট হতে পারে। তবে অনেক মানুষ যদি বারবার সংক্রমিত হতে থাকে, তবে তা সম্ভব হবে না।
প্রত্যাশা হচ্ছে কভিড-১৯-এ আক্রান্ত হয়ে ভালো হওয়ার চেয়ে, ভ্যাকসিন বরং অনেক বেশি শক্তিশালী ও দীর্ঘমেয়াদি ইমিউন দিতে পারবে।
স্ক্রলডটইন