কভিড-১৯ কি গণতন্ত্রকে খুন করছে?

আরো উদ্বেগজনক ও পীড়াদায়ক বিষয় হলো, সংকটটিকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন দেশে গণতন্ত্রকে অবমূল্যায়নের লোকরঞ্জনবাদী প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবানের প্রচেষ্টা এক্ষেত্রে একটি বড় উদাহরণ। মুক্ত সংবাদমাধ্যম, এনজিও এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে গত এক দশকে আক্রমণের সুবাদে অরবান কভিড-১৯ সংকটকে অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য নিজ শাসনকে পাকাপোক্ত করতে আইনগত পথ সন্ধানের অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করছে। অ্যাডল্ফ হিটলারে

কভিড-১৯ সংকটের অর্থনৈতিক পরিণাম ও ক্ষতি বর্তমানে প্রায় প্রত্যেকের চিন্তাকে আচ্ছন্ন করেছে, জন-আলোচনায় এটিই এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। এদিকে যথার্থ কারণেই ইউরোপীয় ইউনিয়ন নিজ ইতিহাসের সবচেয়ে খারাপ মন্দার দিকে যাত্রা করছে। প্রাক্কলন করা হচ্ছে, চলতি বছর সংস্থাটির সঙ্গে একীভূত দেশগুলোর সার্বিক অর্থনীতি প্রায় ৭-১২ শতাংশে সংকোচিত হবে। তবে গণতন্ত্রের ওপর চলমান মহামারী-সৃষ্ট বিপদ সম্পর্কে যতটা কম বলা হচ্ছে, সংকেতগুলো কিন্তু তার চেয়ে অধিক অশুভ বা অমঙ্গলজনক। 

মহামারীর অর্থনৈতিক প্রভাব প্রশমনে ইউরোপীয় ইউনিয়ন দ্রুত কাজ করে চলেছে। ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক (ইসিবি) ব্যতিক্রমী আর্থিক পদক্ষেপ নিয়েছে এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন ১-১ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ইউরোর ( ১-১ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ডলার সমমূল্যের) একটি পুনরুদ্ধার ও পুনর্গঠন প্যাকেজ প্রবর্তন করেছে। ইইউ পুনরুদ্ধার প্যাকেজ কীভাবে অর্থায়ন করা হবে তা নিয়ে যদিও মতভিন্নতা আছে, তবে এর প্রাথমিক লক্ষ্যটা সোজা-সাপ্টা। আর তা হলো- একটি ধীরগতিসম্পন্ন ইউ-আকৃতির পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা থাকলেও একটি জোরোলো ভি-আকৃতির পুনরুদ্ধার নিশ্চিত করা।  

একটি সোজাসাপ্টা অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের বাইরে যাওয়া অবশ্য একটি সবুজ, ডিজিটাইজড ইউরোপীয় অর্থনীতি গঠনের একটি সম্মিলিত আকাক্সক্ষাও বটে। আক্ষরিক অর্থে প্রত্যেকেই সম্মত যে কভিড-১৯ সংকট এ ধরনের রূপান্তর বেগবান করার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগের প্রতিফলন ঘটায়, যদিও ইউরোপীয় ইউনিয়ন সেটি কাজে লাগাবে কিনা, সে সম্পর্কে এখনো সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি।

ইতিবাচক ফল অবশ্য অংশত নির্ভর করবে ইউরোপের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোয় পড়া মহামারীর প্রভাবের ওপর। যতটা মনে হচ্ছে তাতে যথেষ্ট উদ্বেগের কারণ রয়েছে। 

প্রাতিষ্ঠানিক পরিপ্রেক্ষিত থেকে সবচেয়ে বড় হুমকি আসে জার্মানির ফেডারেল সাংবিধানিক আদালত থেকে, যেটি সম্প্রতি আদেশ জারি করেছে যে ইসিবির পাবলিক সেক্টরের সম্পদ ক্রয়ের বিষয় পর্যাপ্তভাবে তদারকি করতে ব্যর্থতার মাধ্যমে জার্মান সরকার দেশটির মৌলিক আইন লঙ্ঘন করেছে। এই আদেশ বাস্তবতা থেকে (আজকে ইউরোপীয় অর্থনীতিকে বাঁচানো সর্বোচ্চ প্রাধিকার হতে হবে)  কেবল লক্ষণীয়ভাবে বিযুক্ত নয়, উপরন্তু ইউরোপীয় ইউনিয়নের চুক্তির প্রতি অবজ্ঞারও সমতুল্য। 

সংস্থাটি তার এখতিয়ারের সীমা লঙ্ঘন করছে কিনা তার তত্ত্বাবধানসহ ইসিবির কর্মকাণ্ড নিরীক্ষণের বিচারিক দায়িত্ব ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিচার আদালতের ওপর বর্তায়, যেটি ২০১৮ সালে ইসিবির সম্পদ ক্রয়ের বিষয়টিকে আইনসঙ্গত বিবেচনা করেছে। তবু জার্মান আদালত জোর খাটানো যুক্তি ব্যবহার করে দাবি করেছে যে আলোচ্য রুলিং দ্বারা তারা বাধিত নয়। জার্মান আদালতের এ তৎপরতা আসলে দেশটির অর্থনৈতিক বৈষম্য-কুসংস্কার বাকি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যদের ওপর চাপানোর প্রচেষ্টা মাত্র।

এদিকে আরো উদ্বেগজনক ও পীড়াদায়ক বিষয় হলো, সংকটটিকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন দেশে গণতন্ত্রকে অবমূল্যায়নের লোকরঞ্জনবাদী প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবানের প্রচেষ্টা এক্ষেত্রে একটি বড় উদাহরণ। মুক্ত সংবাদমাধ্যম, এনজিও এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে গত এক দশকে আক্রমণের সুবাদে অরবান কভিড-১৯ সংকটকে অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য নিজ শাসনকে পাকাপোক্ত করতে আইনগত পথ সন্ধানের অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করছে। অ্যাডল্ফ হিটলারের ১৯৩৩ সালের আইনের পর এটি ইউরোপের ইতিহাসের প্রথম এ ধরনের স্বৈরতান্ত্রিক ধাপ।  

রাশিয়াতে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আঘাত আরো নির্মম। কভিড-১৯ আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসাসেবা প্রদানকারী তিনজন চিকিৎসককে সম্প্রতি হাসপাতালের জানালা দিয়ে রহস্যজনকভাবে ফেলে দেয়া হয়েছে দুর্বলভাবে সংকট সামলানোর ব্যাপারে দেশটির সরকারের প্রক্রিয়া নিয়ে সমালোচনা করা বা প্রশ্ন তোলার কারণে। এ ঘটনা দেখে যেকারোরই জেন মাসারিকের ভাগ্য স্মরণ করা ছাড়া গত্যন্তর নেই, ১৯৪৮ সালের মার্চে কমিউনিস্ট শাসন শুরুর দুই সপ্তাহের মাথায় চেকোস্লাভাকীয় যে পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে নিজের বাসভবনের জানালার নিচে মৃত অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল।

গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের ওপর আঘাতের এই প্রবণতা ইউরোপে অবশ্য এখনো খুব কমই সীমিত। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল এবং ভারতসহ বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশগুলো খুব দ্রুততার সঙ্গে এ ধরনের নেতিবাচকতার দিকে ধাবমান। 

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মহামারীকে রাজনৈতিক রঙ দিতে সমর্থ হয়েছে। বিশেষত তিনি ডেমোক্রেটসমর্থিত গভর্নরদের সাহায্য করা, প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য সরঞ্জাম নিশ্চিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। এমনকি ব্যক্তিগতভাবে অর্ডার দেয়া সরঞ্জামগুলো গন্তব্যে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে তিনি বাধা সৃষ্টির চেষ্টা করেছে। অধিকন্তু, গণতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণের অধীনে তিনি মিশিগান ও মিনেসোটার অঙ্গরাজ্যগুলোতে ঘরে থাকার নির্দেশ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে আসছে। 

ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারো-ও একই পথ অনুসরণ করছে, বরং তিনি সেটি করছেন আরো প্রকাশ্যে, সহিংস ও স্বৈরতান্ত্রিক উপায়ে। দুর্বলভাবে পরিপালিত লকডাউন কয়েক মিলিয়ন ভারতীয় নাগরিককে কাজ ছাড়া এবং রাতারাতি ক্ষুধার্ত মানুষে পরিণত করলেও মোদি সরকার ভাইরাস সংক্রমণ বিস্তারের দায় হিসেবে মুসলিম বিরোধী এজেন্ডাকে কাজে লাগাচ্ছে। 

সবচেয়ে শঙ্কার বিষয় হলো, গণতন্ত্রের ওপর এ ধরনের আঘাত আন্তর্জাতিক মনোযোগ খুব একটা পায়নি। বৈশ্বিক সংবাদমাধ্যমগুলো কভিড-১৯ এর সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক পরিণাম নিয়ে এতটাই নিমজ্জিত যে সেখানে এর রাজনৈতিক প্রভাব আপাতভাবে তেমন উঠে আসছে না। বিশেষভাবে এটি সত্য, যখন কনট্যাক্ট-ট্রেসিং অ্যাপস কভারেজের প্রসঙ্গে আসে। সম্ভবত সব গণতান্ত্রিক দেশের জন্য এটিই হলো সম্ভবত বড় হুমকি। 

ব্যবহারকারীদের কভিড-১৯ এ সম্ভাব্য এক্সোপাজার সম্পর্কে  জানান দেয়ার মাধ্যমে কনট্যাক্ট-ট্রেসিং অ্যাপগুলো সম্ভবত জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি কম রেখে অর্থনীতিগুলো খুলে দেয়ার ক্ষেত্রে প্রধান চাবিকাঠি হবে। যদিও সবচেয়ে ‘সিকিউর ভার্সন’ ( যা ব্লুটুথ, এনক্রিপ্ট ডেটা ব্যবহার এবং নাম গোপন রাখার প্রতিশ্রুতি দেয়) ব্যবহার করলেও এইৎ অ্যাপ ব্যক্তিগত গোপনীয়তার কিছু ঘোরতর প্রশ্ন সামনে আনে।  

হ্যাকারদের কাছ থেকে এসব তথ্যের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা কে দেবে? আমি যদি অ্যাপটি ডিলিট করতে চাই, তাহলে আমার সব তথ্য মুছে যাবে কিনা? এবং সেটি কতটা দ্রুত? কোন বিষয়টি নিশ্চিত করে যে সরকারগুলো এ অ্যাপকে বাধ্যতামূলক করবে না? মহামারীকালে তারা যদি এ অ্যাপ বাধ্যতামূলক করে, তাহলে পরবর্তীতে ওই পথ বজায় না রাখা থেকে কোন বিষয়টি তাদের থামাবে? এসব প্রশ্ন আমাদের সাংবিধানিক অধিকার ও স্বাধীনতার কেন্দ্রীয় বিষয়ের মধ্যেই নিহিত।

কনট্যাক্ট-ট্রেসিং অ্যাপগুলোর গণব্যবহার হলো একটি পিচ্ছিল ঢাল। অনেক আগে ইউরোপীয়, আমেরিকান কিংবা অন্যরা চীনাদের মতো জীবনযাপন করত। প্রতিটি পদক্ষেপই মনিটর করা হতো, প্রতিটি লঙ্ঘনেই অলিখিত বিধি দ্বারা শাস্তি দেয়া হতো এবং পার্সোনাল রেটিংয়ের ভিত্তিতে ভ্রমণ এবং সরকারি সেবার প্রবেশাধিকারের ক্ষেত্রে মানুষ সুযোগ পেত।

এটি অস্বাভাবিক মনে হতে পারে, তবে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা নাজুক হতে পারে সেটি দেখার জন্য হাঙ্গেরি কিংবা পোল্যান্ডের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোই কেবল বিবেচনার জন্য যথেষ্ট হবে। আমরা যদি আগে-ভাগে সজাগ না হই, তাহলে কভিড ১৯ এর সবচেয়ে বড় শিকার হতে পারে গণতন্ত্র এবং বিভিন্ন দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো।  

[স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট] 

 গি ভারহফস্টাড: বেলজিয়ামের সাবেক প্রধানমন্ত্রী, ইউরোপীয় পার্লামেন্টে দ্য অ্যালায়েন্স অব লিবারেলস অ্যান্ড ডেমোক্রেটস ফর ইউরোপ গ্রুপের (এএলডিই) সভাপতি

ভাষান্তর: হুমায়ুন কবির

আরও