নভেল করোনাভাইরাস দেশের সমৃদ্ধির পথ ব্যাহত করেছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, আমরা দেশটাকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলাম। এ নভেল করোনাভাইরাস আমাদের সেই যাত্রা অনেকটাই ব্যাহত করেছে। কিন্তু তার পরও আমাদের থেমে থাকলে চলবে না। আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। গতকাল কভিড-১৯ মহামারী মোকাবেলায় প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিলে ৫৭টি প্রতিষ্ঠান, সংস্থা ও ব্যক্তির কাছ থেকে অনুদানের চেক গ্রহণ অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী তার সরকারি বাসভবন গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের (পিএমও) সঙ্গে যুক্ত হন। পিএমওতে মুখ্য সচিব ড. আহমদ কায়কাউস প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে অনুদানের চেক গ্রহণ করেন। প্রধানমন্ত্রী এ সময় সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে কভিড-১৯ মোকাবেলায় সহযোগিতার মানসিকতা নিয়ে এগিয়ে আসা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, সংস্থা ও ব্যক্তিদের তাদের অনুদানের জন্য ধন্যবাদ জানান।
শেখ হাসিনা বলেন, জাতির পিতা দেশকে স্বাধীন করেছেন, তিনি চেয়েছিলেন ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলাদেশ গড়তে। আমরা দারিদ্র্য মুক্তির অনেক পদক্ষেপ নিয়েছিলাম। সফলতাও
পেয়েছিলাম। আমাদের আশা ছিল খুব শিগগিরই বাংলাদেশ দারিদ্র্যমুক্ত হবে। মুজিব বর্ষ থেকে স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীতে (২০২০-২১ সাল) দারিদ্র্যমুক্ত হতে পারব। নভেল করোনাভাইরাসের কারণে সেখানে বিরাট ধাক্কা লেগেছে, বাধা এসেছে। তবে আশা করি, এ বাধা দূর করে বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে, বিশ্বব্যাপী যে সমস্যা সেই সমস্যাটাও দূর হবে। তবে আমি মনে করি, অসুখ-বিসুখ হলে মানুষকে মনে সাহস রাখতে হবে। কারণ শুধু ডাক্তার বা ওষুধ দিয়ে ভালো হবে না। মনের জোর ও আত্মবিশ্বাস থেকেও অনেকটা সুস্থ হওয়া যায়। আর সেই সঙ্গে আমাদের স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে যেসব নির্দেশনা দেয়া হয়েছে, তা সবাইকে মেনে চলতে হবে। সংক্রমিত যাতে না হয়, সেদিকে দৃষ্টি দিতে হবে।
নভেল করোনাভাইরাসে আমাদের অর্থনীতির ওপর বিরাট প্রভাব পড়ছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কারণ দৈনন্দিন জীবনে যারা কাজ করে খেত, তাদের সেই কাজের পথ বন্ধ। লেখাপড়া বন্ধ। অনেক ধরনের আমাদের কর্মসূচি চলত, সেগুলো বন্ধ। জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে আমরা অনেক পদক্ষেপ নিয়েছিলাম, যেটা নভেল করোনাভাইরাসের কারণে টেলিভিশন, রেডিওসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে করতে হয়েছে। অনেক মানুষ আজকে কর্মহীন হয়ে পড়েছে। তাদের জীবনযাপন করাটাই কষ্টকর। যদিও আমরা তাদের সাধ্যমতো সহযোগিতা করার জন্য চেষ্টা করছি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এখন যখন প্রায় সব কাজই বন্ধ, তখন আমাদের কৃষিই হচ্ছে একমাত্র ভরসা। সেই কৃষিকে বাঁচিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করেছি। আমি আহ্বান জানানোর পর আমি আমাদের দল ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীসহ সাধারণ মানুষ কৃষকের জমিতে ধান কাটার জন্য নেমে পড়ে। এজন্য আমি সবাইকে ধন্যবাদ জানাই। আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে নভেল করোনাভাইরাসের কারণে বিশ্বব্যাপী যে দুর্ভিক্ষের আলামত দেখা যাচ্ছে, যে মহামারীর কথা বলা হচ্ছে, তাতে যেন আমাদের দেশের মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। অন্তত তাদের খাদ্য নিরাপত্তা যাতে নিশ্চিত হয়। আমরা সেদিকে দৃষ্টি দিয়েছি। এবার ব্যাপক ধান উৎপাদন হয়েছে। আমাদের খাদ্যের কোনো অভাব নেই। আমরা ব্যাপকভাবে ত্রাণ বিতরণও করে যাচ্ছি।
সরকারপ্রধান বলেন, আমরা সরকারি ও দলীয়ভাবে ত্রাণ বিতরণ করছি। অনেকেই ব্যক্তিগতভাবেও করছে। সাধারণ মানুষ যেভাবে পারছে সাহায্য করছে। এটাই হচ্ছে আমাদের দেশের মানুষের বিরাট আন্তরিকতা। সবাই সবার তরে সহযোগিতা করে যাচ্ছে। এরই মধ্যে আমি বলেছি, এক ইঞ্চি জমিও যাতে অনাবাদি না থাকে। আমি কৃষিমন্ত্রীকে বলেছি, ধান কাটার পর কোন কোন এলাকায় কী কী ফসল ফলাতে পারবে, সেই উৎপাদন যাতে অব্যাহত থাকে। অন্তত খাদ্য নিরাপত্তাটা যাতে নিশ্চিত থাকে। দুর্ভিক্ষ বা মহামারী যেন বাংলাদেশে আসতে না পারে। প্রয়োজনে আমরা যাতে অন্যদের সহযোগিতা করতে পারি।
শেখ হাসিনা বলেন, মানুষ মনে হয় অনেক সময় এত ভীত হয়ে যায় যে সে তখন অমানবিক আচরণ করে। পরিবারের একজন সদস্য যখন অসুস্থ হয়ে পড়ে, তার কী অসুখ হয়েছে তা না জেনেই তাকে দূর দূর করা বা তাকে দূরে ঠেলে দেয়া, এটা কিন্তু ঠিক না। নিজেকে সুরক্ষিত রাখা, গ্লাভস ও মাস্ক পরে পরিবারের সদস্যদের সহযোগিতা করলে খুব একটা ক্ষতি হবে বলে আমি মনে করি না। কিন্তু সন্তান হয়ে পিতাকে দূর করে দেয়া বা স্ত্রী হয়ে স্বামীকে দূর করে দেয়া কিংবা স্বামী ও সন্তান হয়ে স্ত্রী ও মাকে দূর করে দেয়া কল্যাণকর নয়।
তিনি বলেন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী রোগী টানা থেকে শুরু করে লাশ দাফনসহ সব ধরণের কাজ করে যাচ্ছে। তাদের সঙ্গে আমাদের ছাত্রলীগের কর্মীদেরও দেখেছি লাশ দাফন করতে। এই যে মানবিক গুণ, সেটাই হলো মনুষ্যত্ব। এটাই আমাদের বাঙালির সবচেয়ে বড় চরিত্র। এ চরিত্রটা সবার থাকা দরকার বলে আমি মনে করি।
টেলিভিশন ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের মাধ্যমে শিক্ষার পরিবেশ সৃষ্টি করায় সংশ্লিষ্টদের ধন্যবাদ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ক্লাসগুলো প্রচার হচ্ছে, তাতে অন্তত শিক্ষার্থীরা লেখাপড়ায় মনোযোগী হচ্ছে। কারণ ঘরে বসে থেকে এ ছোট শিশুরা কী করবে? তাদের কষ্টটা আজকে সবচেয়ে বেশি। অনেকেই আজকে ফ্ল্যাটে থাকেন। যারা গ্রামে থাকেন তারা তো খোলামেলা জায়গায় থাকেন। কিন্তু শহরে যারা থাকেন, তাদের জন্য খুবই কষ্টকর। আমাদের সংসদ টেলিভিশনের মাধ্যমে ক্লাসগুলো নেয়া হচ্ছে, তা মনোযোগ দিয়ে শোনার জন্য শিক্ষার্থীদের আহ্বান জানাব। কারণ তাতে অন্তত তারা তাদের সিলেবাস সম্পর্কে জানতে পারবে। আর এ রকম অবস্থা থাকবে না, পরিবর্তন আসবেই। আমরা কিছু উন্মুক্ত করার চেষ্টা করছি। কিছু জীবন-জীবিকার ব্যবস্থা যাতে মানুষ করতে পারে, সেই ব্যবস্থা আমরা করছি।