কভিড-১৯ মহামারী কেবল কাজ ও মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি নয়, বিশ্বজুড়ে রাষ্ট্র এবং অর্থনীতিগুলোর মতবাদ ও দর্শনগুলোকেও পরিবর্তন করেছে। উদারবাদী দৃষ্টিভঙ্গি ও উদার গণতন্ত্র দেখানো বাজার তত্ত্ববিদ ও বাজার কট্টরতাবাদীরা মুক্ত চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে রাতারাতি রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপবাদী, কর্তৃত্ববাদী এবং একনায়কতান্ত্রিকে রূপান্তরিত হয়েছে। এসব হলো সময়ের বাধ্যবাধকতা এবং অস্তিত্বের মৌলিক বিষয় (ফান্ডামেন্টালস)। সমাজের প্রতি পুরনো ধ্রুপদী পুঁজিবাদী দৃষ্টিভঙ্গি হলো যে অর্থনীতি ও উৎপাদনের জন্য মানুষ অত্যাবশ্যক। মানুষের শ্রমক্ষমতা তাদের জীবনের চেয়ে অধিক গুরুত্বপূর্ণ। দুই বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে চতুর ও জ্ঞানদীপ্ত পুঁজিবাদীরা পুঁজিবাদী প্রবৃদ্ধি ও পুনরুৎপাদনের একটি টেকসই উৎপাদনশীল ব্যবস্থা জারি রাখার উদ্দেশ্যে আন্তঃপ্রাজন্মিক শ্রমশক্তির সরবরাহ নিশ্চিতে নির্মম-কঠোর ধনতান্ত্রিক নীতি ও ভূমিকা পরিবর্তন করে নিজেদের ‘কল্যাণকামী’-তে রূপান্তর করেছে। কভিড-১৯-এর সাম্প্রতিক প্রাদুর্ভাব তাতে মৌলিকভাবে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। কারণ এটি কেবল অর্থনীতি ও উৎপাদন নয়; অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থান নির্বিশেষে ধরিত্রীর সব মানুষের অস্তিত্বের জন্যও হুমকি সৃষ্টি করেছে। ব্রিটিশরাজের প্রথম সারির উত্তরাধিকার, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী, সৌদি রাজপরিবারের ১৫০ জন সদস্য, ইরানের আয়াতুল্লাহ খোমেনির মতো রাজনৈতিক তারকা থেকে শুরু করে চলচ্চিত্র তারকা, ক্রীড়া তারকা, ব্যবসা ও মিডিয়া তারকাসহ কে নেই করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ও মৃত্যু তালিকায়! বৈশ্বিকভাবে এটি অদৃশ্য শত্রুর বিরুদ্ধে ‘মহামারী যুদ্ধ’। এতদিন উৎপাদিত ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলারের অস্ত্র-গোলাবারুদ অর্থহীন, যুদ্ধবাজরা নিদারুণভাবে আজ অসহায় প্রমাণিত হয়েছে। অন্যদিকে অর্থনীতি, অর্থনীতিবিদরা এবং নীতি মানুষের কাছে ধাঁধাময়, প্রহেলিকাময় মনে হচ্ছে। সবখানেই একটি কথা—‘জীবন আগে, অর্থনীতি পরে পুনরুদ্ধার করা যাবে।’
করোনা এবং করোনা-উত্তর সময়ে আমরা বোধহয় একটি নতুন ‘বিশ্ব ব্যবস্থার’ দিকে যাচ্ছি, যেটি অর্থনৈতিক ও আর্থিক সংকট (১৯৩০-এর দশক, ১৯৪০-এর দশক, ১৯৭৩, ১৯৯৭, ২০০৮ সাল), মহামারীগুলো (অন্তত ৫৪০ খ্রিস্টাব্দের পর থেকে অন্তত ২০টি মহামারী) এবং দুই বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাসে হবে সবচেয়ে নজিরবিহীন। আগের কোনো বিপর্যয়ই মাত্র পাঁচ মাসের মধ্যে এত দেশ ও রাষ্ট্রকে পর্যুদস্ত করেনি, ২০১৯ সালের ডিসেম্বর থেকে যা ঘটেছে। আতঙ্ক ছড়ানোর দিক থেকে ১৮ শতকের পরে কোনো মহামারীই এত বিপর্যয়কর হয়ে আবির্ভূত হয়নি। ফলে নতুন বিশ্ব ব্যবস্থা অত্যাসন্ন, যা একটি নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থাও সৃষ্টি করতে পারে। এমনকি এটি অন্তত এক দশকের জন্য ‘প্যানডেমিক ড্রিভেন ইকোনমিক অর্ডার’ নামেও পরিচিত হতে পারে। এই নতুন ব্যবস্থায় সব রাসায়নিক ও জীবাণু অস্ত্র নিষিদ্ধ করতে হবে, অস্ত্র উৎপাদন ও বিক্রি, যুদ্ধ বন্ধ করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ সুরক্ষা এবং জনস্বাস্থ্যকে বৈশ্বিকভাবে প্রথম কয়েকটি প্রাধিকারের শীর্ষে নিয়ে আসতে হবে।
বর্তমানে বৈশ্বিকভাবে একটি প্রতিকূল প্রভাব পড়ছে যে অধিক থেকে অধিকতর ক্ষমতা রাষ্ট্রীয় নির্বাহীদের হাতে পুঞ্জীভূত হচ্ছে, যদিও সেগুলো অপ্রয়োজনীয়। সেটি অবশ্যই বন্ধ হওয়া উচিত। আমাদের অধিক গণতন্ত্র প্রয়োজন এবং বিকেন্দ্রীকরণই হবে চলমান সংকটের সবচেয়ে জরুরি শিক্ষা। বিকেন্দ্রীকরণ প্রসঙ্গে কভিড-১৯ নিয়ন্ত্রণে কেরালার অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো যেতে পারে। কেরালা পঞ্চায়েত ব্যবস্থাকে সফলভাবে তৃণমূল পর্যায়ে কাজে লাগিয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে।
বর্তমানে ‘জীবনসংগ্রামে’ যুক্তরাষ্ট্র সম্ভবত শীর্ষে থাকবে। ক্ষমতাসীন মার্কিন প্রশাসন ২ ট্রিলিয়ন ডলারের প্যানডেমিক প্যাকেজের ঘোষণা দিয়েছে, যা দেশটির জিডিপির প্রায় ১০ শতাংশ। অন্য সব জি২০ দেশও একই ধরনের কাজ অনুসরণ করছে। ভারত সরকারের প্রাথমিক প্যাকেজের অর্থমূল্য ১ দশমিক ৭ লাখ কোটি রুপি, যা দেশটির জিডিপির ১ শতাংশ সমতুল্য। অমর্ত্য সেন, অভিজিৎ ব্যানার্জি, এস্তার দুফলো, অরবিন্দ সুব্রামানিয়াম, কৌশিক বসু, অমিত সেরুর মতো বৈশ্বিকভাবে বিখ্যাত ভারতীয় অর্থনীতিবিদ এবং আরো অনেকেই প্যাকেজটি অন্তত ৬-৭ লাখ কোটি রুপিতে উন্নীত করতে পরামর্শ দিচ্ছেন; যা হবে জিডিপির ৪-৫ শতাংশ। বাংলাদেশও ৯২ হাজার কোটি টাকার একটি প্যাকেজ ঘোষণা করেছে, যা জিডিপির ৩ শতাংশের কম নয়। তবে এ প্যাকেজের বেশির ভাগই শিল্প ও ব্যবসা খাতের জন্য নমনীয় ঋণ। এসবই প্রাথমিকভাবে সংকট প্রশমনের কিছু যত্নশীল পদক্ষেপ। সংকট ঘিরে এখনো প্রচুর অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। সংকট-পরবর্তী সাড়া পদক্ষেপগুলো (রেসপন্স মেজারগুলো) এখনো অপেক্ষমাণ রয়েছে।
আমরা এখনো বাংলাদেশী অর্থনীতিবিদদের উল্লেখযোগ্য কোনো বিবৃতি শুনিনি। কেবল রাজনীতিবিদরাই সব আশাবাদী মন্তব্য করছেন। এমনকি প্রথম দিকে স্বাস্থ্য পেশাজীবীরাও নিজেদের মুখ খুলতে লজ্জাবনত ছিলেন। টিভি টক শোগুলো করোনা নির্দেশনা প্রচার, বিক্ষিপ্ত আলোচনায় ব্যস্ত এবং সরকার প্রতিদিন আক্রান্তের সংখ্যা ও মৃত্যুর পরিসংখ্যান প্রকাশ করছে। আমাদের অনেকের দান-অনুদান-ত্রাণ বিতরণ এবং বিভিন্ন গোষ্ঠীর স্বেচ্ছাসেবামূলক উদ্যোগ গ্রহণের খবর সংবাদমাধ্যমে আসছে। আমাদের করোনা মোকাবেলার পদক্ষেপ এখনো লক্ষণীয়ভাবে কম এবং তা অনেকটা বিলম্বিতও। এখানে দূরদর্শিতার বেশ অভাব দৃশ্যমান এবং মনে হচ্ছে দীর্ঘমেয়াদি পরিণামের জন্য আমরা প্রস্তুত নই। হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য পেশাজীবীরা মনে হচ্ছে যথাযথ সুরক্ষা সরঞ্জাম নিয়ে তৈরি নয়। এখন পর্যন্ত আগ্রাসীভাবে পরীক্ষা শুরু হয়নি। যাত্রীবাহী বিমান আসা এখনো বন্ধ হয়নি এবং লোকগুলো বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে পড়ছে।
আমাদের প্রণোদনা প্যাকেজ প্রধানত শিল্প, উৎপাদন ও অর্থনীতিকেন্দ্রিক; মানুষকেন্দ্রিক নয়। মনে হয় শিল্প প্রণোদনায় কেন্দ্রে রয়েছে পোশাক শিল্প, যা জিডিপিতে একাই ৬ শতাংশ অবদান রাখে। কৃষি, গ্রামীণ ও শহুরে অনানুষ্ঠানিক খাত, প্রবাসী শ্রমিক, অন্য বাকি শিল্প ও সেবা খাত মিলিয়ে জিডিপিতে অবদান রাখে ৯৪ শতাংশ। প্রবৃদ্ধি গুরুত্বপূর্ণ, তবে অর্থশাস্ত্রের বাইরের একজন মানুষ হিসেবে আমি মনে করি, এ মুহূর্তে প্রবৃদ্ধি ও মধ্য-দীর্ঘমেয়াদি সব উদ্বেগের চেয়ে মানুষ ও তাদের জীবন অধিক গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের তাত্ক্ষণিক প্রাধিকার হলো মানুষের জীবন বাঁচানো, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের বিষয় এর পরে আসবে।
এখানে আমি জোর দিতে চাই যে বিশ্বখ্যাত ভারতীয় বংশোদ্ভূত অর্থনীতিবিদরা ভারত সরকারকে পরামর্শ দিচ্ছেন। তারা বলছেন যে প্রবৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক স্থায়িত্বশীলতা গুরুত্বপূর্ণ। অর্থনীতি ও জীবনের মধ্যে কোনো ট্রেড অফ থাকতে পারে না এবং উচিতও নয়। জীবনের সাপোর্টের জন্য অর্থনৈতিক স্থায়িত্বশীলতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তবে সুনির্দিষ্ট সময়ের সংকট প্রাধিকার নির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। তাদের পরামর্শ হলো, আগামী ১২ মাসের মধ্যে করোনা-উত্তর অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার সম্ভব। অন্তত পরবর্তী তিন মাসের জন্য সম্ভাব্য সব পথ ও উপায়ে ভাইরাসের মোকাবেলা করায় সব প্রচেষ্টা নিয়োজন এবং অন্য ন্যূনতম মৌলিক প্রয়োজনের সঙ্গে খাদ্য সরবরাহ জারি রাখা জরুরি। মহামারী সংকট পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে তিন মাসের সুশৃঙ্খল ও কঠোর প্রচেষ্টা (রেজিমেন্টেড এফোর্ট) দরকার। এক্ষেত্রে চীন ও দক্ষিণ কোরিয়ার অভিজ্ঞতা আমাদের পথ দেখায়।
আমাদের স্বাস্থ্য অবকাঠামো অবশ্য দেশগুলোর সঙ্গে খুব একটা সংগতিপূর্ণ নয়। আমরা বাস করি খুবই ভঙ্গুর স্বাস্থ্যসেবা পরিস্থিতিতে। আমাদের আছে গ্রামভিত্তিক কমিউনিটি ক্লিনিক, ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, জেলা পর্যায়ের হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজগুলো। স্বাস্থ্য খাত উন্নয়নের ৮০ শতাংশ ব্যয় হয় অবকাঠামো নির্মাণে আর ৯০ শতাংশ খরচ পেশাজীবীদের বেতন প্রদানে। প্রকৃত স্বাস্থ্যসেবার বিষয়ে একটি বড় প্রশ্ন বিদ্যমান। ধনীরা এখানে চিকিৎসা নেন না, মধ্যবিত্তরা ব্যক্তি খাতের হাসপাতালগুলোর ওপর নির্ভর করতে বাধ্য এবং কেবল দরিদ্ররাই সরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের ওপর নির্ভরশীল। আমাদের সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকরা নির্বিচারে ব্যক্তিগত প্র্যাকটিসে সম্পৃক্ত। চলমান মহামারীতে সব ভার-চাপ পড়ছে দুর্বল সরকারি খাতের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ওপর। সরকারি খাতের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা এই ভার বহন করতে পারবে কি? উল্লিখিত অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের উপায়-পদ্ধতি, উপকরণ-সরঞ্জাম ও স্বাস্থ্য পেশাজীবী (যেগুলোর মধ্যে চিকিৎসক, সেবিকা, মেডিকেল প্রযুক্তিবিদ, হাসপাতাল শয্যা, আইসিইউ, ভেন্টিলেশন সুবিধা প্রভৃতি অন্তর্ভুক্ত) এবং সংকটকালীন সার্বিক চাহিদাসহ সার্বিক সক্ষমতার দ্রুত মূল্যায়ন করতে হবে। নভেল করোনাভাইরাস মোকাবেলায় পুরো জাতিকে একটি একক এজেন্ডায় পরিচালিত করতে হবে। এখানে স্বাস্থ্য পেশাজীবীরা হলেন অগ্রভাগের যোদ্ধা। তাদের প্রয়োজনীয় সব সাপোর্ট দিতে হবে। সাধারণ প্রশাসন, পুলিশ, সেনাবাহিনী, দেশের ধনবান শ্রেণী, রাজনীতিবিদ, স্থানীয় সরকারের নেতারাসহ অন্য সবারই হওয়া উচিত অগ্রভাগের যোদ্ধাদের পৃষ্ঠপোষকতা দেয়ার দ্বিতীয় সারির যোদ্ধা। অন্যদিকে জনগোষ্ঠী বা সম্প্রদায়গত ব্যবস্থাপনা আরেকটি দিক, যেটি কঠোরভাবে সামলাতে হবে। সরকার এরই মধ্যে তা শুরু করেছে, সবাইকে অবশ্যই সরকারকে সহায়তা করতে হবে। সীমাবদ্ধতা যাই হোক, আমাদের আন্তরিক অঙ্গীকারই পারে এ সংকট থেকে উত্তরণে সাহায্য করতে।
একটু দেরি হলেও এ মুহূর্তে নিম্নোক্ত প্রাধিকার পদক্ষেপগুলো সরকার ও জনসাধারণের বিবেচনায় নেয়া উচিত। এক. সব হটস্পট অন্তত এক মাসের জন্য পুরোপুরি লকডাউন করা এবং সেখান থেকে অন্য জায়গায় আসা-যাওয়ায় কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ। দুই. যথাযথ পরীক্ষা ও আলাদাকরণের মাধ্যমে রোগী শনাক্তকরণের ব্যাপকতর প্রচেষ্টা নেয়া এবং চিহ্নিত রোগীদের চিকিৎসা নিশ্চিত করা। তিন. অভাবী জনগোষ্ঠীর দোরগোড়ায় খাদ্য ও অন্য অত্যাবশ্যকীয় পণ্য পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা করা। চার. অত্যাবশ্যকীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম-যন্ত্রপাতি ক্রয় করা, সেগুলোর সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং নির্ধারিত সব হাসপাতাল ও হেলথ আউটপোস্টে সেগুলোর (যন্ত্রপাতি ও ওষুধ) ব্যবহার নিশ্চিত করা।
মধ্য মের আগে মানুষের চলাচল শিথিল করা যাবে না। অর্ধেক আসন সামর্থ্য নিয়ে সীমিতভাবে ট্রেন চলাচল মে থেকে শুরু করতে পারে। একইভাবে অভ্যন্তরীণ এয়ারলাইনস চলাচল করা যেতে পারে। সব ধরনের মেডিকেলসংক্রান্ত পূর্বসর্তকতা অবলম্বন করে ট্রাক চলাচল নিশ্চিত করা যেতে পারে। পুরো দেশে পণ্যের সহজ চলাচলের জন্য একটি বৃহৎ ট্রাক ফ্লিট পরিচালনা করা যেতে পারে। সরকারের বিভিন্ন বিভাগের মালিকানাধীন ট্রাক ও পিকআপগুলো প্রথমে পরিচালিত হতে হবে এবং করোনাসংক্রান্ত গঠিত জেলা কমিটিগুলোকে ত্রাণ উপকরণ বহনের জন্য উল্লিখিত পরিবহন ব্যবহারের কর্তৃত্ব দিতে হবে। সর্বোচ্চ সক্ষমতা দিয়ে চট্টগ্রাম বন্দর পরিচালনা করা যেতে পারে। দেশকে সচল রাখতে ১৫ মে নাগাদ সব অফিস ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনলাইনে তাদের সীমিত কার্যক্রম শুরু করতে পারে।
দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রাধিকারগুলো নিচে বর্ণনা করা হলো। এক. কৃষক ও কৃষি পরিবারগুলোকে কৃষিপণ্যপ্রবাহ অব্যাহত রাখতে সাপোর্ট দিতে হবে এবং কৃষিপণ্যের সরকারি ক্রয়ের বিষয়টি একটি অপশন হিসেবে চিন্তা করা জরুরি। কয়েক মাসে ধান পাকছে। সরকারি তরফে সেগুলো কিনতে হবে। মানুষের কাছে সহজলভ্য ও দাম নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখতে অন্য পচনশীল পণ্যগুলোও ক্রয় করা প্রয়োজন হতে পারে। কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান বজায় রাখতে এটি হবে বড় প্রণোদনা। বর্তমান প্রণোদনা প্যাকেজে বিষয়টি সেভাবে উপস্থাপন করা হয়নি। দুই. চলতি বছর চাল ও ধান ক্রয় আগের বছরগুলোর তুলনায় দ্বিগুণ বাড়াতে হবে এবং দাম প্রণোদনাও ন্যায্য ও আরো বেশি হতে হবে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের মৌসুমও অত্যাসন্ন। তার জন্য পর্যাপ্ত প্রস্তুতির বিষয়ও মাথায় রাখতে হবে। ঢাকার মতো বড় শহরগুলোয় প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। মুসলিমদের মহৎ ধর্মীয় অনুষ্ঠান চলতি মাসের শেষ ও মে মাসের দিকে রোজা ও ঈদ উৎসব পালিত হতে যাচ্ছে। রমজান ও ঈদ উপলক্ষে প্রয়োজনীয় সাপোর্ট ও সংযম বজায় রাখতে হবে। ছয়. করোনা মোকাবেলার পাশাপাশি অন্য গুরুত্বপূর্ণ ও জটিল রোগীদের চিকিৎসা করার জন্য হাসপাতাল ও চিকিৎসক আলাদা করতে হবে। ছোটখাটো স্বাস্থ্যগত সমস্যার মেডিকেল হটলাইনে সেবা নেয়ার বর্তমান ব্যবস্থা আরো শক্তিশালী করতে হবে।
স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা টেকসই করতে সম্পদের ব্যাপক সম্প্রসারণ বিবেচনা করার এখনই সময়। পরবর্তী পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় স্বাস্থ্যসেবায় আমাদের জিডিপির ৪ থেকে ৫ শতাংশ বরাদ্দের বিষয়ও চিন্তা করতে পারি। সরকার সেসব প্রকল্প ও ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত করতে একটি টাস্কফোর্স গঠন করতে পারে, যেখানে স্বাস্থ্য খাতে অর্থ দেয়া যেতে পারে। সার্বিক নিরাপত্তা বাজেট, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ তহবিল, খাদ্য মন্ত্রণালয়ের খাদ্য মজুদ, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের খাদ্য আমদানি ও পাইপলাইনে থাকা খাদ্য সম্পর্কিত পণ্য, কমিউনিটি ও এনজিওগুলোর সম্পদ এবং দ্বিপক্ষীয়-বহুপক্ষীয় সংস্থা থেকে আসা বিভিন্ন সহায়তা প্যাকেজ প্রথমে মূল্যায়ন করা জরুরি, সেগুলো আমাদের পরবর্তী ছয় মাস (এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর) খাদ্যপণ্য ও চিকিৎসাসংক্রান্ত উপকরণ সরবরাহে যথেষ্ট কিনা। তারপর গ্রাম ও শহরগুলোর অভাবী মানুষদের খাওয়াতে প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে টার্গেট গ্রুপ নির্বাচনের মাধ্যমে অনেক জটিল শর্ত দিয়ে জটিল প্রকল্প প্রণয়ন অপ্রাসঙ্গিক। এটি এমনভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে, যাতে আগে অর্থনৈতিক অবস্থা যা-ই থাকুক না কেন, এখন অভাবে থাকা সবাইকে খাদ্যসহায়তায় অন্তর্ভুক্ত করা যায়। তাহলেই মানুষ কাজে যেতে ব্যতিব্যস্ত হবে না এবং ঘরে শান্ত থাকবে। এ মুহূর্তে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য খাদ্য বণ্টনে আমাদের সুবিবেচক, ক্ষিপ্র ও চৌকস হওয়া এবং আমাদের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার দূরদর্শী ব্যবহারে সর্বাত্মক পৃষ্ঠপোষকতা দেয়া প্রয়োজন।
এটি কোনো ট্রেড-অফ নয়, কেবল স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষার ওপর ছয় মাসের একটি ক্রাশ প্রোগ্রাম মাত্র। অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারই হবে মূল এজেন্ডা, চলতি বছরের জুলাইয়ের শেষের দিক থেকে আমরা সেটি নিয়ে ভাবতে পারব। ‘জীবনই প্রথম’ এবং অর্থনীতি হলো মানুষের জন্য। মানুষের মরদেহের ওপর অর্থনীতি চলতে পারে না, বিকাশ লাভ করতে পারে না।
ড. তোফায়েল আহমেদ: স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ
উপাচার্য, ব্রিটনিয়া ইউনিভার্সিটি, কুমিল্লা