নভেল করোনাভাইরাস মহামারী সারা বিশ্বকে এ শতাব্দীর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের সামনে দাঁড় করিয়েছে। বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, মহামারী বা অর্থনৈতিক সংকটের মতো বিপর্যয়গুলো দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব রেখে যায়। নেতিবাচক এসব প্রভাব মোকাবেলার জন্য বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তাত্ক্ষণিক জরুরি কর্মসূচি নেয়া হয়। সাধারণত উন্নয়নশীল দেশগুলোয় মাঝারি ও দীর্ঘমেয়াদি অভিঘাত নিরসনে স্থায়িত্বশীল পদক্ষেপ নেয়া হয় না। সংকট উত্পন্ন বহুমুখী পার্থক্যমূলক নেতিবাচক প্রভাব নির্মূল না করায় দুর্বল, দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠী দুর্বিষহ জীবনযাপনে বাধ্য হয়।
আশঙ্কা করা হচ্ছে, কভিড-১৯ মহামারী গত শতাব্দীর ত্রিশের দশকের মহামন্দা ও এ শতাব্দীর প্রথম দশকের আর্থিক খাতের মন্দার তুলনায় জীবন-জীবিকা ও অর্থনীতিকে আরো বেশি সংকটাপন্ন করবে। এরই মধ্যে এ মহামারী অর্থনীতিকে মন্দার মধ্যে ফেলেছে। শ্রমবাজার ও ভোক্তা ব্যয়ের ক্ষেত্রে বিপর্যয় ডেকে এনেছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, ৮৬ হাজার কোটি থেকে ৩ লাখ ৪৪ হাজার কোটি মার্কিন ডলার পরিমাণ শ্রমিকদের আয়ে ধস নামবে। বৈশ্বিক বেকারত্ব আগের তুলনায় ৫৩ লাখ থেকে ২ কোটি ৪৭ লাখ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। একই সঙ্গে কভিড-১৯-এর প্রাদুর্ভার আগের তুলনায় ২ কোটি ১ লাখ থেকে ৩ কোটি ৫০ লাখ বেশি দরিদ্র বাড়াতে পারে।
অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের মতো বাংলাদেশেও এরূপ বিপর্যয়ে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে ‘দিন আনে দিন খায়’ এরূপ খেটে খাওয়া অনানুষ্ঠানিক খাতের মানুষরা, সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী হচ্ছে। বাড়ির কাজে সহায়তাকারী, রিকশাচালক, রাস্তার পাশের বিক্রেতা, পরিবহন শ্রমিক পুরোপুরি দৈনিক উপার্জনের ওপর নির্ভরশীল। তাদের কোনো সঞ্চয় থাকে না। ফলে নভেল করোনাভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধের জন্য দেশে দেশে ছুটি ঘোষণা দেয়ার পর তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সাম্প্রতিক শ্রমশক্তি জরিপ (২০১৭) অনুযায়ী, শ্রমশক্তির প্রায় ৮৫ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে নিযুক্ত রয়েছে। ৬ কোটি ৮ লাখ মানুষ অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত। এই অসংগঠিত খাতগুলোর প্রায় ৫ কোটি ১৭ লাখ শ্রমিক কোনো প্রকার চাকরির সুরক্ষা ছাড়াই কাজ করছেন। অনানুষ্ঠানিক কৃষি খাতে ২৩ কোটি ৮ লাখেরও বেশি কর্মী নিযুক্ত, শিল্প ও সেবা খাতে যথাক্রমে ১ কোটি ১১ লাখ ৬৮ হাজার এবং ১ কোটি ৭০ লাখ শ্রমিক নিযুক্ত। বেশির ভাগ শ্রমিক অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত থাকার কারণে তারা শ্রম আইন অনুযায়ী ন্যূনতম মজুরি ও সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত। ফলে অনানুষ্ঠানিক শ্রমিকরা রফতানি খাতের জন্য সরকার ঘোষিত অর্থসহায়তার আওতার বাইরে থেকে যাচ্ছেন।
যেকোনো মহামারী অবধারিতভাবে নারীদের ওপর পুরুষ অপেক্ষা অধিক বিরূপ প্রভাব ফেলে। যুগে যুগে ঘরের কাজ ও সন্তান প্রতিপালনের দায়িত্ব সবসময় নারীদের ওপরই ছিল। এ ভাইরাস সংক্রমণের ফলে ঘরের কাজ বেড়ে যাওয়ায় যেসব পরিবারের স্বামী-স্ত্রী দুজনই চাকরি করেন, তাদের একজনকে অবশ্যই বাড়িতে থাকতে হতে পারে। এক্ষেত্রে নারীদের চাকরি ছাড়ার সম্ভাবনাই বেশি। পরিবারের স্বার্থেই তারা তা করবেন। ফলে নারী ও পুরুষের শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ ও আয়ে অসমতা বেড়ে যাবে। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ইবোলা, সার্স, সোয়াইন ফ্লু ও বার্ড ফ্লুর মতো মহামারীগুলোর গবেষণার ফল বলছে, মহামারী-পরবর্তী অভিঘাত নারীদের ওপরই বেশি বর্তায়।
এরূপ ঋণাত্মক প্রভাব দূর করতে বাংলাদেশে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনচক্রভিত্তিক জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি প্রতিষ্ঠার বিকল্প নেই। বিশেষত বিদ্যমান সামাজিক নিরাপত্তা জাল প্রকল্পগুলো অপর্যাপ্ত, অকার্যকর এবং সর্বজনীন নয়। এ প্রকল্পগুলো বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই খণ্ডকালীন বা মৌসুমি বা দুর্যোগ-পরবর্তী সময়ে স্বল্প পরিসরে গ্রহণ করা হয়।
তিন মাস পরই ২০২০-২১ সালের অর্থবছর শুরু হবে। এখানে ওই অর্থবছরে পূর্ণাঙ্গ জীবনচক্রভিত্তিক সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে একটি প্রাক্কলিত প্রাথমিক খসড়া প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়েছে। একে কোনোভাবেই পূর্ণাঙ্গ বলা যাবে না। তবে প্রস্তাবটি সম্ভাবনাময় আলোচনার দরজা খুলে দেবে। এ প্রাক্কলনে সর্বজনীন পেনশন ভাতা, বেকার ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, শিশু প্রতিপালন ভাতা, আবাসন সুবিধা, আয় সহায়ক ভাতা ও স্বাস্থ্য ভাতা—এ সাতটি ব্যবস্থার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। উল্লিখিত সাতটির বাইরেও প্রয়োজনীয় অন্যান্য ভাতা সংযুক্ত করা যেতে পারে।
দুই. নভেল করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবের আগেই বাংলাদেশে বহুমাত্রিক সমস্যা বিরাজমান ছিল। যেমন বাংলাদেশের পরিসংখ্যান ব্যুরোর খানা জরিপে দেখা যায়, দেশে এখনো প্রায় ৩ কোটি ৮০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে। পাশাপাশি বিগত বছরগুলোয় বাংলাদেশে দারিদ্র্য হ্রাসের হারও আগের তুলনায় কমেছে। ২০০০ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত এ দেশে দারিদ্র্য হ্রাসের হার ছিল ১ দশমিক ৮ শতাংশীয় পয়েন্ট; কিন্তু ২০১০ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত সময়ে তা কমে ১ দশমিক ২ শতাংশীয় পয়েন্ট হয়েছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যসীমা তথা ১ দশমিক ৯ ডলার হিসাবে বাংলাদেশে এখন দারিদ্র্য হার ১৪ দশমিক ৫৮ শতাংশ। মাথাপিছু মধ্যম আয়ের দারিদ্র্যসীমা (৩ দশমিক ২০ ডলার) ও উচ্চমধ্যম আয়ের দারিদ্র্যসীমার (৫ দশমিক ৫০ ডলার) আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ৫২ দশমিক ৯ শতাংশ এবং ৮৪ দশমিক ৫ শতাংশ যথাক্রমে মধ্যম আয়ের দারিদ্র্যসীমা ও উচ্চমধ্যম আয়ের দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। কভিড-১৯ প্রাদুর্ভাবের আগে বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে এ দেশের অসহায় জনগোষ্ঠীর দারিদ্র্যসীমায় নেমে যাওয়ার যে শঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে, তা বিদ্যমান সমস্যাকে আরো জটিলতর করে তোলে। বিশ্বব্যাংকের মতে, বাংলাদেশের অসহায় জনগোষ্ঠী, যাদের দারিদ্র্যসীমায় অবনমনের ঝুঁকি আছে, তাদের সংখ্যা প্রায় ৫৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। দারিদ্র্য হ্রাসের হার কমে যাওয়া এবং অসহায় জনগোষ্ঠীর ওপর কভিড-১৯-এর প্রভাবে দারিদ্র্য নিরসন ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। এমনকি যারা আগেই দারিদ্র্যসীমা অতিক্রম করেছে, তারা পুনরায় দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যেতে পারে। বিশ্বব্যাপী এ দুর্যোগের কারণে প্রবাসী শ্রমিকদের জোরপূর্বক দেশে ফেরত পাঠানো হলে গ্রামীণ অর্থনীতি হুমকির সম্মুখীন হবে। এই দুঃসহ পরস্থিতি মোকাবেলা করে স্থিতিশীল অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিশ্চিতকরণে সুষ্ঠু নীতিনির্ধারণ ও তার যথাযোগ্য প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি।
গত বছরগুলোয় বাংলাদেশে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঘটলেও নতুন কর্মসংস্থানের তেমন সুযোগ সৃষ্টি হয়নি। বাংলাদেশের পরিসংখ্যান ব্যুরোর শ্রমশক্তি জরিপ ২০১৬-১৭ থেকে দেখা যায়, বেকারত্বের হার ৪ দশমিক ২ শতাংশ। দীর্ঘমেয়াদি বেকারত্বের হার ১৫ দশমিক ২ শতাংশ। যুব বেকারত্বের হার, অর্থাৎ যাদের বয়স ১৪ থেকে ২৪, তাদের বেকারত্বের হার ১২ দশমিক ৩ শতাংশ। বিশ্বব্যাংক-আইএলওর হিসাব অনুযায়ী চাকরি, শিক্ষা, প্রশিক্ষণে নিয়োজিত নন বাংলাদেশের ২৬ দশমিক ২ শতাংশ কর্মক্ষম যুবক। বাংলাদেশ প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় এখনো সঙ্গিন আবস্থায় আছে। পাশাপাশি বাংলাদেশের যুবসমাজের দক্ষতার ঘাটতির কারণে তাদের উৎপাদনশীলতাও অন্যান্য দেশের তুলনায় কম। আইএলওর আইএসসিও শ্রেণীকরণ অনুযায়ী দক্ষতাকে চারটি স্তরে ভাগ করেছে। প্রথম স্তর: প্রারম্ভিক কর্মদক্ষতা—নিম্নস্তরের কর্মদক্ষতাসম্পন্ন শ্রমিক। মধ্যম কর্মদক্ষতাসম্পন্ন কৃষিকাজে পারদর্শী শ্রমিক, সেবা খাতে নিয়োজিত শ্রমিক নিয়ে দ্বিতীয় স্তর। উচ্চকর্মদক্ষতাসম্পন্ন মানুষ নিয়ে তৃতীয় ও চতুর্থ স্তর। বাংলাদেশে তৃতীয় ও চতুর্থ স্তরের কর্মদক্ষতাসম্পন্ন কর্মীর সংখ্যা কম এবং এ ঘাটতি পূরণ করতে প্রায়ই বিদেশী জনশক্তি নিয়োগের প্রয়োজন হয়। এসব বিদেশীর একটি বড় অংশ নথিভুক্ত না হওয়ায় তাদের থেকে প্রাপ্তব্য করের একটি বড় অংশ সরকারি কোষাগারে জমা হয় না।
কর্মক্ষমতা ও দক্ষতার সঙ্গে মানুষের জন্ম ও জন্ম-পরবর্তী সময়ের লালন-পালনেরও জোরালো সম্পর্ক রয়েছে। যেমন শিশুর জন্মপূর্ব ও শৈশবকালীন বিকাশ সম্পূর্ণভাবেই তার মায়ের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার ওপর নির্ভর করে। বাংলাদেশের সামাজিক ও পারিবারিক বাস্তবতায় একজন মা বিভিন্ন প্রকারের বৈষম্যের শিকার হন। এ বৈষম্য সন্তানের পূর্ণ বিকাশে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, কিশোরী মেয়েদের এক-তৃতীয়াংশ ১৫-১৯ বছর বয়সের মধ্যে মা হয় অথবা তারা গর্ভবতী হয়ে পড়ে। ফলে ২০ শতাংশ শিশু শারীরিক সীমাবদ্ধতা নিয়ে জন্মায় এবং তাদের অনেকেই দক্ষ জনশক্তি হয়ে বেড়ে উঠতে ব্যর্থ হয়। পরিসংখ্যান জানায়, বাংলাদেশের ৩৯ দশমিক ৪ শতাংশ নারী প্রজনন বয়সে রক্তশূন্যতায় ভোগেন এবং ৫০ শতাংশ নারী দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক দুর্বলতার শিকার হন। পাশাপাশি খানা জরিপের তথ্যমতে, মাতৃপ্রধান গৃহের আয় তুলনামূলকভাবে ৫৫ শতাংশ কম। পুরুষশিক্ষার হার যেখানে ৭৩ শতাংশ, সেখানে নারীশিক্ষার হার ৬৮ দশমিক ৯ শতাংশ। নারীদের প্রতি এসব বৈষম্যের কারণে অনেক নারীই অবহেলার শিকার হন এবং অপুষ্টিতে ভোগেন। অপুষ্টিতে ভোগা এসব নারীর অনেকেই শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধী সন্তানের জন্ম দেন। ফলে দেশে অপুষ্ট ও অদক্ষ জনশক্তি বৃদ্ধি পায়।
স্কুলগামী ৪৬ শতাংশ ছাত্রছাত্রী অপুষ্টির শিকার এবং তাদের ওজন বয়সের তুলনায় কম। এসব ছাত্রছাত্রীর জ্ঞান, দক্ষতা, মানসিক শক্তি অর্জনে ব্যর্থতা দেখা যায়। এ দেশে ১৮ শতাংশ শিশু প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে দরিদ্র শিশুদের তুলনায় অদরিদ্র শিশুদের যোগদানের সংখ্যা বেশি। একটি বিশাল জনশক্তি প্রাথমিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত। মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করতে প্রশিক্ষণের উপকরণ, পরীক্ষাগার, শিক্ষা সহায়িকা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই শুধু সচ্ছল পরিবারের সন্তানরাই গুণগত শিক্ষার সহায়ক উপকরণ জোগান নিশ্চিতের মাধ্যমে শিক্ষিত হয়ে ওঠে।
২০২১ নাগাদ বাংলাদেশে প্রবীণ লোকের সংখ্যা দাঁড়াবে ১ কোটি ২০ লাখ। বার্ধক্যকালে স্বাস্থ্যের অবনতি, অপুষ্টি, নিরাপদ আশ্রয়ের অভাব, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, বিষণ্নতা ইত্যাদি সমস্যা দেখা দেয়। বাংলাদেশে ৬০ বছরের ঊর্ধ্বে ২৫ শতাংশ মানুষ মানসিক সমস্যার শিকার।
বাংলাদেশে বৈষম্য উচ্চগতিতে বাড়ছে। এখানে শ্রম থেকে প্রাপ্তি পুঁজি থেকে প্রাপ্তির তুলনায় অনেক কম। জিনি সহগের সঠিকভাবে সমতা পরিমাপ করার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন আছে। যদিও নির্ভুল একক নয়, কিন্তু বৈষম্য পরিমাপে এটি বহুল ব্যবহূত। পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ খানা জরিপ অনুযায়ী, দিন দিন বৈষম্য বেড়ে চলছে। ২০১০ সালের জিনি সহগ শূন্য দশমিক ৪৫৮ থেকে বেড়ে ২০১৬ সালে শূন্য দশমিক ৪৮২ হয়েছে।
উপরের আলোচনা থেকে প্রতীয়মান হয় যে করোনা-পরবর্তী পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে একটি পূর্ণাঙ্গ সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি গ্রহণ করা প্রয়োজন। সামাজিক নিরাপত্তা জালের বিদ্যমান দুর্বলতা সমাধানে পূর্ণাঙ্গ জীবনচক্রভিত্তিক সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি প্রয়োজন।
বর্তমানে বাংলাদেশে স্বল্প পরিসরে সামাজিক নিরাপত্তা জাল ও সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্প আছে। সামাজিক নিরাপত্তা জালের আওতায় অনেক প্রকল্প কখনো অ্যাডহক বা বছরের একটি নির্দিষ্ট মৌসুমের বা কোনো ক্রান্তিকালের জন্য। সারা বছর সুরক্ষা প্রদানের জন্য কার্যকরী নয়। ব্যাপক পরিসরে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিও নেই। যেমন সামাজিক নিরাপত্তা জালের আওতায় স্তন্যদানকারী মায়েদের জন্য মাতৃত্বকালীন ভাতা শুধু ১০ শতাংশ জনসংখ্যার জন্য প্রযোজ্য। স্কুলগামী ছাত্রছাত্রীদের জন্য প্রদানকৃত বৃত্তি ও খাবার অপ্রতুল। এছাড়া বিধবা ও পরিত্যক্ত নারী ভাতা, অতি দরিদ্রদের কর্মসংস্থান, কাজের বিনিময়ে খাদ্য, বয়স্ক ভাতা, একটি বাড়ি একটি খামার ইত্যাদি প্রকল্প রয়েছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৪০ লাখ মানুষকে বয়স্ক ভাতা দেয়া হয়েছে, কিন্তু দেশে বয়স্ক লোকের সংখ্যা প্রায় এক কোটি ২০ লাখ। ভাতা হিসেবে যে পরিমাণ অর্থ দেয়া হয়, তা পর্যাপ্ত নয়।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সামাজিক নিরাপত্তা জাল খুব কার্যকর নয়। এর আওতায় সুবিধাভোগীদের বাছাই প্রক্রিয়াও সুষ্ঠু নয়। অনেকেই রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে সুবিধা ভোগ করছেন। এছাড়া বণ্টনে অনিয়ম ও অপব্যবহার দেখা যায়। বাজেটেও কিছু অসামঞ্জস্য লক্ষ করা যায়। যেমন ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে এ খাতে মোট বরাদ্দ ৭৪ হাজার ৩৬৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পেনশন যোগ করা আছে। ছয় লাখ অবসরপ্রাপ্তর পেনশন প্রায় ২৩ হাজার ১০ কোটি টাকা। এ বরাদ্দ ওই বাজেটের একটি বৃহৎ অংশ।
সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, সামাজিক নিরাপত্তা জাল ও সামাজিক সুরক্ষার মধ্যে সুনির্দিষ্ট পার্থক্য আছে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে সরকার স্বল্প আয়ের অথবা আয়হীন মানুষকে অর্থ সাহায্য দিয়ে থাকে। সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় অসহায় মানুষদের দুর্যোগ ও বিপর্যয় থেকে রক্ষা করার জন্য কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। সামাজিক নিরাপত্তা জাল ব্যবস্থায় অসহায় মানুষকে খাবার, নগদ টাকা, ভোগ্যপণ্য দিয়ে সাহায্য করা হয়।
সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি চালু হলে সামাজিক নিরাপত্তা জালের দুর্বলতা দূর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও সুনিশ্চিত হবে। যেমন প্রস্তাবিত শিশু প্রতিপালন ভাতা মা ও শিশুর সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করবে এবং শিশুমৃত্যুর হার কমাতে সাহায্য করবে। ফলে শিশু জন্মহার কমবে এবং প্রত্যেক শিশুর জন্য মাথাপিছু সম্পদের ব্যবহার বেড়ে যাবে। স্বাস্থ্যবান ও দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে সহায়তা করবে। এসব দক্ষ কর্মী বিভিন্ন সম্মানজনক কাজ করার মাধ্যমে অধিক কর প্রদান করার সক্ষমতা অর্জন করায় জনহিতকর কাজে রাষ্ট্রীয় ব্যয় বাড়বে। বেকার ভাতা, আয় সহায়ক ভাতা তরুণদের সুষ্ঠু প্রশিক্ষণ গ্রহণে উৎসাহী করে এবং দক্ষ জনশক্তি হিসেবে গড়ে তোলে। ফলে মানুষের জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধি পায়। পাশাপাশি সর্বজনীন পেনশন ভাতা অবসর-পরবর্তী জীবনে দরিদ্রতা থেকে রক্ষা করে এবং ভোগ্যপণ্য ব্যবহার বাবদ ব্যয় বাড়ায়। এ সবই অর্থনীতি সচল রাখায় ভূমিকা রাখে। (চলবে)
ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক
রওনক জাহান, অন্তরা চৌধুরী, রুবাইয়া সিদ্দিকা ও
মো. গুলজার হোসেন: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী