চীনে এখন যেতে চায় না কেউ

ভিসা আবেদন কমেছে ৯০ শতাংশ

একক দেশ হিসেবে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার চীন। ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী ও পর্যটক মিলিয়ে প্রতিদিন প্রচুর বাংলাদেশী দেশটি ভ্রমণে যান। যে কারণে কয়েক দিন আগেও বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশনে চোখে পড়ার মতো ছিল চীন গমনেচ্ছুদের লাইন। কিন্তু সম্প্রতি এ দৃশ্যপট একেবারেই বদলে গেছে। নভেল করোনাভাইরাস আতঙ্কে এখন আর চীন যেতে চান না কোনো বাংলাদেশী। কেবল চীন নয়, চীনা নাগরিকদের সংস্পর্শও এড়িয়ে চলছেন বাংলাদেশীরা।

একক দেশ হিসেবে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার চীন। ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী পর্যটক মিলিয়ে প্রতিদিন প্রচুর বাংলাদেশী দেশটি ভ্রমণে যান। যে কারণে কয়েক দিন আগেও বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশনে চোখে পড়ার মতো ছিল চীন গমনেচ্ছুদের লাইন। কিন্তু সম্প্রতি দৃশ্যপট একেবারেই বদলে গেছে। নভেল করোনাভাইরাস আতঙ্কে এখন আর চীন যেতে চান না কোনো বাংলাদেশী। কেবল চীন নয়, চীনা নাগরিকদের সংস্পর্শও এড়িয়ে চলছেন বাংলাদেশীরা।

ঢাকায় চীনা দূতাবাসের তথ্য বলছে, করোনাভাইরাস আতঙ্কে প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে বাংলাদেশীদের চীন ভ্রমণ। চীনের ভিসা পেতে বাংলাদেশীদের আবেদন প্রায় ৯০ শতাংশ কমে গেছে। করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের আগে প্রতিদিন প্রায় ২৫০ বাংলাদেশী ভিসার আবেদন করতেন। এখন ভিসার জন্য আবেদন পড়ছে মাত্র ২০-২৫টি।

নভেল করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব এখন যে পর্যায়ে পৌঁছেছে, তা সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত চীনে যাওয়ার কথা ভাবছেনই না নিয়মিত দেশটিতে যাতায়াত করা অনেক বাংলাদেশী। এমনকি চীনের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করা যেসব শিক্ষার্থী চান্দ্র নববর্ষের ছুটিতে দেশে এসেছেন, তারাও সহসা ক্যাম্পাসে ফিরছেন না।

চীনের সিচুয়ান প্রদেশের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক পর্যায়ে পড়াশোনা করছেন মইনুদ্দীন তৌহিদ। চান্দ্র নববর্ষের ছুটি কাটাতে গত মাসের শেষ দিকে দেশে এসেছেন তিনি। তৌহিদ বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে চীনে ফিরে যাওয়াটা নিরাপদ মনে করছি না। তাই যতদিন না করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণে আসে, ততদিন দেশেই অবস্থান করব।

বাংলাদেশীরা যে কেবল চীনে যেতে চাইছেন না তা নয়, দেশেও চীনাদের এড়িয়ে চলছেন অনেকে। চীনভিত্তিক কোনো অনুষ্ঠান আয়োজন হলেও সেখানে কেউ যাচ্ছেন না। বাংলাদেশ প্লাস্টিক দ্রব্য প্রস্তুতকারক রফতানিকারক অ্যাসোসিয়েশন (বিপিজিএমইএ) এবং তাইওয়ানের প্রতিষ্ঠান ইয়র্কারস ট্রেড অ্যান্ড মার্কেটিং সার্ভিস কোম্পানি লিমিটেডের যৌথ উদ্যোগে ১২-১৫ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল ১৫তম আন্তর্জাতিক প্লাস্টিক মেলা ২০২০। কিন্তু অনিবার্য কারণ দেখিয়ে  মেলাটি জুন পর্যন্ত পিছিয়ে দিয়েছে আয়োজক প্রতিষ্ঠান। একইভাবে স্থগিত করা হয়েছে বিটিএমইএর টেক্সটাইল গার্মেন্ট মেশিনারি প্রদর্শনীও।

বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ-চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (বিসিসিসিআই) সেক্রেটারি জেনারেল শাহজাহান মৃধা বণিক বার্তাকে বলেন, করোনাভাইরাসের বিষয়টি বহুল প্রচারের ফলে সাধারণ মানুষ এখন চীনাদের বিষয়ে ভীতসন্ত্রস্ত। তবে ব্যবসায়িক বা কূটনৈতিক ক্ষেত্রগুলোয় ঘোষণা দিয়ে চীনাদের এড়িয়ে চলার বিষয়টি দৃশ্যমান নয়।  কৌশল অবলম্বন করে কোনো কোনো ক্ষেত্রে চীনাদের হয়তো এড়িয়ে চলা হচ্ছে, কিন্তু তার ব্যাপ্তি খুব বেশি না। আশা করছি খুব দ্রুতই পরিস্থিতি কেটে যাবে।

বিদ্যুৎ খাতে বাংলাদেশ চীনের যৌথ বিনিয়োগের প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ চায়না পাওয়ার কোম্পানি (প্রাইভেট) লিমিটেডে (বিসিপিসিএল) কর্মরত প্রায় আড়াই হাজার চীনা নাগরিক। এর মধ্যে প্রায় ৫০০ জন নববর্ষের ছুটিতে গিয়েছেন চীনে। ছুটি শেষে ফিরে আসা চীনাদের মাধ্যমে ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়ার ভয়ে ভীত হয়ে পড়েছেন বাংলাদেশী প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা।

শুধু বিসিপিসিএল নয়, বাংলাদেশে চলমান বড় নির্মাণ প্রকল্পগুলোর প্রায় সবগুলোতেই জড়িত আছেন অনেক চৈনিক। ধারণা করা হচ্ছে, বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রকল্পে এক লাখেরও বেশি চীনা কর্মী কর্মরত। এদের বেশির ভাগই ছুটি নিয়ে আসা-যাওয়া করেন। এসব চীনার অনেকেই এখন ছুটিতে নিজ দেশে অবস্থান করছেন। ফেরত আসার পর তাদের মাধ্যমে উহান ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

চীন বাংলাদেশের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য নিয়েও শঙ্কা রয়েছে সংশ্লিষ্টদের। তারা বলছেন, এমন এক সময়ে করোনাভাইরাসের আক্রমণ হলো, যখন চীনে ছুটি চলছে। বাংলাদেশে যেসব পণ্য আমদানি হয়, তার একটি অংশ ছুটি শুরুর আগেই রফতানি করেছে চীনারা। ভাগ্য ভালো যে ছুটি চলাকালে ভাইরাস আক্রমণের ব্যাপ্তি বেড়েছে। তার পরও বাংলাদেশে নিয়ে সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে। তবে পণ্যের চেয়ে মানুষ নিয়েই আতঙ্কটা তুলনামূলক বেশি। বাংলাদেশ কটন অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মেহেদী আলী বলেন, বাংলাদেশে বিপুল পরিমাণ চীনা কর্মী কাজ করেন। আশঙ্কাটা এদের নিয়েই বেশি।

এদিকে দেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে ঢাকায় চীনা নাগরিকদের অন-অ্যারাইভাল ভিসা সুবিধা সাময়িকভাবে বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ। সেই সঙ্গে বাংলাদেশে যেসব চীনা নাগরিক থাকেন তাদের মাসখানেক নিজ দেশে ছুটিতে যেতে বারণ করা হয়েছে এবং চলমান প্রকল্পগুলোর জন্য নতুন করে কোনো চীনা নাগরিককে নিতে নিষেধ করা হয়েছে।

ঢাকায় অন-অ্যারাইভাল ভিসা সুবিধা বন্ধ থাকলেও চীনা নাগরিকদের নিয়মিত ভিসা চালু থাকছে। ভিসার জন্য তারা আবেদন করতে পারবেন (বেইজিং, কুনমিং মিশনে) সেক্ষেত্রে আবেদনের সঙ্গে অবশ্যই একটি মেডিকেল সার্টিফিকেট দিতে হবে, যেখানে দেখাতে হবে যে আবেদনকারীর কোনো অসুখ-বিসুখ নেই।

করোনাভাইরাস পরিস্থিতি নিয়ে বেশ কয়েক দিন আগে পররাষ্ট্রমন্ত্রী, পররাষ্ট্র সচিব স্বাস্থ্য সচিবের সঙ্গে আলোচনা করেছেন চীনের রাষ্ট্রদূত। তিনি

জানান, চীনের সরকার জনগণ ভাইরাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়ের বিষয়ে আত্মবিশ্বাসী। চীন খুবই দায়িত্বশীলতার সঙ্গে দেশটিতে থাকা বাংলাদেশী প্রবাসীদের স্বাস্থ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে কাজ করছে। বাংলাদেশীদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে ভাইরাসের হালনাগাদ তথ্য সরবরাহ করছে। এখন পর্যন্ত চীনে থাকা কোনো বাংলাদেশী নাগরিক ভাইরাসে আক্রান্ত হননি। চীন দূতাবাস বাংলাদেশে থাকা নিজ নাগরিকদের জন্য ট্রাভেল নোটিস ইস্যু করেছে। তাদের আগামী কয়েক সপ্তাহ চীন ভ্রমণে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। 

চীনে বাংলাদেশীদের ভ্রমণ কমে যাওয়ায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে উড়োজাহাজ পর্যটন খাতে। গত ২১ জানুয়ারির পর ঢাকা-গুয়াংজু রুটে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের অন্তত আটটি ফ্লাইট চলেছে শূন্য যাত্রী নিয়ে। বাকি ফ্লাইটগুলোর অবস্থাও বলতে গেলে একই। চীনা এয়ারলাইনসগুলোর ফ্লাইটে ঢাকা থেকে যেসব যাত্রী গিয়েছেন, তারাও মূলত ট্রানজিট যাত্রী। তবে চীন থেকে আসা ফ্লাইটগুলোয় গড়ে ৫০ শতাংশ যাত্রী আসছেন।

জানা গেছে, বাংলাদেশ থেকে চীনে প্রতিদিন সরাসরি ফ্লাইট পরিচালনা করে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস, চায়না সাউদার্ন চায়না ইস্টার্ন এয়ারলাইনস। এছাড়া ড্রাগন এয়ারলাইনস সপ্তাহে চারদিন হংকংয়ে ফ্লাইট পরিচালনা করছে। এর বাইরে চীন থেকে অন্য দেশ হয়ে বাংলাদেশে আসছে আরো পাঁচটি এয়ারলাইনস।

দেশীয় বেসরকারি উড়োজাহাজ পরিবহন সংস্থা ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস ঢাকা-গুয়াংজু রুটে প্রতিদিন একটি করে ফ্লাইট পরিচালনা করে। বহরে থাকা বোয়িং ৭৩৭ উড়োজাহাজ দিয়ে পরিচালিত ফ্লাইটটির একমুখী আসন সক্ষমতা ১৬৪। বিমানবন্দরের তথ্য বলছে, গত ২১ জানুয়ারি থেকে চলতি মাসের তারিখ পর্যন্ত ঢাকা-গুয়াংজু রুটে ১৩টি ফ্লাইট পরিচালনা করেছে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস। ঢাকা থেকে গুয়াংজুর পথে ওই ১৩ ফ্লাইটে হাজার ১৩২টি আসন সক্ষমতার বিপরীতে এয়ারলাইনসটি পরিবহন করেছে মাত্র ১২৮ জন যাত্রী। যার মধ্যে গত ২১, ২২, ২৩, ২৪, ২৯ জানুয়ারি এবং চলতি মাসের তারিখে ঢাকা থেকে গুয়াংজু গিয়েছে কোনো যাত্রী ছাড়াই।

অন্যদিকে ২১ জানুয়ারি থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত গুয়াংজু-ঢাকা রুটে পরিচালিত ১৩টি ফ্লাইটে হাজার ১৩২টি আসন সক্ষমতার বিপরীতে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস যাত্রী পেয়েছে হাজার ১৫৬ জন। যার মধ্যে গত ৩০ ৩১ জানুয়ারির ফ্লাইট দুটি এসেছে শূন্য যাত্রী নিয়ে।

আরও