‘আকাশের ঝিকিমিকি তারা যেন জঙ্গলে নেমে এসেছে। পাম গাছগুলোকে জোনাকি পোকা এমনভাবে আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে রেখেছিল যে মনে হচ্ছিল ওগুলো ক্রিসমাস ট্রি। আমাদের গাইড জোনাকি পোকার দিকে টর্চের আলো ছুড়তেই পোকাগুলো আস্তে আস্তে আমাদের ঘিরে নিল। আমরা যেন একটি তারা ঝলমল ছায়াপথে এসে পড়লাম। একটি জোনাকি পোকা আমি হাতের মুঠোয় বন্দী করে ফেললাম। আঙ্গুলের ফাঁক গলে বের হওয়া এর আলোকরশ্মি এক অদ্ভূত অনুভূতির সৃষ্টি করে!’
২০১৯ সালে এক ভ্রমণ ব্লগারের এমন মনোমুগ্ধকর অভিজ্ঞতার বর্ণনা আরো অনেককে তথাকথিত জোনাকি পর্যটনে আরো বেশি মানুষকে উৎসাহিত করেছে। ইনস্টাগ্রামের মতো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করা ছবি দেখে মুগ্ধ হয়ে এমন অভিজ্ঞতা নিতে ছোটা মানুষের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে।
কিন্তু পর্যটকদের এ নতুন আগ্রহ ও উৎসাহ দেখে জোনাকি পোকার অস্তিত্ব নিয়ে বিজ্ঞানীরা শঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। বিশ্বজুড়ে জোনাকি পোকা পর্যটন বাড়ছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এটি জোনাকি পোকার বিলুপ্তির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
সম্প্রতি অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেসে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, নগরায়ন ও শিল্পায়নের জন্য আবাসস্থল কমছে ও আলোক দূষণ বাড়ছে। এ পরিস্থিতি জোনাকি পোকার জন্য অন্যতম প্রধান হুমকি।
মেক্সিকো, যুক্তরাষ্ট্র, ফিলিপাইন, তাইওয়ান, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে জোনাকি পর্যটন ব্যবসা বাড়ছে। রাতের বেলা জলে জঙ্গলে জোনাকি পোকার সমাবেশে মনোমুগ্ধকর আলোকচ্ছটা দেখতে যায় হাজার হাজার পর্যটক। বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা যায়, মেক্সিকোতে পর্যটকের সংখ্যা সর্বাধিক, প্রায় দুই লাখ। তাইওয়ান ও মালয়েশিয়ায় পর্যটকের সংখ্যা যথাক্রমে প্রায় ৯০ ও ৮০ হাজার। যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসিতে গ্রীষ্মের মাত্র দুই বা তিন সপ্তাহে জোনাকি পোকা দেখতে আসে প্রায় ৩০ হাজার পর্যটক। এছাড়া জাপান, বেলজিয়াম এবং ভারতসহ বিভিন্ন দেশে জোনাকি পোকা দেখার উৎসব আয়োজন করা হয় । সামাজিক যোগাওযাগ মাধ্যম এই পর্যটনকে আরো জনপ্রিয় করে তুলছে।
গবেষণায় নেতৃত্বদানকারী টাফটস ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক সারা লুইস বলেন, রাতের বেলা প্রাকৃতিক আবাসগুলোতে জোনাকির সমাবেশ দেখা একটি বিস্ময়কর অভিজ্ঞতা। তবে পর্যটকরা প্রায়শই অজান্তে এদের ক্ষতি করে , এমনকি মেরেও ফেলে।
এর ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, স্ত্রী জোনাকি পোকার ডানা নেই। এ কারণে এরা রাতে সাধারণত মাটিতেই বিচরণ করে। লুইস সরাসরি পর্যটকদের দোষারোপ করছেন না। তবে জোনাকি দেখতে বনের পথে হাঁটার সময় অনেকেই মনের অজান্তে স্ত্রী জোনাকি মাড়িয়ে যেতে পারেন। এসব জোনাকির অনেকগুলোই হয়তো পেটে ডিম বহন করে। ফলে একটি স্ত্রী জোনাকি পায়ে পিষে ফেলার সঙ্গে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকেও শেষ করে দেয়া হচ্ছে। তাছাড়া মটরচালিত নৌকার শব্দ, ফ্ল্যাশলাইট, গাইডের টর্চ এসব স্ত্রী-পুরুষ জোনাকির সফল মিলনে বাধা হয়ে উঠতে পারে।
নদীর তীরে ম্যানগ্রোভ গাছগুলোতে জোনাকি বাস করে। অথবা জলাশয়ের ধারে ঝোপঝাড়ে এগুলো বেশি থাকে। পুরুষ জোনাকি স্ত্রী জোনাকিদের আকর্ষণ করতে এসব ঝোপের চারপাশে ভিড় জমায়। এতে যে আলো ঝলমল দৃশ্যের সৃষ্টি হয় তা অত্যন্ত আকর্ষণীয়। এই দৃশ্য উপভোগ করতে ট্যুর গাইডদের মটরচালিত নৌকায় করে পর্যটকরা নদীতে ভ্রমণ করে। ফলে তীব্র স্রোতে নদীর তীর ভাঙে এবং জোনাকির আবাসগাছগুলো বিনষ্ট হয়। অনেক গাইড ইচ্ছে করে ঝোপঝাড় ঝাঁকায় বা তীব্র ফ্ল্যাশলাইট ছোড়ে যাতে পোকাগুলো একসঙ্গে ওড়ে। এছাড়া পর্যটকদের ক্যামেরার ফ্ল্যাশের আলো জোনাকিদের বিরক্ত করে। এমনকি তাদের প্রজননেও বিঘ্ন সৃষ্টি করার প্রমাণ পাওয়া গেছে।
অধ্যাপক লুইস বলেন, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া এবং ফিলিপাইন জোনাকি পর্যটন শিল্পটি কয়েক দশক ধরে বিকাশ লাভ করছে। তবে এর পরিচালন ব্যবস্থা খুব খারাপ। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, জোনাকি পোকা পর্যটন স্থানীয় অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এটি নিষিদ্ধ করা ঠিক হবে না। এর পরিবর্তে ট্যুর এজেন্সি এবং পর্যটকদের পরিবেশবান্ধব পর্যটনের পরামর্শ দিতে হবে।
২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ভ্রমণ ব্লগার কেটি ডিয়েডেরিচস এবং তার স্বামী ফিলিপাইনের বোহল শহরে একটি পরিবেশবান্ধব জোনাকি পোকা পর্যটন বেছে নেন। কেবল একটি মৃদু আলো নিয়ে রাতে কায়াকে (ডিঙ্গি নৌকা) ছোট্ট একাট দলের সঙ্গে তারা ভ্রমণ করেন। জোনাকি পোকাদের বিরক্ত না করে মায়াময় সৌন্দর্য উপভোগ করেন তারা। কিন্তু তার পাশ দিয়েই পানি চিড়ে চলে যাচ্ছিল পর্যটকবাহী মটরচালিত নৌকা।
তাইওয়ানের ট্যুরিস্ট বোর্ড টেকসই জোনাকি পোকা পর্যটনে বিনিয়োগ করেছে । তারা জোনাকি পোকার জন্য পরিবেশবান্ধব পর্যটন শিল্প তৈরি করেছে। একটি টেকসই জোনাকি পোকা পর্যটন সংস্থা কীভাবে চালানো যায় তার জন্য নির্দেশিকা নির্ধারণের জন্য এবছরই একদল বিজ্ঞানী সমবেত হবেন বলে জানান অধ্যাপক লুইস।
সূত্র: বিবিসি