ধানের জেলা হিসেবে দিনাজপুরের সুনাম দীর্ঘদিনের। আউশ, আমন ও বোরো—সব মিলিয়ে প্রতি বছর গড়ে ১৪-১৫ লাখ টন চাল উৎপাদন হয় এ জেলায়। তবে প্রথাগত ধানের আবাদ থেকে উচ্চমূল্যের এবং সুগন্ধি ধানের আবাদে ঝুঁকছেন দিনাজপুরের কৃষকরা। কয়েক বছরে জেলায় সুগন্ধি ধানের আবাদে এসেছে বড় পরিবর্তন। এসব ধান-চালের ভালো দাম পাওয়া যায়। ফলনও হয় বেশি। এসব কারণে দিনাজপুরে সুগন্ধি ধানের আবাদ ছয় বছরের ব্যবধানে বেড়েছে প্রায় ১৫০ শতাংশ।
দিনাজপুরের পার্বতীপুর, ফুলবাড়ী, বিরামপুর ও চিরিরবন্দর উপজেলায় সবচেয়ে বেশি সুগন্ধি ধান-চাল আবাদ ও উৎপাদন হয়। স্থানীয় কৃষকদের মাঝে সুগন্ধি ধান আবাদ বাড়ানো নিয়ে রীতিমতো প্রতিযোগিতা দেখা দিয়েছে। সরকারি প্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোর কার্যক্রম কৃষককে এ ধরনের ধানের আবাদ বাড়াতে উদ্বুদ্ধ করছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) সূত্রে জানা গেছে, ২০১২-১৩ অর্থবছর থেকে দিনাজপুরে সুগন্ধি ধানের আবাদ বাড়তে শুরু করেছে। ওই অর্থবছরে জেলায় ৪১ হাজার হেক্টর জমিতে সুগন্ধি ধান আবাদ হয়। উৎপাদন হয় ৮৬ হাজার ৯৯৪ টন সুগন্ধি চাল। এর পর থেকে ধারাবাহিক ভাবেই প্রতি বছর সুগন্ধি ধানের আবাদের আওতায় জমির পরিমাণ ও উৎপাদন বেড়েই চলেছে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে জেলায় ৯০ হাজার ৪৪০ হেক্টর জমিতে সুগন্ধি ধানের আবাদ হয়েছে। আর সুগন্ধি চালের উৎপাদন ২ লাখ ১৬ হাজার টন ছাড়িয়েছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে জেলায় ১ লাখ ৬ হাজার হেক্টর জমিতে সুগন্ধি ধানের আবাদ হয়েছিল। উৎপাদন হয়েছে ২ লাখ ২৩ হাজার টন। চলতি অর্থবছরে আবাদ ১ লাখ ১০ হাজার হেক্টরে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
দিনাজপুর সদর উপজেলার বাঙ্গীবেচা গ্রামের কৃষক ওবাইদুর সুগন্ধি ধান আবাদ করেন। তিনি বলেন, আগে মুষ্টিমেয় অবস্থাপন্ন কৃষক প্রতি বছরই অল্প পরিমাণ জমিতে সুগন্ধি চাল হিসেবে কাটারী, চিনিগুঁড়া ও কালোজিরা ধানের আবাদ করতেন। এখন অন্যান্য সাধারণ ধান আবাদের পাশাপাশি ব্যাপক পরিসরে দিনাজপুরের বেশ কয়েকটি উপজেলায় আবাদ হচ্ছে সুগন্ধি ধান। সুগন্ধি ধানের আবাদের জন্য এখন সদর ও চিরিরবন্দর উপজেলার কৃষকরা প্রতি মৌসুমে আলাদা করে জমি বরাদ্দ রাখছেন।
তবে এ অঞ্চলের কৃষকদের আধুনিক চাষ পদ্ধতি নিয়ে পূর্ণাঙ্গ ধারণা কম। সনাতন পদ্ধতিতে চাষাবাদের মাধ্যমে ধান উৎপাদনের লক্ষ্য পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধী জাত ও বোরো মৌসুমে সুগন্ধি ধানের জাত সম্পর্কে কৃষকের জ্ঞান সীমিত। সুগন্ধি ধানের উচ্চফলনশীল জাতের বীজ পাওয়া কষ্টকর। স্থানীয় কৃষকরা তাদের নিজস্ব উদ্যোগে সংরক্ষিত বীজ ব্যবহার করছেন। এতে ফলন তুলনামূলক কম হয়। এছাড়া সুগন্ধি ধানের বিভিন্ন রোগবালাইয়ের (যেমন গোড়া পচা, গলাপচা, শীষকাটা লেদা পোকা ও বাদামি গাছফড়িং) আক্রমণে জৈব বালাইনাশকের ব্যবহার ও ব্যবস্থাপনা বিষয়ে কৃষকদের জ্ঞান ও দক্ষতার ঘাটতি রয়েছে। কৃষকরা প্রয়োজনের অতিরিক্ত সেচ প্রদানের ফলে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। ভালো ফলনের আশায় অতিরিক্ত মাত্রায় ইউরিয়া, অন্যান্য সার ও কীটনাশক ব্যবহার করছেন অনেকেই। স্থানীয় পর্যায়ে উৎপাদিত সুগন্ধি ধান বেপারি, পাইকার কিংবা ফড়িয়াদের কাছে তুলনামূলক কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হন তারা। ধান উৎপাদন আধুনিক ও টেকসই প্রযুক্তি ব্যবহারেও ঘাটতি রয়েছে। এতসব চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হওয়ার পরও স্থানীয় কৃষকদের সুগন্ধি ধান-চাল উৎপাদনে আগ্রহ রয়েছে।
তবে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের উদ্ভাবিত ধানের উন্নত জাত ও আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয় সাধনের জন্য পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) পিএসিই প্রকল্পের আওতায় কাজ করছে। তাদের ‘সুগন্ধি ধানের উৎপাদন বৃদ্ধি ও উৎপাদন ব্যয় হ্রাসের মাধ্যমে উদ্যোক্তাদের আয় বৃদ্ধি ও জীবন যাত্রার মান উন্নয়ন’ শীর্ষক ভ্যালু চেইন প্রকল্প চালু রয়েছে। এ প্রকল্পের আওতায় ২০১৭ সাল থেকে এখন পর্যন্ত পাঁচ হাজার সুগন্ধি ধানচাষীকে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। এছাড়া আদর্শ বীজতলা তৈরি, প্রযুক্তির ব্যবহার প্রদর্শনী, একটি করে চারা সারিতে রোপণ, পার্চিং পদ্ধতি, রোগ ও পোকা দমন, বীজ উৎপাদন ও সংরক্ষণ, ভার্মি কম্পোস্ট ও ধইঞ্চা (সবুজ সার) ব্যবহারের মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধি করা হচ্ছে। প্রকল্পের আওতায় কৃষকদের সুগন্ধি ধানের বাজারজাতে কারিগরি সহায়তা প্রদান করা হয়। পিকেএসএফের আর্থিক সহায়তায় ‘গ্রাম বিকাশ কেন্দ্র (জিবিকে)’ সুগন্ধি
ধান চাষ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে।
সদর উপজেলার মাসিমপুর গ্রামের কৃষক খাদেমুল ইসলাম লিটন বলেন, তুলনামূলক মোটা ধানের চেয়ে কয়েক মৌসুমে সুগন্ধি চিকন ধানের আবাদ করে লাভ পেয়েছি বেশি। মোটা ধানের চেয়ে চিকন ধান বস্তাপ্রতি তিন গুণ বেশি দামে বিক্রি করা সম্ভব হয়েছে। এজন্য মোটা ধানের আবাদ কমিয়ে দিয়েছি। সরকার ও বেসরকারি বিভিন্ন মানুষের কাছ থেকেই প্রশিক্ষণ ও দক্ষতার বিষয়ে খোঁজখবর নিয়ে সুগন্ধি ধানের আবাদ আরো বাড়াচ্ছি। আবার বাজারের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন ও প্রশিক্ষণসহ সব ধরনের সহায়তা নিচ্ছি। একটি করে সারিতে রোপণের ফলে রোগ ও পোকামাকড় কম হচ্ছে। সার ও কীটনাশক কম লাগছে। ফলন বেশি ও সেচ খরচ কম হয়েছে।
ভ্যালু চেইন প্রকল্পের গৃহীত কর্মকাণ্ডের কারণে উৎপাদন পর্যায়ে সুগন্ধি ধানের আধুনিক চাষাবাদ সম্পর্কে কারিগরি জ্ঞানের সম্প্রসারণ হচ্ছে। রোগবালাই ও পোকামাকড়ের আক্রমণ কম হচ্ছে। কৃষকরা উচ্চমাত্রায় রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার কমিয়েছে। ব্রি ধান-৩৪ (বিএডিসি, এসিআই, সেঞ্চুরি, গ্লোবাল) এবং ব্রি ধান-৫০ (বিএডিসি, অটো ক্রপ কেয়ার, কৃষিবিদ) বীজ সহজলভ্য করা হয়েছে। গ্রুপ মিটিং, প্রশিক্ষণ ও মাঠ পরিদর্শনের মাধ্যমে কৃষকদের উন্নত চাষাবাদ সম্পর্কে ধারণা প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া কৃষকের নিজস্ব সংরক্ষিত বীজ প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। বিশেষ করে একেকটি সারিতে একটি করে চারা রোপণ, পার্চিং ব্যবহার, কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় রাসায়নিক সার ব্যবহারে কৃষকদের উৎসাহিত করা হয়েছে। এতে ফলন বৃদ্ধি পেয়েছে, উৎপাদন খরচ কমে এসেছে।
মাঠপর্যায় থেকে বিভিন্ন কোম্পানি ধান কিনে নেয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। এতে কৃষকদের পণ্য পরিবহনের ব্যয় অনেকটাই কমতে শুরু করেছে। একই সঙ্গে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় সঠিক সময়ে ভালো মানের সার, বীজ, কীটনাশক কৃষকদের কাছে পৌঁছে দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। প্রকল্পভুক্ত পাঁচ হাজার কৃষককে আধুুুনিক পদ্ধতিতে ধান চাষের কৌশল শেখানোর কারণে প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৮০ শতাংশ কৃষক সুগন্ধি ধান চাষ শুরু করেছেন। কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের কর্মকর্তারা কৃষকদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়েছেন। প্রশিক্ষণ ও মাঠ দিবস, মাঠ পরিদর্শনের মাধ্যমে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করা হয়েছে।
বাংলাদেশ অটো মেজর অ্যান্ড হাসকিং ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি সহিদুর রহমান পাটোয়ারী জানান, কৃষকরা এখন মোটা চাল থেকে আর আতপ করছে না। এক্ষেত্রে সরকারি-বেসরকারি সুবিধা কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করছে। তাছাড়া মানুষের আয় বৃদ্ধির কারণে ক্রয়ক্ষমতাও বেড়েছে। ফলে তারা এখন সুগন্ধি চালের ভাত খেতে পছন্দ করছেন। এ কারণে সুগন্ধি চালের আবাদ ফলন ও চাহিদা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। আর এক্ষেত্রে উত্তরের খাদ্যভাণ্ডার হিসেবে খ্যাত দিনাজপুর জেলা এখন পথিকৃতের ভূমিকা পালন করছে।
অনেকটা একই মতামত দিলেন দিনাজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক তৌহিদুল ইকবাল। তিনি বলেন, আর্থসামাজিক উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে, রুচি উন্নত হয়েছে। খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন এসেছে। এখন মোটা চালের পরিবর্তে চিকন চালের ভাত খেতে পছন্দ করছে মানুষ। এ কারণে মোটা ধান আবাদ করে কৃষক দাম পাচ্ছেন না। তারা সুগন্ধি ও চিকন ধান আবাদে ঝুঁকছেন।
তিনি আরো বলেন, ভরা মৌসুমে এক বস্তা মোটা চাল বিক্রি করে ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা পাওয়া যায়। বিপরীতে প্রতি বস্তা চিকন সুগন্ধি চালের দাম ৩ হাজার থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকা। এজন্য কৃষক অধিক লাভের আশায় সুগন্ধি ও চিকন ধানের আবাদ বাড়াচ্ছেন। কৃষি খাতের সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে কৃষকদের সব ধরনের সহায়তা দেয়া হচ্ছে। ফলে কৃষকরা সহজেই চাষাবাদ করতে পারছেন। ফলন ও লাভ বেশি হচ্ছে।