কুর্মিটোলায় সড়ক থেকে তুলে নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রীকে ধর্ষণের ঘটনায় গ্রেফতার যুবক এর আগেও অনেক নারীকে ধর্ষণ করেছে বলে জানিয়েছে র্যাব। র্যাব আরো জানায়, সে মাদকাসক্ত এবং একজন সিরিয়াল রেপিস্ট বলে স্বীকারোক্তি দিয়েছে।
গতকাল দুপুরে
রাজধানীর কারওয়ান বাজারে র্যাবের মিডিয়া সেন্টারে এক ব্রিফিংয়ে আইন ও গণমাধ্যম
শাখার পরিচালক সারোয়ার বিন কাশেম এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, মজনু নামের ৩০ বছর বয়সী ওই যুবক ধর্ষণের কথা স্বীকার করেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই ছাত্রীকে তার ছবি দেখানো হয়েছে, তিনি ধর্ষককে শনাক্ত করেছেন।
মামলাটি ক্লুলেস
ছিল উল্লেখ করে সারোয়ার বিন কাশেম বলেন,
‘ধর্ষণের শিকার ওই ছাত্রীর
মোবাইলসহ মঙ্গলবার আমরা খায়রুল ইসলাম
(৩৮) নামে এক ব্যক্তিকে
গ্রেফতার করতে সক্ষম হই। জিজ্ঞাসাবাদে খায়রুল জানায়, এটি সে কিনেছে
অরুণা নামে একজনের কাছ থেকে। এরপর অরুণার কাছ থেকে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, তার পরিচিত মজনু এই মোবাইল তার কাছে বিক্রি করেছে।’
র্যাব কর্মকর্তা
বলেন, ‘অরুণার দেয়া তথ্য ও ভিকটিমের কাছ থেকে পাওয়া
তথ্যানুযায়ী বুঝতে পারি উভয়েই একই ব্যক্তি। পরবর্তী সময়ে বেশ কয়েকবার ভিকটিমের
সঙ্গে কথা বলা হয়েছে, আমি নিজেও কথা বলেছি। ভিকটিম বলেছেন, পৃথিবীর সব চেহারা ভুলে যেতে পারি, এই লোককে ভুলব না।’
র্যাব জানায়, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে মজনু ধর্ষণের কথা স্বীকার করেছে। ১০
বছর আগে সে ঢাকায় আসে। স্ত্রী মারা যাওয়ার পর সে অপকর্মে জড়িয়ে পড়ে। মা জীবিত
থাকলেও বর্তমানে গ্রামের বাড়ির সঙ্গে মজনুর কোনো যোগাযোগ নেই। তার গ্রামের বাড়ি
নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলায়।
সংবাদ সম্মেলনে
জানানো হয়, গত ৫ জানুয়ারি রাজধানীর কুর্মিটোলায় ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রীকে ধর্ষণের পর একটি অজ্ঞাতনামা মামলা হয়। ঢাকার সব
ব্যাটালিয়ন একযোগে কাজ শুরু করে,
গোয়েন্দা সূত্রের ভিত্তিতে
বুধবার ভোররাত ৪টা ৫০ মিনিটে শ্যাওড়া লেভেল ক্রসিং থেকে ধর্ষক মজনুকে গ্রেফতার করা
হয়। এ সময় ভিকটিমের ব্যাগ, আসামির কাপড়, মোবাইল ফোন
উদ্ধার করা হয়।
র্যাবের আইন ও
গণমাধ্যম শাখার পরিচালক বলেন,
গ্রেফতার মজনু রাজধানীর
বিমানবন্দর ও শ্যাওড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় দিনমজুর ও হকার পেশার পাশাপাশি ছিনতাই ও
চুরিসহ নানাবিধ অপরাধের সঙ্গে জড়িত। সে মাদকাসক্ত এবং একজন সিরিয়াল রেপিস্ট বলে
স্বীকারোক্তি দিয়েছে। ওই ধর্ষণের ঘটনার পর সে ভিকটিমের মোবাইলটি অরুণার কাছে
বিক্রি করে আত্মগোপনে চলে যায়।
রোববার ৫
জানুয়ারি বিকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসে করে ওই ছাত্রী বান্ধবীর বাসায় যাচ্ছিলেন।
সন্ধ্যা পৌনে ৭টার দিকে কুর্মিটোলা বাস স্টপেজে নামার পর তাকে অজ্ঞাত এক ব্যক্তি
অনুসরণ করতে থাকে। এক পর্যায়ে তাকে ফুটপাতের ঝোপে নিয়ে ধর্ষণ করে। রাত ১০টার দিকে
জ্ঞান ফিরলে ওই শিক্ষার্থী বান্ধবীর বাসায় যান। সেখান থেকে বান্ধবীসহ অন্য
সহপাঠীরা তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। পরদিন সোমবার সকালে অজ্ঞাত
ব্যক্তিকে আসামি করে ওই ছাত্রীর বাবা ক্যান্টনমেন্ট থানায় মামলা করেন।
ধর্ষকের
মৃত্যুদণ্ড চান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা: ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক এএসএম মাকসুদ কামাল বলেছেন, একজন ধর্ষক আর একজন রাজাকারের মধ্যে কোনো তফাৎ নেই।
মানবতাবিরোধী অপরাধের সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড। তাই ধর্ষকদের সর্বোচ্চ শাস্তি
যাবজ্জীবন নয়, মৃত্যুদণ্ড হওয়া উচিত। এজন্য বিদ্যমান আইনের
সংস্কার প্রয়োজন।
গতকাল ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে ছাত্রী ধর্ষণের প্রতিবাদে ও অপরাধীর
দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে আয়োজিত মানববন্ধনে এসব কথা বলেন এ শিক্ষক নেতা।
অধ্যাপক মাকসুদ
কামাল বলেন, যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দেশের সংস্কারের কাজ করে, সেই প্রতিষ্ঠানের একজন শিক্ষার্থী যখন এয়ারপোর্টের কাছাকাছি
একটি জায়গায় ধর্ষণের শিকার হয়,
তখন সমগ্র জাতির সামনে
একটি প্রশ্ন এসে দাঁড়িয়ে যায়—এ দেশ কি ধর্ষকদের জন্য নিরাপদ হয়ে গেছে?
তিনি বলেন, আদালতের দীর্ঘসূত্রতার কারণে বিচার বিলম্বিত হয়। বঙ্গবন্ধুর
স্বপ্ন বাস্তবায়নের মাধ্যমে যখন আমরা একটি মানবিক সমাজ গঠন করতে চাচ্ছি, সেখানে নারীরা যদি নিরাপদ না হন, সেই লক্ষ্য কি আমরা অর্জন করতে পারব? বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী যখন ধর্ষণের শিকার হন, তখন আন্তর্জাতিকভাবে আমাদের অপমানিত হতে হয়। দেশের সর্বোচ্চ
বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থীও নিরাপদ নয়!
শিক্ষক সমিতির
মানববন্ধনে সংহতি জানিয়ে বক্তব্য রাখেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও সমিতির সাবেক
নেতা অধ্যাপক মো. আখতারুজ্জামান। তিনিও ধর্ষকদের সর্বোচ্চ শাস্তি
মৃত্যুদণ্ডের পক্ষে। উপাচার্য বলেন,
আমাদের মেয়েটি যে পাশবিক
নির্যাতনের শিকার হয়েছে, এর নিন্দা জানানোর ভাষা আমাদের নেই। এ ঘটনায় ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার সংক্ষুব্ধ। বিভিন্ন উপায় ও ভাষায় আন্দোলন চলছে। সবার একই
উদ্দেশ্য, সুষ্ঠু বিচারের মাধ্যমে দ্রুততম সময়ের মধ্যে
দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা।
তিনি বলেন, সমাজে যেন পাশবিকতা সংঘটিত না হয়, তার জন্য সমাজ-সচেতনতা সৃষ্টি করা একটি বড় কাজ। সেটি ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণ থেকে সূচিত হলো। এমন পাশবিক নির্যাতনের ঘটনায় সর্বোচ্চ
শাস্তির বিধান রাখা মনে হয় খুবই জরুরি হয়ে পড়েছে। কারণ কঠিন অবস্থানে না গেলে
সমাজে এসব পাশবিক ঘটনা আরো ঘটার আশঙ্কা থেকে যাবে।