রেন্টাল-কুইক রেন্টাল : ৫ বছরে অবসায়নে যাবে তেলভিত্তিক ৪৩৯৯ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র

দেশে উৎপাদিত বিদ্যুতের প্রায় ৩৩ শতাংশই আসে তরল জ্বালানিভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে। আগামী পাঁচ বছরে উচ্চমূল্যের এ বিদ্যুৎ থেকে নির্ভরতা কমিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এ সময়ের মধ্যে তরল জ্বালানিভিত্তিক বেসরকারি খাতের রেন্টাল ও কুইক রেন্টালের চুক্তির মেয়াদ শেষ হলে অবসায়নে যাবে ৪ হাজার ৩৯৯ মেগাওয়াট ক্ষমতার কেন্দ্র।

বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সরকারি-বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর স্থাপিত সক্ষমতা ২২ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়েছে। এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রকৃত উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় সাড়ে ১৮ হাজার মেগাওয়াট। এর মধ্যে তরল জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মোট উৎপাদনক্ষমতা ৬ হাজার ১০০ মেগাওয়াট।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সারা দেশে উৎপাদনে রয়েছে বেসরকারি খাতের ২৭টি রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র। এর মধ্যে কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংখ্যা ১৬। কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে এগ্রিকোর রয়েছে তিনটি ও ডাচ্-বাংলা পাওয়ার অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটসের বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে দুটি। একটি করে কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে ম্যাক্স পাওয়ার, দেশ এনার্জি, আইইএল পাওয়ার, সামিট পাওয়ার, পাওয়ারপ্যাক, একম, ইউনাইটেড, কেপিসিএল, খানজাহান পাওয়ার, নর্দান পাওয়ার ও সিনহা পাওয়ারের। এসব রেন্টাল ও কুইক রেন্টালের কোনো কোনোটির মেয়াদ এরই মধ্যে এক দফা বাড়ানো হয়েছে। তবে আগামীতে আর বাড়ানো হবে না বলে বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে। ফলে ২০২৩ সাল নাগাদ অবসায়নে যাচ্ছে কেন্দ্রগুলোর অধিকাংশই।

বিপিডিবির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী খালেদ মাহমুদ বলেন, মধ্যবর্তী ব্যবস্থা হিসেবে দ্রুততম সময়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে তেলভিত্তিক এসব কেন্দ্রের অনুমোদন দেয়া হয়েছিল। আগামীতে তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। কয়লা ও গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। এ ধরনের বেশকিছু কেন্দ্র শিগগিরই উৎপাদনে আসছে। এ অবস্থায় সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত হলো তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মেয়াদ আর না বাড়ানোর।

চট্টগ্রামের শিকলবাহায় অবস্থিত শাশা ডেনিমসের সাবসিডিয়ারি কোম্পানি এনার্জিস পাওয়ার করপোরেশন লিমিটেডের (ইপিসিএল) হেভি ফুয়েল অয়েল (এইচএফও) ভিত্তিক ৫৫ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে পাঁচ বছরের জন্য বিদ্যুৎ সরবরাহে ২০১৪ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি বিপিডিবির সঙ্গে চুক্তি করা হয়। চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার কারণে ১১ জুলাই থেকে কেন্দ্রটিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। যদিও আরো দুই বছরের জন্য চুক্তির মেয়াদ নবায়ন করতে গত বছরের ৩০ আগস্ট বিপিডিবির কাছে আবেদন করে কোম্পানিটি।

জানতে চাইলে শাশা ডেনিমসের কোম্পানি সচিব আসলাম আহমেদ খান বণিক বার্তাকে বলেন, চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার কারণে বিপিডিবি থেকে উৎপাদন বন্ধ রাখার জন্য বলা হয়েছে। তাই আমরা উৎপাদন বন্ধ রেখেছি। তবে আমাদের পক্ষ থেকে চুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন করা হয়েছে, যা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। আশা করছি, খুব দ্রুত মেয়াদ বাড়ানোর অনুমোদন পেয়ে যাব।

একটি কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে ইউনাইটেড পাওয়ার জেনারেশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (ইউপিজিডিসিএল)। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে এইচএফও-ভিত্তিক বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো অবসায়নে সরকারের সিদ্ধান্তের বিষয়ে ইউপিজিডিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মঈনউদ্দিন হাসান রশিদ বণিক বার্তাকে বলেন, এইচএফওর ব্যবহার কমিয়ে আনা কিংবা বন্ধ করে দেয়ার আগে বিকল্প জ্বালানি সরবরাহের বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশে হাইড্রো কিংবা সোলার ব্যবহার করে খুব বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ নেই। অন্যদিকে প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুদও ফুরিয়ে আসছে। তাই এইচএফওর বিকল্প হিসেবে এলএনজি ও কয়লা ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। বর্তমানে এলএনজি আমদানি করা হচ্ছে। অন্যদিকে কয়লা ব্যবহার করে এখনো বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হয়নি। শুরু হলে তখন বোঝা যাবে, এটি কতটুকু কার্যকর হবে।

বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহূত বিভিন্ন জ্বালানির মধ্যে সবচেয়ে ব্যয়বহুল ডিজেল ও ফার্নেস অয়েল। বিপিডিবি সূত্রে জানা যায়, ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদিত প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের গড় ব্যয় ৬-৭ টাকা। তবে ভাড়াভিত্তিক কেন্দ্র থেকে (কুইক রেন্টাল ও রেন্টাল) প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ ৮-২০ টাকায় কিনছে পিডিবি। এক্ষেত্রে সবচেয়ে সাশ্রয়ী জ্বালানি হলো প্রাকৃতিক গ্যাস। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রতি ইউনিটের উৎপাদন খরচ দুই-আড়াই টাকা। এর পরই রয়েছে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ। জ্বালানি হিসেবে কয়লা ব্যবহার করে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ পড়ে ৬ টাকা।

বর্তমানে দেশে বিভিন্ন ধরনের জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র আছে মোট ১৩৩টি। এর মধ্যে বিপিডিবির নিজস্ব বিদ্যুৎকেন্দ্র ছাড়াও রয়েছে রেন্টাল, কুইক রেন্টাল, আইপিপি ও স্মল ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার (এসআইপিপি)। গ্যাস সংকট, যান্ত্রিক ত্রুটিসহ বিভিন্ন কারণে এসব কেন্দ্রের সবগুলো একসঙ্গে উৎপাদনে থাকে না।

বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে বিদ্যুৎ কিনতে বিপিডিবির গড় ব্যয় ৬ টাকা ২৫ পয়সা। কিন্তু বিতরণ কোম্পানিগুলোর কাছে বিক্রি করতে হচ্ছে ৪ টাকা ৮৪ পয়সায়। ফলে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতে বিপিডিবির ঘাটতি থাকছে ১ টাকা ৪১ পয়সা। বিভিন্ন কোম্পানির কাছ থেকে কেনা বিদ্যুতের মূল্য বাবদ ঘাটতি অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে পাওয়া অনুদান থেকে পরিশোধ করে বিপিডিবি।

রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল থেকে বিদ্যুৎ কিনে লোকসান গুনছে বিপিডিবি। ব্যক্তি খাতের বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংখ্যা বৃদ্ধি ও সরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনে না আসার কারণে সংস্থাটির লোকসানের পরিমাণ বাড়ছে। গত ১০ বছরে বিপিডিবির লোকসান দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা।

বেসরকারি খাতের কুইক রেন্টাল ও রেন্টাল থেকে চড়া দামে কেনা বিদ্যুতের মূল্য পরিশোধ করতে গিয়ে আর্থিক সক্ষমতা ক্রমেই হারাচ্ছে বিপিডিবি। প্রতি বছরই তাদের লোকসানের পাল্লা ভারী হচ্ছে। বিদ্যুৎ ক্রয় বাবদই চলে যাচ্ছে পরিচালন ব্যয়ের সিংহভাগ। সংস্থাটির মোট পরিচালন ব্যয়ের প্রায় ৭০ শতাংশ যাচ্ছে বেসরকারি, রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ ক্রয়ে। ২০০৯-২০১০ সালে এ ব্যয় ছিল ৫৭ শতাংশ।

বিদ্যুৎ খাতের মাস্টারপ্ল্যান ২০১৬ অনুযায়ী, ২০২০ সালের জন্য বিদ্যুতের চাহিদা ধরা হয়েছে ১৪ হাজার ৯, ২০২১ সালের জন্য ১৫ হাজার ৩৯৪, ২০২৫ সালের জন্য ২১ হাজার ৯০৩, ২০৩০ সালের জন্য ৩২ হাজার ১৯৮, ২০৩৫ সালের জন্য ৪৪ হাজার ৪৮৩ ও ২০৪১ সালের জন্য ৬১ হাজার ৬৮১ মেগাওয়াট। আর এটির পর্যালোচনায় গঠিত কমিটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২০ সালের জন্য ১৭ হাজার ১৫, ২০২১ সালের জন্য ১৯ হাজার ৩৪, ২০২৫ সালের জন্য ২৮ হাজার ২৩১, ২০৩০ সালের জন্য ৪১ হাজার ৮৯০, ২০৩৫ সালের জন্য ৫৯ হাজার ২৭৫ ও ২০৪১ সালের জন্য ৮২ হাজার ২৯২ মেগাওয়াট।

আরও