এটি যে কেবল চোখের সুরক্ষা নিশ্চিত করে তা নয়; শিশুর ত্বক সতেজ রাখা, হাড়ের গঠন মজবুত করা এবং শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়াতেও এ ভিটামিন অপরিহার্য। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের দৈনন্দিন খাবারে যদি ভিটামিন এ-র ঘাটতি থাকে, তাহলে তারা সহজেই শারীরিক ও মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে, সার্বিক বিকাশ ব্যাহত হয় এবং নানাবিধ রোগে আক্রান্ত হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, ভিটামিন এ শুধু শিশুর অন্ধত্বই রোধ করে না, বরং পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মৃত্যুঝুঁকিও প্রায় এক-চতুর্থাংশ কমিয়ে আনে। তাই এই ভিটামিনকে ইমিউনিটি ভিটামিনও বলা হয়।
শিশুর শরীরে ভিটামিন এ অভাব হলে যেসব জটিলতা দেখা দেয়
শরীরে দীর্ঘদিন ভিটামিন এ ঘাটতি থাকলে শিশুদের নিম্নোক্ত সমস্যাগুলো দেখা দিতে পারে—
রাতকানা রোগ : এটি ভিটামিন এ ঘাটতির প্রাথমিক লক্ষণ। চোখের রেটিনায় অবস্থিত রড কোষ মৃদু আলোতে দেখতে সাহায্য করে, যার জন্য রোডোপসিন নামক রঞ্জক বা পিগমেন্ট প্রোটিন প্রয়োজন। ভিটামিন এর অভাব হলে এ পিগমেন্ট তৈরি ব্যাহত হয়। ফলে শিশু দিনের আলোতে সব ঠিকঠাক দেখলেও বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামলেই আর স্পষ্ট দেখতে পায় না। কম আলোতে তারা হাঁটতে গিয়ে ঘরের আসবাবপত্রের সঙ্গে ধাক্কা খায় বা অন্ধকারে যেতে ভয় পায়।
চোখের মারাত্মক ক্ষতি ও অন্ধত্ব : রাতকানা রোগের সঠিক সময়ে চিকিৎসা না হলে তা জেরোফথ্যালমিয়া নামক জটিল পর্যায়ে যেতে পারে। এটি চোখের এমন একটি অবস্থা, যেখানে চোখের স্বাভাবিক আর্দ্রতা হারিয়ে যায়; এমনকি কাঁদলেও অনেক সময় চোখ দিয়ে পানি বের হয় না। কনজাংটিভা শুকিয়ে খসখসে হয়ে পড়ে, চোখের পর্দা ঘোলাটে হয়ে যায়, চোখের সাদা অংশে ছোট ছোট ছাই রঙ বা ফেনার মতো দাগ দেখা দেয় এবং কর্নিয়ায় ঘা বা ক্ষত সৃষ্টি হয়। চূড়ান্ত পর্যায়ে চোখের মণি ধীরে ধীরে পুরোটা সাদা হয়ে শিশু সম্পূর্ণ অন্ধ হয়ে যায়।
চামড়া বা ত্বক শুষ্ক হয়ে যাওয়া : ভিটামিন এ ত্বক কোমল, মসৃণ ও সতেজ রাখতে সাহায্য করে। এর অভাব হলে শিশুর ত্বক অতিরিক্ত শুষ্ক ও প্রাণহীন হয়ে পড়ে। শরীরে ভিটামিন এর তীব্র ঘাটতি হলে ত্বকের লোমকূপের গোড়ায় কেরাটিন নামক প্রোটিনের আধিক্য দেখা দেয়। ফলে লোমকূপগুলো বন্ধ হয়ে যায় এবং ত্বক বিশেষ করে কনুই, হাঁটু, হাত ও পায়ের চামড়া ব্যাঙের চামড়ার মতো খসখসে হয়ে ওঠে। তাছাড়া ভিটামিন এর ঘাটতির কারণে ত্বকে কোনো আঘাত লাগলে বা ক্ষত তৈরি হলে তা সহজে শুকাতে চায় না।
রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে যাওয়া এবং ঘন ঘন সংক্রমণ : ভিটামিন এর অভাবে শিশুর স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে শিশু খুব সহজেই সংক্রমণজনিত নানা ব্যাধি যেমন ঠাণ্ডা, কাশি, নিউমোনিয়া, দীর্ঘমেয়াদি ডায়রিয়া কিংবা হামের মতো ছোঁয়াচে রোগে আক্রান্ত হয়। ঝুঁকিপূর্ণ বিষয় হলো এ ভিটামিনের অভাবে যেকোনো রোগ সহজে সারতে চায় না, যা শিশুর স্বাস্থ্যের জন্য দীর্ঘস্থায়ী জটিলতা সৃষ্টি করে। এছাড়া এ ভিটামিনের ঘাটতি শিশুদের স্বাভাবিক দৈহিক বৃদ্ধি ও মানসিক বিকাশকে বিলম্বিত করে তোলে।
শিশুর ভিটামিন এ ঘাটতি রোধ করুন সহজেই
- গর্ভবতী ও প্রসূতি মায়ের নিজের পুষ্টি ও শিশুর সুস্বাস্থ্যের জন্য প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় ভিটামিন এ সমৃদ্ধ খাবার রাখুন।
- সন্তান জন্ম দেয়ার পরবর্তী দুই সপ্তাহের মধ্যে প্রসূতি মাকে দুই লাখ ইউনিটের এক ডোজ ভিটামিন এ ক্যাপসুল খাওয়ান।
- ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী সব শিশুকে বছরে দুবার ভিটামিন এ ক্যাপসুল খাওয়ানো নিশ্চিত করুন।
- সদ্যোজাত শিশুকে শালদুধসহ কমপক্ষে পূর্ণ দুই বছর বয়স পর্যন্ত মায়ের বুকের দুধ পান করান।
- শিশুর বয়স ছয় মাস পার হওয়ার পর থেকে মায়ের দুধের পাশাপাশি তার প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় ভিটামিন এ সমৃদ্ধ খাবার যেমন গাজর, মিষ্টি আলু, মিষ্টি কুমড়া, পাকা আম, পাকা পেঁপে এবং গাঢ় সবুজ ও লাল শাক রাখুন। শাকসবজির পাশাপাশি শিশুকে কলিজা, ডিমের কুসুম, ছোট-বড় মাছ, মাখন, পনির বা খাঁটি দুধের মতো প্রাণিজ খাবার দিন।
- শিশুর ভিটামিন এ ঘাটতিজনিত যেকোনো শারীরিক জটিলতা দেখা দিলে যত দ্রুত সম্ভব চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন।
লেখক: কনসালট্যান্ট
পেডিয়াট্রিকস অ্যান্ড নিওনেটোলজি বিভাগ
ল্যাবএইড স্পেশালাইজড হাসপাতাল