বিশ্বব্যাপী কভিড সংক্রমণকে মহামারী হিসেবে ঘোষণা করা হয় ২০২০ সালের জানুয়ারিতে। ওই সময় থেকে এ পর্যন্ত নভেল করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত হয়েছে প্রায় ৭৭ কোটি মানুষ। এর মধ্যে ‘লং কভিডে’ (সংক্রমণের তিন সপ্তাহ পরও উপসর্গ থেকে যাওয়া) ভুগেছেন ৪০ কোটি মানুষ।
বিভিন্ন সময়ে চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের গবেষণায় উঠে এসেছে, মূলত শ্বাসনালীতে ভাইরাসের সংক্রমণজনিত রোগ হিসেবে পরিচিতি পেলেও দেহের অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গেও দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলেছে কভিড। পরিপাকতন্ত্র, স্নায়ুতন্ত্র ও হৃদযন্ত্রে এর প্রভাব নিয়ে এরই মধ্যে বেশ কিছু গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে। এবার ফ্রান্সের ইউনিভার্সিতে পারি সিতের (Université Paris Cité) একদল বিশেষজ্ঞের গবেষণায় উঠে এসেছে, বেশ কিছু ক্ষেত্রে মানবদেহের রক্তনালীর কোষকেও ক্ষতিগ্রস্ত করেছে কভিড। সংক্রমিত অনেকেরই ধমনী শক্ত হয়ে রক্তনালী দ্রুত বুড়িয়ে যেতে দেখা গেছে। এক্ষেত্রে পুরুষের চেয়ে নারীর রক্তনালীতে কভিডের দীর্ঘমেয়াদী উপসর্গগুলোর প্রভাব দেখা গেছে তুলনামূলক বেশি।
গবেষণা প্রতিবেদনটি সম্প্রতি ইউরোপিয়ান হার্ট জার্নালে প্রকাশ হয়েছে। এতে দেখা যায়, কভিডে আক্রান্ত হওয়া ব্যক্তিদের (এমনকি মৃদু উপসর্গের ক্ষেত্রেও) মধ্যে ধমনী দ্রুত শক্ত হয়ে পড়ার প্রবণতা বেশি। আর লং কভিডে আক্রান্তদের মধ্যে ধমনী শক্ত হয়ে পড়ার ঘটনা ঘটেছে সবচেয়ে বেশি। এক্ষেত্রে নারীরা পুরুষের তুলনায় বাড়তি ঝুঁকিতে থাকেন বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।
গবেষণা প্রতিবেদনটি তৈরিতে নেতৃত্ব দিয়েছেন ইউনিভার্সিতে পারি সিতের ফার্মাকোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. রোসা মারিয়া ব্রুনো । তিনি বলেন, ‘মহামারির শুরুতেই বিজ্ঞানীরা বুঝতে পেরেছিলেন যে সার্স-কভ-২ বা নভেল করোনাভাইরাস কেবল শ্বাসযন্ত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করে না। এটি মানবদেহে হৃদরোগজনিত আকস্মিক জটিলতারও কারণ হতে পারে। রক্তনালীর কোষেও সরাসরি সংক্রমণ ঘটাতে সক্ষম এটি। কভিডের পর দেহে দীর্ঘমেয়াদে কী কী প্রভাব পড়ে, সে বিষয়টি আমরা এখনো শিখছি। গবেষণায় দেখা গেছে, এর কারণে হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের মতো হৃদরোগজনিত জটিলতার ঝুঁকি বেড়ে যায়। তবে যদি শুরুতেই রক্তনালী শক্ত হয়ে যাওয়ার মতো নীরব পরিবর্তন শনাক্ত করা যায়, তবে এসব সমস্যা প্রতিরোধ করা সম্ভব।’
বিজ্ঞানীদের ভাষ্যমতে, এভাবে ধমনি শক্ত হয়ে পড়লে রক্তনালী প্রকৃত বয়সের তুলনায় গড়ে প্রায় পাঁচ বছর পর্যন্ত বুড়িয়ে যায়।
১৬টি দেশের ২ হাজার ৩৯০ জনের তথ্য পর্যালোচনার ভিত্তিতে গবেষণাটি পরিচালিত হয়েছে। এক্ষেত্রে গবেষণার আওতাধীনদের চার ভাগে ভাগ করা হয়— যারা কভিড আক্রান্ত হয়েছেন কিন্তু হাসপাতালে ভর্তি হননি, যারা সাধারণ ওয়ার্ডে ভর্তি হয়েছেন, যাদের আইসিইউতে চিকিৎসা নিতে হয়েছে এবং যারা কখনো কভিডে আক্রান্ত হননি। ক্যারোটিড-ফিমোরাল পালস ওয়েভ ভেলোসিটি (পিডব্লিউভি) নামের একটি যন্ত্র দিয়ে তাদের ধমনীর বয়সভিত্তিক কার্যকারিতা পরিমাপ করা হয়।
এ বিষয়ে ড. রোসা মারিয়া ব্রুনো বলেন, ‘কারো ধমনি যদি তার প্রকৃত বয়সের চেয়ে বেশি বুড়িয়ে যায়, তাহলে তার হৃদ্রোগের ঝুঁকিও বেড়ে যায়।’
গবেষণায় উঠে আসে, কভিডে আক্রান্ত হওয়া ব্যক্তিদের ধমনী অন্যদের চেয়ে বেশি শক্ত। ধমনীর এ ধরনের পরিবর্তন নারীদের ক্ষেত্রে পুরুষদের তুলনায় বেশি দেখা গেছে।
ড. রোসা মারিয়া ব্রুনোর ভাষ্যমতে, ‘আমরা জানতাম নারীরা লং কভিডে পুরুষদের তুলনায় বেশি ভোগেন। যদিও কভিডে মৃত্যুর হার তাদের মধ্যে কম। এর একটি কারণ হলো রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার ভিন্নতা। নারীদের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা দ্রুত এবং শক্তিশালীভাবে কাজ করে, যা তাদের তীব্র সংক্রমণ থেকে রক্ষা করে। কিন্তু একই প্রতিক্রিয়া সংক্রমণের পর রক্তনালী ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ায়। পাশাপাশি লং কভিডের উপসর্গগুলোকেও দীর্ঘায়িত করে তোলে। বিষয়টি দ্রুত শনাক্ত করা যায় এবং নিয়ন্ত্রণ করাও সম্ভব।’
— মেডিকেল নিউজ টুডে অবলম্বনে