চিকেন পক্স

গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে দরকার বিশেষ সতর্কতা

জলবসন্তে আক্রান্ত হওয়ার পর লক্ষণ দেখা দিতে সাধারণত ১০-২১ দিন সময় লাগে, যাকে ইনকিউবেশন পিরিয়ড বলা হয়।

একবার লক্ষণ শুরু হলে তা সাধারণত ৫-১০ দিন পর্যন্ত স্থায়ী হয়। শুরুতে হালকা জ্বর, মাথাব্যথা, শরীর ব্যথা, অবসাদ ও ক্ষুধামান্দ্য দেখা দিতে পারে। এরপর শরীরে ছোট ছোট লালচে দানা উঠতে শুরু করে, যা ধীরে ধীরে তরলপূর্ণ ফোসকায় পরিণত হয়।

এ ফোসকাগুলো সাধারণত প্রথমে বুক, পেট ও পিঠে দেখা যায়, পরে মুখ, মাথার ত্বক, হাত-পা এমনকি শরীরের অন্যান্য অংশেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। ফোসকাগুলো অত্যন্ত চুলকানিযুক্ত হয় এবং কয়েক দিনের মধ্যে তা শুকিয়ে খোসা পড়ে যায়।

সাধারণত শিশুদের ক্ষেত্রে রোগটি তুলনামূলক হালকা হলেও কিছু ক্ষেত্রে এটি গুরুতর জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে গর্ভবতী নারী, নবজাতক, বয়স্ক ব্যক্তি এবং যাদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল, তাদের জন্য ঝুঁকি বেশি।

গর্ভাবস্থার প্রথম ২০ সপ্তাহের মধ্যে মা আক্রান্ত হলে প্রায় ৩-৪ শতাংশ ক্ষেত্রে গর্ভপাত বা ভ্রূণের বিভিন্ন জন্মগত ত্রুটি হতে পারে, যেমন চোখের সমস্যা, মস্তিষ্কের বিকাশে ত্রুটি বা হাত-পায়ের অস্বাভাবিকতা। আবার প্রসবের পাঁচদিনের মধ্যে মা আক্রান্ত হলে নবজাতকের মারাত্মকভাবে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

এছাড়া প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে জটিলতা হিসেবে নিউমোনিয়া (ফুসফুসের সংক্রমণ), হেপাটাইটিস (লিভারের প্রদাহ), এনসেফালাইটিস (মস্তিষ্কের প্রদাহ), ত্বকে ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ ইত্যাদি হতে পারে। খুব গুরুতর অবস্থায় এটি প্রাণঘাতীও হতে পারে।

জলবসন্ত হলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ঘরোয়া পরিচর্যা ও উপসর্গভিত্তিক চিকিৎসাই যথেষ্ট। রোগীকে পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিতে হবে এবং প্রচুর পানি পান করতে হবে, যাতে শরীর পানিশূন্য না হয়ে পড়ে। জ্বর বা ব্যথা কমানোর জন্য প্যারাসিটামল ব্যবহার করা যেতে পারে, তবে অন্য কোনো ওষুধ নেয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া উচিত।

চুলকানি কমাতে অ্যান্টিহিস্টামিন জাতীয় ওষুধ বা ক্যালামাইন লোশন ব্যবহার করা যেতে পারে। যদি ত্বকে ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ দেখা দেয়, তাহলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল ক্রিম বা প্রয়োজনে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করতে হয়।

পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত হালকা গরম পানি দিয়ে গোসল করা উচিত এবং ফোসকা খোঁটা বা ফাটানো একেবারেই এড়িয়ে চলতে হবে, কারণ এতে দাগ স্থায়ী হয়ে যেতে পারে এবং সংক্রমণ ছড়াতে পারে। রোগীকে আলাদা ঘরে রাখা, আলাদা বিছানা ব্যবহার করা এবং প্রতিদিন অন্তত দুবার পরিষ্কার কাপড় পরিবর্তন করা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। ঢিলেঢালা সুতি কাপড় পরলে অস্বস্তি ও চুলকানি কম হয়।

কিছু লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে। যেমন অত্যধিক জ্বর, তীব্র শরীর ব্যথা, বুকব্যথা বা শ্বাসকষ্ট, বারবার বমি, তীব্র মাথাব্যথা, অস্বাভাবিক ঘুম ঘুম ভাব বা বিভ্রান্তি, সারা শরীরে অতিরিক্ত ফোসকা ছড়িয়ে পড়া বা র‍্যাশের অবনতি, কিংবা নারীদের ক্ষেত্রে যোনিপথে রক্তপাত। এসব উপসর্গ জটিলতার ইঙ্গিত দিতে পারে।

জলবসন্ত প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো টিকাদান। সাধারণত একবার জলবসন্ত হলে আজীবনের জন্য প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়, তবে খুব বিরল ক্ষেত্রে পুনরায় সংক্রমণ ঘটতে পারে।

যদি কারো আগে জলবসন্ত হয়েছে কিনা তা নিশ্চিত না হওয়া যায়, তাহলে বিশেষ করে গর্ভধারণের পরিকল্পনার আগে টিকা নেয়া উচিত। তবে টিকা নেয়ার পর অন্তত তিন মাস পর্যন্ত গর্ভধারণ এড়িয়ে চলা প্রয়োজন।

আরও