কোরবানির ঈদে খাওয়া-দাওয়ায় দরকার যে সতর্কতা

নানা মুখরোচক রেসিপি টেবিলে থাকলে পাতে হয়তো একটু বেশিই নিয়ে নেয়া হয় অনেক সময়। আর অতিরিক্ত খাওয়ার ফলে নষ্ট হতে পারে ঈদের আনন্দ। বিভিন্ন রকম শারীরিক সমস্যায় সতর্কতা প্রয়োজন বিভিন্নভাবে

ঈদে প্রতিটি মুসলমানের ঘরে ঘরে আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে সময় কাটানো, দাওয়াত আর নানা সুস্বাদু খাবারের আয়োজন থাকেই। বিশেষ করে কোরবানির ঈদে গরু ও খাসির মাংসকে ঘিরে তৈরি হয় নানা মুখরোচক পদ। এছাড়া কত রকম ডেজার্ট-সেমাই, ফিরনি তো রয়েছেই। রেড মিট সত্যিই সুস্বাদু। নানা মুখরোচক রেসিপি টেবিলে থাকলে পাতে হয়তো একটু বেশিই নিয়ে নেয়া হয় অনেক সময়। আর অতিরিক্ত খাওয়ার ফলে নষ্ট হতে পারে ঈদের আনন্দ। বিভিন্ন রকম শারীরিক সমস্যায় সতর্কতা প্রয়োজন বিভিন্নভাবে, যেমন-

ডায়াবেটিস

সাধারণত একজন ডায়াবেটিস রোগী মানেই রক্তে গ্লুকোজের আধিক্য। আর ঈদের সময় আমাদের বাসাবাড়িতে যেসব মিষ্টি, নানান রকম জুস শরবত বা পানীয়, ডেজার্ট তৈরি করা হয় তা হঠাৎই রক্তে শর্করা দ্রুত বাড়িয়ে দিতে পারে। এছাড়া গরু বা খাসির মাংস থাকায় পোলাও, বিরিয়ানি অর্থাৎ কার্বোহাইড্রেট ও গ্রহণ করা হয় অনেক বেশি। আর এগুলো পরবর্তী সময়ে ডায়াবেটিসের সমস্যা দ্বিগুণ বাড়িয়ে তোলে। সেক্ষেত্রে এড়িয়ে চলতে হবে এগুলো।

সরাসরি চিনির মিশ্রণে সেমাই, জর্দা, ফিরনি তৈরি করা হলে এড়িয়ে চলতে হবে, সেক্ষেত্রে এগুলো যদি খেতেই হয় প্রয়োজনে ডায়াবেটিক সুগার ব্যবহার করতে পারেন। এছাড়া বাদ দিতে হবে কোমলপানীয় ও অতিরিক্ত পরিমাণ ভাত।

মাংস গ্রহণের পাশাপাশি খাদ্য তালিকায় রাখতে হবে সালাদ, টকদই। কম তেলে রান্না নানা পদের মাংস রান্না করা যেতে পারে সবজি বা ফল দিয়ে। যেমন কাঁচা পেঁপে দিয়ে রান্না করা যায় গরুর মাংস তেমনি আনারস, কাঁচা কাঁঠাল বা আম দিয়েও তৈরি করা যেতে পারে ভিন্ন ভিন্ন গরুর মাংসের রেসিপি। এতে সবজি ও ফল দুটোই খাওয়া হয়ে যায় প্রোটিনের সঙ্গে।

উচ্চরক্তচাপ

অতিরিক্ত লবণ ও স্যাচুরেটেড ফ্যাট আমাদের রক্তচাপ বাড়াতে সাহায্য করে। সেক্ষেত্রে উচ্চরক্তচাপের রোগীদের কোরবানি ঈদে থাকতে হবে বাড়তি সতর্ক। ভালো থাকতে হলে কমাতে হবে লবণের ব্যবহার। এছাড়া প্রসেসড মিট এড়িয়ে চলতে হবে, মসলা কম দিয়ে রান্না করতে হবে। তবে শুধু বাদ দিলেই হবে না, রাখতে হবে ভালো কিছুও, যেমন পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি গ্রহণ করা অত্যন্ত প্রয়োজন। এছাড়া ফল ও সবজি একজন হাইপারটেনসিভ পেশেন্টের জন্য সবসময়ই ভালো।

হৃদরোগ

হার্টের পেশেন্টের জন্য অতিরিক্ত স্যাচুরেটেড ফ্যাট অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এ ধরনের পেশেন্টের ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া ডায়েট মেইন্টেইন করা একটু কঠিন। তবে চর্বিযুক্ত মাংস, কলিজা ও মগজ, ভাজাপোড়া খাবার, অতিরিক্ত ঘি ও তেল অবশ্যই খাদ্যতালিকা থেকে বাদ দেয়া ভালো। আর ঈদুল আজহায় যেহেতু বিভিন্ন ধরনের মাংসের সমারোহ থাকে তাই যদি খেতেই হয় এক-দুই টুকরা চর্বি ছাড়া মাংস, মাছ, ওটস, বাদাম ও শাকসবজি অল্টার করে নেয়া যেতে পারে।

কিডনি রোগ

প্রোটিনের রেস্ট্রিকশন থাকায় কিডনি রোগীর জন্য কোরবানি ঈদে ডায়েট মেইন্টেইন করা না গেলে মারাত্মক ক্ষতির সম্ভাবনা থাকে। হঠাৎ করে অতিরিক্ত প্রোটিন গ্রহণ কিডনির ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। সেক্ষেত্রে সব খাবার একা একা বাদ না দিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী খাদ্য গ্রহণ করাই শ্রেয়।

গ্যাস্ট্রিক বা আলসার

অতিরিক্ত ঝাল ও তেলযুক্ত খাবার গ্যাস্ট্রিক বাড়িয়ে দেয় সবসময়ই। এসব ক্ষেত্রে অন্তত অতিরিক্ত ঝাল ও ভাজাপোড়া খাবার এড়িয়ে চলুন। পরিমিত পানি গ্রহণ এবং অল্প অল্প করে বারবার খাওয়ার অভ্যাস প্রতিরোধ করতে পারে আলসার বা গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা।

স্থূলতা বা ওজন

সবসময়ই যারা একটু হেলদি ডায়েটে থাকে তাদের ক্ষেত্রে ঈদে বা যেকোনো অনুষ্ঠানে এত রেস্ট্রিকশন মানা সম্ভব হয় না। ঈদের কয়েক দিনের মধ্যেই অতিরিক্ত ক্যালরি গ্রহণ ওজন আরো বাড়িয়ে দিতে পারে একটু একটু করেই। তবে কিছু নিয়ম মেনে চললে শরীরকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সহজ হয়। সেক্ষেত্রে কিছু টিপস

-ঈদের কোনো এক বেলায় বেশি ভারী খাওয়া হয়ে গেলে পরবর্তী খাবার হালকা রাখুন। এক্ষেত্রে রাখতে পারেন স্যুপ, সালাদ, ফল বা সবজি, দুধ বা টকদই।

-প্রচুর পরিমাণে পানি পান করুন। এটি শরীরকে হাইড্রেট রাখবে এমনকি অতিরিক্ত ক্ষুধা বা গ্যাসের সমস্যা থাকলেও অনেকটাই আরামবোধ হবে।

-ঈদের দিন অতিরিক্ত মাংস গ্রহণ করা হয়ে

গেলেও পরের দিনগুলোতে মাংস গ্রহণ কমিয়ে দিন। এক্ষেত্রে মাংসের আইটেম রাখলেও তা রান্না করুন সবজির সঙ্গে বা ছোট টুকরা দিয়ে পাতলা ঝোল।

-ঈদের আনন্দে অতিরিক্ত খাওয়ার পাশাপাশি রাত জাগা হয়ে যায় অনেক সময়ই, তবে পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করতে না পারলে দেখা দেয় নানা

সমস্যা। -অতিরিক্ত চর্বিজাতীয় খাবার গ্রহণ করে

ফেললে একটু কুসুম গরম পানি বা লেবু পানি পান করুন। কিছুটা স্বস্তিবোধ হবে। এছাড়া কোল্ড ড্রিংকসের পরিবর্তে পানীয় হিসেবে নিতে পারেন টকদই দিয়ে তৈরি বোরহানি।

-সারা দিনে যেকোনো বেলায় লাল আটার রুটি, ওটস, ফল ও শাকসবজির মতো ফাইবার রাখুন, এতে ঈদে হঠাৎ করেই যে কনস্টিপেশনের সমস্যা দেখা দেয় তা থেকে অনেকটাই মুক্তি পাওয়া যায়।

-খাওয়ার পর ২০-৩০ মিনিট হাঁটুন। প্রথমে একটু হালকা হালকা করে হেঁটে তারপর ধীরে ধীরে গতি বাড়াতে হবে।

শারীরিক বিভিন্ন সমস্যার কথা মাথায় রেখে ও নানা রেস্ট্রিকশনের ফলে অনেকেই দুশ্চিন্তায় পড়েন যে তাহলে এবার ঈদে কতটা মাংস গ্রহণ করা নিরাপদ হবে। প্রকৃত অর্থে একজন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জন্য দিনে প্রায় ৬০-৯০ গ্রাম রান্না করা মাংসই যথেষ্ট। অর্থাৎ ২-৩ টুকরার বেশি না খাওয়াই ভালো। ঈদে অনেক বেশি মাংসের আইটেম গ্রহণের পরেও এক কোরবানি ঈদে সব মাংস একবারে খাওয়া হয়ে যায় না, সেক্ষেত্রে সংরক্ষণ করার প্রয়োজন হয় রান্না ছাড়া বাকি কোরবানির মাংস। আর এ ধরনের মাংস সংরক্ষণে সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি। এক্ষেত্রে মাংস ছোট ভাগে সংরক্ষণ করা উত্তম, বারবার গলিয়ে আবার ফ্রিজে না রেখে ছোট ছোট প্যাকেট করে রাখা ভালো। মাংস কাটার পর মাংস রাখার ক্ষেত্রে দৃশ্যমান চর্বি ফেলে সংরক্ষণ করতে হবে। এক্ষেত্রে পরিস্কার পাত্র ব্যবহার করতে হবে ও ফ্রিজ পরিষ্কার রাখতে হবে।

সত্যি বলতে ঈদের আনন্দকে ধরে রাখতে শুধু ঈদের দিন নয়, বরং সপ্তাহজুড়েই থাকতে হবে ফুড হেবিট ও লাইফস্টাইলের সামঞ্জস্য। কারণ দৈনন্দিন জীবনের গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে ঈদের আয়োজনকে সুখকর রাখতে হলে এলোমেলো খাদ্যাভ্যাস বাদ দিতে হবে। সেক্ষেত্রে ঈদের আনন্দকে আরো সুন্দর ও স্বাস্থ্যকর করে তুলতে পরামর্শ নিয়ে নিতে পারেন ডাক্তার বা পুষ্টিবিদের কাছ থেকে।

নিশাত শারমিন নিশি

প্রধান পুষ্টিবিদ ও বিভাগীয় প্রধান

পপুলার মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল

আরও