একটা সময় ছিল, যখন আত্মীয়স্বজনের মধ্যে কেউ ক্যান্সারে আক্রান্ত হলে মানুষ দূর-দূরান্ত থেকে খোঁজ নিতে যেত। হার্ট অ্যাটাক, কিডনি জটিলতা কিংবা স্ট্রোকের মতো রোগগুলোকে বয়সের সঙ্গে সম্পর্কিত মনে করা হতো। কিন্তু আজকের বাংলাদেশে দৃশ্যপট বদলে গেছে। এখন প্রতিদিনের বাস্তবতায় খুব কাছের মানুষদের মাঝেই আমরা দেখতে পাচ্ছি ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, ফ্যাটি লিভার, থাইরয়েড সমস্যা, হৃদরোগ এমনকি বিভিন্ন ধরনের ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো এসব রোগ এখন শুধু বয়স্কদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; তরুণ প্রজন্মও এর বাইরে নয়।
একটি বিষয় আমরা প্রায়ই ভুলে যাই, অসুস্থতা হঠাৎ করে আসে না। দীর্ঘদিনের অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, মানসিক চাপ, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা এবং স্বাস্থ্য সম্পর্কে উদাসীনতা ধীরে ধীরে শরীরকে এমন জায়গায় নিয়ে যায়, যেখানে রোগের জন্য আলাদা করে দরজায় কড়া নাড়তে হয় না।
কভিড-১৯ মহামারি আমাদের পৃথিবীকে অনেক কিছু শিখিয়েছে। এটি ছিল আমাদের জীবনযাত্রার দুর্বলতার সাথে মুখোমুখি হওয়ার সময়। মহামারির পর বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা একটি বিষয়ে একমত হয়েছেন, ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় স্বাস্থ্য সংকট কেবল নতুন সংক্রমণ নয়, বরং মানুষের কমে যাওয়া রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং অনিয়ন্ত্রিত জীবনধারা।
কভিড-পরবর্তী সময়ে মানুষের শারীরিক দুর্বলতা, দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য জটিলতা এবং মানসিক চাপের বিষয়গুলোও নতুন করে সামনে এসেছে। স্বাস্থ্যখাত সংশ্লিষ্ট গবেষকরা বারবার বলছেন— শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হলে ভবিষ্যতে সংক্রমণজনিত রোগ ছাড়াও দীর্ঘমেয়াদি অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি আরো বাড়তে পারে।
বাংলাদেশের বাস্তবতা এ জায়গায় আরো জটিল। কারণ আমরা এখন এক ধরনের স্বাস্থ্য রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। আগে যেখানে সংক্রামক রোগ ছিল প্রধান উদ্বেগ, এখন সেখানে অসংক্রামক রোগ বা Non-Communicable Disease (NCD) দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিভিন্ন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, ক্যান্সার এবং শ্বাসতন্ত্রের দীর্ঘমেয়াদি রোগ বর্তমানে মৃত্যুর অন্যতম কারণ হয়ে উঠছে।
কিন্তু কেন এমন হচ্ছে? উত্তর খুঁজতে গেলে প্রথমেই আসে আমাদের খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তনের বিষয়টি। কয়েক বছর আগেও পরিবারের মানুষ ঘরে তৈরি খাবার খেতে অভ্যস্ত ছিল। এখন সময়ের অভাব, ব্যস্ততা এবং পরিবর্তিত সামাজিক সংস্কৃতির কারণে ফাস্টফুড, প্রক্রিয়াজাত খাবার, অতিরিক্ত তেলযুক্ত খাদ্য, কোমল পানীয় এবং অতিরিক্ত চিনি নির্ভর খাদ্যের ব্যবহার আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে।
আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যেখানে খাবার সহজলভ্য হয়েছে, কিন্তু পুষ্টি নয়। শিশুরা ফলের পরিবর্তে প্যাকেটজাত খাবারের দিকে ঝুঁকছে, তরুণ প্রজন্ম নিয়মিত জাঙ্ক ফুড খাচ্ছে, অফিস সংস্কৃতিতে দীর্ঘ সময় বসে থাকা এবং অনিয়ন্ত্রিত খাবার গ্রহণ এখন প্রায় স্বাভাবিক বিষয় হয়ে গেছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো— অস্বাস্থ্যকর খাবারের ক্ষতি তাৎক্ষণিকভাবে বোঝা যায় না। এটি নীরবে শরীরের ভেতরে প্রদাহ তৈরি করে, হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করে, ওজন বৃদ্ধি করে এবং ধীরে ধীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল করে দেয়।
আজকাল একটি বিষয় খুব বেশি শোনা যায়— “ইমিউনিটি কমে যাচ্ছে।” বিষয়টি অনেকের কাছে সাধারণ শোনালেও এর প্রভাব অত্যন্ত গভীর। কারণ শক্তিশালী রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা শুধু ভাইরাস প্রতিরোধ করে না; এটি শরীরকে বিভিন্ন জটিল রোগের বিরুদ্ধে লড়াই করার সক্ষমতাও দেয়। যখন শরীর দুর্বল হয়, তখন ছোট সমস্যা থেকেও বড় রোগ তৈরি হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে উদ্বেগজনক জায়গাগুলোর একটি হলো ক্যান্সার পরিস্থিতি। চারপাশে তাকালে দেখা যায়— ক্যান্সার এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো রোগ নয়। প্রায় প্রতিটি পরিবারে, আত্মীয়স্বজন কিংবা পরিচিতদের মধ্যে কেউ না কেউ এই রোগের সঙ্গে লড়াই করছেন।
সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, রোগীর সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি ক্যান্সারের ধরনও পরিবর্তিত হচ্ছে। আগে নির্দিষ্ট বয়সের পর যেসব ক্যান্সার দেখা যেত, এখন তুলনামূলক কম বয়সীদের মধ্যেও সেগুলো শনাক্ত হচ্ছে। স্তন ক্যান্সার, সার্ভিক্যাল ক্যান্সার, কোলন ক্যান্সার, ফুসফুস ক্যান্সার— প্রায় সব ক্ষেত্রেই রোগীর সংখ্যা বাড়ছে।
কিন্তু আরও বড় সংকট অন্য জায়গায়। আমাদের দেশে অধিকাংশ রোগী চিকিৎসকের কাছে আসেন রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে নয়, বরং যখন পরিস্থিতি অনেক জটিল হয়ে যায়। কারণ এখনো স্বাস্থ্য পরীক্ষা, স্ক্রিনিং কিংবা প্রতিরোধমূলক চিকিৎসাকে আমরা জীবনযাপনের অংশ বানাতে পারিনি।
বাংলাদেশ উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। বড় বড় অবকাঠামো, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, শিল্পায়ন, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি— সবকিছুতেই আমরা নতুন সম্ভাবনা দেখছি। কিন্তু একটি দেশের উন্নয়নের সবচেয়ে বড় শক্তি কোনো অবকাঠামো নয়; সবচেয়ে বড় শক্তি তার সুস্থ জনগোষ্ঠী।
অসুস্থ জনগোষ্ঠী নিয়ে দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী অর্থনীতি গড়ে তোলা সম্ভব নয়। কারণ অসুস্থতা শুধু ব্যক্তির ক্ষতি করে না; এটি পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রের উপরও বড় অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করে।
তাই এখন সময় এসেছে চিকিৎসা নিয়ে ভাবনার ধরন বদলানোর। বিশ্বের উন্নত দেশগুলো এখন Preventive Healthcare বা প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবার দিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। অর্থাৎ রোগ হওয়ার পর চিকিৎসা নয়, বরং রোগ হওয়ার আগেই প্রতিরোধ ব্যবস্থা তৈরি করা।
এখন প্রশ্ন— এমতাবস্থায় আমাদের করণীয় কী?
প্রথমত, খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনতে হবে। খাবারের প্লেটে প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের পরিবর্তে ফল, শাকসবজি, স্বাস্থ্যকর প্রোটিন এবং পুষ্টিকর খাবারের পরিমাণ বাড়াতে হবে।
দ্বিতীয়ত, দৈনন্দিন জীবনে শরীরচর্চা বাড়াতে হবে। দিনে অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটা বা নিয়মিত ব্যায়াম শুধু ওজন নিয়ন্ত্রণ করে না, বরং শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও শক্তিশালী করে।
তৃতীয়ত, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা সংস্কৃতির অংশ হতে হবে। বছরে অন্তত একবার স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ক্যান্সার স্ক্রিনিং বহু রোগকে প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করতে পারে।
চতুর্থত, স্বাস্থ্য সচেতনতা নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে আরও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। কারণ শুধু হাসপাতাল বাড়িয়ে স্বাস্থ্য সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়; প্রয়োজন সচেতন জনগোষ্ঠী তৈরি করা।
আমরা এমন এক সময়ের মধ্যে আছি, যেখানে চিকিৎসা প্রযুক্তি আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে উন্নত, কিন্তু রোগের সংখ্যাও দ্রুত বাড়ছে। তাই এখন সময় এসেছে নিজেদের প্রশ্ন করার— আমরা কি অসুস্থ হওয়ার জন্য অপেক্ষা করবো, নাকি সুস্থ থাকতেই সচেতন হব?
কারণ আজকের অসচেতনতা আগামী দিনের হাসপাতালের শয্যা তৈরি করে। আর আজকের সচেতনতা তৈরি করতে পারে একটি সুস্থ, শক্তিশালী এবং নিরাপদ বাংলাদেশ।
সাকিফ শামীম
ম্যানেজিং ডিরেক্টর, ল্যাবএইড হাসপাতাল গ্রুপ এবং লাইফ প্লাস গ্রুপ
ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর, ল্যাবএইড গ্রুপ