গরমে শিশুর যত্ন

নবজাতকের প্রয়োজন বিশেষ যত্ন

ডা. মো. আরমান হোসেন

গ্রীষ্মের গরম এবার বেশ ভালোভাবেই ভোগাচ্ছে। আর এ গরমে বেশি অসুস্থ হচ্ছে শিশুরা। এজন্য গরমে নবজাতক ও শিশুদের নিতে হবে বাড়তি যত্ন

গরমে নবজাতক ও শিশুর যত্নে করণীয়

  • গরমে নবজাতককে মায়ের বুকের দুধ বারবার খাওয়াতে হবে। বুকের দুধের বাইরে কোনো ধরনের পানি কিংবা অন্য কোনো জুস বা খাবারের প্রয়োজনীয়তা নেই।
  • নবজাতক শিশুর দৈনিক প্রস্রাবের পরিমাণ পাঁচ-ছয়বারের কম হয়ে গেলে বুকের দুধ আগের চেয়ে ঘন ঘন খাওয়াতে হবে এবং তাতেও সমাধান না হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
  • বাচ্চাকে অতিরিক্ত জামাকাপড় পরানো যাবে না। ঢিলেঢালা, পাতলা ও আরামদায়ক সুতি কাপড় পরাতে হবে। সিন্থেটিক কাপড় এড়িয়ে চলাই ভালো।
  • নবজাতক ও শিশু ঘেমে গেলে, সুতি কাপড় দিয়ে তাদের শরীর মুছে দিতে হবে। শরীরে ঘাম শুকাতে দেয়া যাবে না।
  • শিশুর ঘরের তাপমাত্রা স্বস্তিদায়ক হওয়া প্রয়োজন। যে রুমে সহজে বাতাস আসা-যাওয়া করে, শিশুকে সে রুমে রাখবেন।৷ ঘরের তাপমাত্রা ২৩-২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস রাখা ভালো। এক্ষেত্রে বাসায় এসি ব্যবহারের ক্ষেত্রে অভিভাবকদের সচেতন থাকতে হবে।
  • এই গরমে শিশুদের নিয়ে ভ্রমণের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা রাখা উচিত। ভিড় এড়িয়ে চলতে হবে। সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত সরাসরি রোদে বের না হওয়া উচিত। প্রয়োজনে বড় ছাতা ও ক্যাপ ব্যবহার করতে পারেন।
  • শিশু ও নবজাতক উভয়কেই গরমে নিয়মিত গোসল করাবেন। প্রয়োজনে অতিরিক্ত গরমে দ্বিতীয়বার গোসল অথবা দ্বিতীয়বার শরীর মুছে দিতে পারেন।
  • গরমে শিশুরা এমনিতেই তেমন একটা খেতে চায় না। এ সময় শিশুকে সহজপাচ্য খাবার ও মৌসুমি ফল ও ফলের রস বা জুস বানিয়ে খাওয়াতে পারেন।

গরমে শিশুর রোগ ও প্রতিরোধের উপায়

  • এই গরমে শিশুরা বেশকিছু উপসর্গ ও রোগের সম্মুখীন হয়। তার মধ্যে অন্যতম উপসর্গ ডিহাইড্রেশন বা পানিশূন্যতা। পানিশূন্যতা প্রতিরোধে নবজাতককে বারবার বুকের দুধ আর শিশুকে পর্যাপ্ত পানি, ফলের শরবত ও কৃত্রিম চিনিমুক্ত জুস ও স্যালাইন খাওয়াতে হবে।
  • এই গরমে শরীরের ঘাম বসে শিশুদের সহজেই ঠাণ্ডা-কাশি লেগে যাচ্ছে, শুরু হচ্ছে জ্বর। ঠাণ্ডা-কাশি প্রতিরোধে শিশুকে ঘামযুক্ত কাপড় এবং ঘাম ও ভেজা শরীরে একদম রাখা যাবে না। জ্বর হলে হালকা কুসুম গরম পানি দিয়ে শরীর মুছে দিতে হবে। প্রয়োজনে শিশুকে হালকা কুসুম গরম পানি পান করাতে পারেন। জ্বর তিনদিনের বেশি থাকলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন।
  • গরমে শিশুদের বেশকিছু ত্বকের সমস্যা যেমন ঘামাচি, র‍্যাশ, চুলকানি, ফুসকুড়ি দেখা দিতে পারে। এক্ষেত্রে ত্বক যাতে পর্যাপ্ত বাতাস পায় এবং পরিষ্কার থাকে সে ব্যবস্থা নিতে হবে। বাড়তি পাউডার বা লোশন ব্যবহার না করাই ভালো। প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ক্রিম ব্যবহার করতে পারেন।
  • গরমে শিশুদের ডায়াপার ব্যবহারে র‍্যাশ বেশ বেড়ে যায়। এজন্য শিশুকে ডায়াপার পরানোর ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা, ডায়াপার ফ্রি টাইমের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়া এবং প্রয়োজনে ডায়াপার-র‍্যাশ প্রতিরোধী ক্রিম ব্যবহার করা যেতে পারে।
  • শিশুদেরও হিট স্ট্রোক হতে পারে। শিশুকে অতিরিক্ত রোদে খেলাধুলা থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করুন। বিকাল ৪টার পর বাইরে খেলতে দিতে পারেন। ছায়াযুক্ত জায়গায় খেলার পরিবেশ গড়ে তুলতে পারেন। ইনডোর গেমসের ব্যবস্থা করতে পারেন।
  • এই গরমে শিশুদের অন্যতম শত্রু ডায়রিয়া। ফুচকা, চটপটি, ফাস্টফুড ডায়রিয়ার অন্যতম কারণ। শিশুকে যতটা সম্ভব ঘরের ফ্রেশ খাবার দেবেন। ডায়রিয়া হলে স্যালাইনের বিকল্প নেই। ছয় মাসের বেশি যেসব শিশুরা মায়ের বুকের দুধ খায় তাদের মায়ের দুধের পাশাপাশি স্যালাইন ও বেশি করে তরল খাবার খাওয়াতে হবে। সঙ্গে জিংক সিরাপ দেয়া যেতে পারে।

অনেক বাবা-মা গরমে শিশুকে আদর করে আইসক্রিম, বাজারজাত কোল্ড ড্রিংকস কিনে দেন। কিন্তু এসব খাবার শরীর ঠাণ্ডা করার চেয়ে পানিশূন্যতা বাড়িয়ে দেয়। গরমের তীব্রতা আরো বাড়তে পারে। সচেতন যত্নই শিশুকে রাখতে পারে নিরাপদ ও স্বস্তিতে। তাই ভালোবাসা ও সচেতনতায় গরমটা হোক শিশুর জন্য সহনীয়।

লেখক: মেডিকেল অফিসার, শিশু বহির্বিভাগ

ডা. জাহেদ মেমোরিয়াল শিশু হাসপাতাল, ফরিদপুর

আরও