আমরা প্রতিদিন যা খাই, পান করি কিংবা রান্না করি—তার ভেতরেই লুকিয়ে আছে এক অদৃশ্য শত্রু: মাইক্রোপ্লাস্টিক। এই ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণাগুলো আমাদের চোখে পড়ে না, কিন্তু খাবার থেকে পানীয়, রান্নাঘরের বাসন থেকে প্যাকেজিং—সব জায়গাতেই তাদের উপস্থিতি। আর অজান্তেই প্রতিদিন শরীরে ঢুকছে হাজার হাজার প্লাস্টিক কণা।
গরম কড়াইয়ে রান্না করতে থাকা মাংসের ভেতরেও ঢুকে যাচ্ছে প্লাস্টিক। রান্নার সময় প্লাস্টিক গলে গিয়ে মাংসের ভেতর মিশে যায়, পরে ঠাণ্ডা হলে আবার জমাট বাঁধে। শুধু মাংস নয়—ডিম, মাছ, শাকসবজি, দুধ, রুটি, মধু, এমনকি লবণেও পাওয়া যাচ্ছে মাইক্রোপ্লাস্টিক।
গবেষণা বলছে, ১৯৯০ সালের তুলনায় ২০১৮ সালে মানুষ ছয় গুণ বেশি মাইক্রোপ্লাস্টিক খেয়েছে। কারণ উদ্ভিদ মাটির ভেতর থেকে, আর প্রাণীরা খাদ্যের মাধ্যমে এগুলো শরীরে নেয়। পরে প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে বিভিন্ন উপায়ে মানুষ এটি গ্রহণ করে।
কলের পানি থেকে শুরু করে বোতলজাত পানি—সবখানেই আছে মাইক্রোপ্লাস্টিক। শুধু বোতলের ঢাকনা খোলা-বন্ধ করার সময়ই এক লিটারে শত শত প্লাস্টিক কণা মিশে যাচ্ছে। যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জাপানসহ বহু দেশে কলের পানিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিরাপদ হলে বোতলের বদলে কলের পানি পান করাই ভালো—আর সম্ভব হলে ভালো মানের পানির ফিল্টার ব্যবহার করা উচিত।
রান্নাঘরের কাটিং বোর্ড, প্লাস্টিকের চামচ, মিক্সার, এমনকি নন-স্টিক প্যান—সবই মাইক্রোপ্লাস্টিক ছাড়ে। কেবল কাঁচি দিয়ে একটি প্যাকেট খোলার সময়ও শত শত কণা বেরিয়ে আসতে পারে। ব্যবহৃত প্লাস্টিক কন্টেইনার বা বাটি গরম করলে মিলিয়ন মিলিয়ন কণা বের হয়।
এমনকি রান্নাঘরের স্পঞ্জ পর্যন্ত বিশাল পরিমাণ মাইক্রোপ্লাস্টিক ছাড়ে, যা পরে পানির সঙ্গে মিশে যায়।
কমানোর উপায় —
সব প্লাস্টিক একসঙ্গে ফেলে দেয়ার দরকার নেই, সেটা সম্ভবও নয়। বরং—
- ক্ষতিগ্রস্ত বা আঁচড় পড়া বাসনপত্র বাদ দিয়ে বিকল্প হিসেবে কাচ বা স্টিল ব্যবহার করুন।
- অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবারের বদলে টাটকা খাবার বেছে নিন।
- চাল, মাছ বা মাংস রান্নার আগে ভালোভাবে ধুয়ে নিন।
- বোতলজাত পানির বদলে ফিল্টার করা কলের পানি খান।
- একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক ব্যাগ, কাপ বা প্যাকেজিং এড়িয়ে চলুন।
বিজ্ঞানীরা এখনও নিশ্চিত নন, শরীরে ঢোকা প্লাস্টিক কণা কতটা ক্ষতি করছে। কিছু কণা হয়তো ক্ষতিকর প্রভাব ছাড়াই শরীর দিয়ে বেরিয়ে যায়, আবার কিছু রক্ত, মস্তিষ্ক বা এমনকি প্লাসেন্টাতেও জমে থাকতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে কী হয়—তা জানতে আরো গবেষণা প্রয়োজন।
সমস্যাটা বৈশ্বিক। পরিবেশে প্লাস্টিক বর্জ্য যদি ৯০ শতাংশ কমানো যায়, তবে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোতে মানুষের খাদ্যে ঢোকা প্লাস্টিকের পরিমাণ অর্ধেক হয়ে আসতে পারে। তবে সচেতনতার ছোট ছোট পরিবর্তন আমাদের প্লাস্টিক খাওয়া অনেকটাই কমিয়ে দিতে পারে। রান্নাঘরের অদৃশ্য দূষকের বিরুদ্ধে লড়াই শুরুর সময় এখনই।
বিবিসি অবলম্বনে