বার্ড ফ্লু

পোল্ট্রি থেকে মানবদেহে সংক্রমণের ঝুঁকি ও সুরক্ষা

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরুর দিকে বাংলাদেশে এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা (এইচ৫এন১) ভাইরাসে শিশুর মৃত্যুর ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। সংস্থাটি সতর্ক করে জানিয়েছে, আক্রান্ত পোল্ট্রির সরাসরি সংস্পর্শে এলে মানুষের মৃত্যুঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। তবে এটি এখনো ব্যাপকভাবে মানুষ থেকে মানুষে ছড়ানোর প্রমাণ মেলেনি।

সম্প্রতি বিশ্বজুড়ে বার্ড ফ্লু বা এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ২০২৬ সালে বাংলাদেশে এ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর খবর আসার পর জনমনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বার্ড ফ্লু কী, এর লক্ষণ ও প্রতিকার নিয়ে বিস্তারিত তথ্য নিচে তুলে ধরা হলো।

বার্ড ফ্লু কী? এটি ভাইরাস না ব্যাকটেরিয়া?

বার্ড ফ্লু একটি সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। এর বৈজ্ঞানিক নাম ‘এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা’। এটি মূলত ইনফ্লুয়েঞ্জা টাইপ-এ ভাইরাসের একটি ধরন।

বার্ড ফ্লু বা এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা মূলত ইনফ্লুয়েঞ্জা টাইপ ‘এ’ (Influenza Type A) ভাইরাসের মাধ্যমেই সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে এইচ৫এন১, এইচ৫এন৮ ও এইচ৭এন৯ ধরনের ভাইরাসগুলো সবচেয়ে বেশি আলোচিত। রোগটি প্রথমে বন্য পাখির মধ্যে দেখা গেলেও পরে খামারের মুরগি, হাঁস ও অন্যান্য পাখির মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। মানুষের ক্ষেত্রে এটি সাধারণ ফ্লুর মতো হলেও পাখিদের ক্ষেত্রে এটি অত্যন্ত প্রাণঘাতী।

এ ভাইরাসের বিভিন্ন স্ট্রেইন যেমন: এইচ৫এন১, এইচ৫এন৮ ও এইচ৭এন৯ পাখিদের থেকে মানুষের দেহেও সংক্রমিত হয়।

উদাহরণস্বরূপ, চলতি বছরের শুরুতে চট্টগ্রাম বিভাগে এক শিশুর দেহে এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা এ(এইচ৫) সংক্রমণের খবর নিশ্চিত করেছিল বাংলাদেশ স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১ ফেব্রুয়ারি চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওই শিশুটি মারা যায়। ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় তার দেহে বার্ড ফ্লু ভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া গিয়েছিল।

এটি কি পোল্ট্রি নাকি দেশী মুরগি থেকে ছড়ায়?

বার্ড ফ্লু মূলত বন্য পরিযায়ী পাখির মাধ্যমে ছড়ালেও এটি পোল্ট্রি (ব্রয়লার ও লেয়ার) এবং দেশী মুরগি— উভয় মাধ্যমেই ছড়াতে পারে। তবে খামারে পালিত পোল্ট্রি মুরগি ঘনবসতিপূর্ণ পরিবেশে থাকে বলে সেখানে সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। আক্রান্ত পাখির লালা, বিষ্ঠা বা হাঁচি-কাশির সংস্পর্শে এলে অন্য পাখি বা মানুষ সংক্রমিত হতে পারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বক্তব্য

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরুর দিকে বাংলাদেশে এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা (এইচ৫এন১) ভাইরাসে শিশুর মৃত্যুর ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। সংস্থাটি সতর্ক করে জানিয়েছে, আক্রান্ত পোল্ট্রির সরাসরি সংস্পর্শে এলে মানুষের মৃত্যুঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়। তবে এটি এখনো ব্যাপকভাবে মানুষ থেকে মানুষে ছড়ানোর প্রমাণ মেলেনি।

রোগের লক্ষণ

মানুষের দেহে বার্ড ফ্লু সংক্রমণের লক্ষণগুলো সাধারণ ফ্লুর মতোই হয়ে থাকে। যেমন:

  • তীব্র জ্বর ও কাশির সমস্যা।
  • গলা ব্যথা ও পেশিতে ব্যথা।
  • শ্বাসকষ্ট বা নিউমোনিয়া।
  • কোনো কোনো ক্ষেত্রে চোখ ওঠা (কনজাংটিভাইটিস) বা পেটের সমস্যা দেখা দিতে পারে।

প্রতিকার ও চিকিৎসা

বার্ড ফ্লু শনাক্ত হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। সাধারণত অ্যান্টি-ভাইরাল ওষুধ এর চিকিৎসায় কার্যকর। তবে রোগ জটিল আকার ধারণ করলে হাসপাতালে নিবিড় পর্যবেক্ষণে চিকিৎসার প্রয়োজন হয়।

প্রতিরোধ ও বাঁচার উপায়

বার্ড ফ্লু থেকে বাঁচতে সাধারণ কিছু সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি।

  • মাংস ভালো করে রান্না: মুরগির মাংস ও ডিম অন্তত ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ভালোভাবে সেদ্ধ করে খেতে হবে। আধাসিদ্ধ মাংস বা ডিম খাওয়া বিপজ্জনক।
  • খামারে সুরক্ষা: খামারিদের মাস্ক, গ্লাভস ও পিপিই ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। খামারে বহিরাগত প্রবেশ বন্ধ রাখতে হবে।
  • পরিচ্ছন্নতা: কাঁচা মাংস বা ডিম ধরার পর হাত সাবান দিয়ে ভালো করে ধুয়ে ফেলতে হবে।
  • অসুস্থ পাখি এড়িয়ে চলা: কোনো পাখি অসুস্থ বা হঠাৎ মারা গেলে সেটিকে খালি হাতে স্পর্শ করা যাবে না। দ্রুত নিকটস্থ পশু হাসপাতাল বা বনবিভাগকে জানাতে হবে।
  • বাজার তদারকি: কাঁচা বাজারে যেখানে মুরগি জবাই করা হয়, সেই স্থানগুলো নিয়মিত জীবাণুমুক্ত রাখা প্রয়োজন।

বার্ড ফ্লু নিয়ে আতঙ্কিত না হয়ে সচেতন থাকাই এর প্রধান প্রতিরোধ। নিয়মিত হাত ধোয়া ও রান্নার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করলে এ ভাইরাসের ঝুঁকি থেকে মুক্ত থাকা সম্ভব।

আরও