কফি
পরিমিত কফি পান লিভারের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী হতে পারে। বিভিন্ন গবেষণায় কফি পানকারীদের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি লিভার রোগ, লিভারে চর্বি জমা এবং কিছু ধরনের লিভার ক্যান্সারের ঝুঁকি তুলনামূলক কম থাকার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। কফিতে থাকা বিভিন্ন জৈব সক্রিয় উপাদান লিভারে প্রদাহ ও ক্ষতির বিরুদ্ধে সুরক্ষা দিতে পারে।
গ্রিন টি
গ্রিন টিতে রয়েছে ক্যাটেচিন নামের অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট। এটি শরীরের কোষকে অক্সিডেটিভ ক্ষতি থেকে রক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারে। কিছু গবেষণায় গ্রিন টি গ্রহণের সঙ্গে লিভারে চর্বি জমার পরিমাণ কমার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে গ্রিন টি লিভারের রোগের চিকিৎসা নয় এবং অতিরিক্ত পরিমাণে গ্রিন টি বা এর ঘনীভূত নির্যাস গ্রহণ ক্ষতিকর হতে পারে।
বেরি
ব্লুবেরি, ক্র্যানবেরি ও রাস্পবেরির মতো বেরিতে পলিফেনলসহ বিভিন্ন অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট রয়েছে। এসব উপাদান শরীরে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস ও প্রদাহ কমাতে সহায়তা করতে পারে। ফলে পরিমিত পরিমাণে বিভিন্ন ধরনের বেরি খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে।
আঙুর
বিশেষ করে লাল ও বেগুনি আঙুরে বিভিন্ন অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট ও উদ্ভিজ্জ যৌগ রয়েছে। এর মধ্যে রেসভেরাট্রল অন্যতম। এসব উপাদান শরীরে প্রদাহ ও অক্সিডেটিভ স্ট্রেস কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে আঙুরের রসের তুলনায় আস্ত আঙুর খাওয়াই ভালো, কারণ এতে খাদ্যআঁশও পাওয়া যায়।
ওটমিল
ওটমিলে রয়েছে প্রচুর খাদ্যআঁশ। বিশেষ করে, এতে থাকা বিটা-গ্লুকান অন্ত্রের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী এবং রক্তে কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে। স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের অংশ হিসেবে ওটমিল খেলে ওজন ও বিপাকীয় স্বাস্থ্য নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হয়, যা লিভারে অতিরিক্ত চর্বি জমার ঝুঁকি কমাতে সহায়ক।
বাদাম
চীনা বাদাম ও অন্যান্য বাদামে স্বাস্থ্যকর অসম্পৃক্ত চর্বি, ভিটামিন ও বিভিন্ন অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট রয়েছে। পরিমিত বাদাম খাওয়ার সঙ্গে লিভারের স্বাস্থ্যের ইতিবাচক সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে বাদামে ক্যালরি বেশি থাকায় অতিরিক্ত খাওয়া উচিত নয়।
রসুন
রসুনে থাকা সালফারযুক্ত বিভিন্ন যৌগ শরীরের বিপাকক্রিয়ায় ভূমিকা রাখে। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, খাদ্যাভ্যাসের অংশ হিসেবে রসুন গ্রহণ অতিরিক্ত ওজন বা নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিজিজে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য উপকারী হতে পারে। তবে শুধু রসুন খেয়েই ফ্যাটি লিভার ভালো হয়ে যায়, এমন প্রমাণ নেই। ওজন নিয়ন্ত্রণ ও সামগ্রিক স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ডিম
ডিম উচ্চমানের প্রোটিনের উৎস। এতে প্রয়োজনীয় অ্যামাইনো অ্যাসিডের পাশাপাশি কোলিন রয়েছে। কোলিন লিভারে চর্বি পরিবহন ও বিপাকের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান। তাই পরিমিত পরিমাণে ডিম সুষম খাদ্যের অংশ হতে পারে।
লিভারের জন্য যেসব খাবার ক্ষতিকর হতে পারে
লিভার সুস্থ রাখতে শুধু উপকারী খাবার খাওয়াই যথেষ্ট নয়। কিছু খাবার ও পানীয় নিয়মিত বা অতিরিক্ত গ্রহণের অভ্যাসও কমাতে হবে।
অ্যালকোহল
লিভারের জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর উপাদানগুলোর একটি অ্যালকোহল। লিভার অ্যালকোহল ভাঙার সময় এমন কিছু রাসায়নিক তৈরি করে, যা লিভারের কোষের ক্ষতি করতে পারে। দীর্ঘদিন অতিরিক্ত অ্যালকোহল গ্রহণে লিভারে প্রদাহ, চর্বি জমা ও দাগ তৈরি হতে পারে। গুরুতর ক্ষেত্রে তা সিরোসিস ও লিভার ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
অতিরিক্ত চিনিযুক্ত খাবার
অতিরিক্ত চিনি গ্রহণ শরীরে বাড়তি ক্যালরি যোগ করে। বিশেষ করে চিনি ও পরিশোধিত কার্বোহাইড্রেট বেশি থাকা খাবার নিয়মিত খেলে ওজন বৃদ্ধি ও বিপাকীয় সমস্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে। এর সঙ্গে লিভারে অতিরিক্ত চর্বি জমারও সম্পর্ক রয়েছে। কোমল পানীয়, মিষ্টি, কেক, বিস্কুট ও অতিরিক্ত চিনিযুক্ত প্যাকেটজাত খাবার তাই সীমিত রাখা ভালো।
অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত ও ভাজা খাবার
পিৎজা, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, বার্গার এবং গভীর তেলে ভাজা খাবারে ক্যালরি ও অস্বাস্থ্যকর চর্বি বেশি থাকতে পারে। এসব খাবার নিয়মিত খেলে ওজন বৃদ্ধি, রক্তে চর্বির ভারসাম্যহীনতা ও লিভারে চর্বি জমার ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই এ ধরনের খাবার যতটা সম্ভব সীমিত রাখা উচিত।
অতিরিক্ত লাল মাংস
লাল মাংস প্রোটিন, আয়রন ও অন্যান্য পুষ্টির ভালো উৎস হলেও অতিরিক্ত পরিমাণে খাওয়া স্বাস্থ্যকর নয়। বিশেষ করে চর্বিযুক্ত লাল মাংস বেশি খেলে ক্যালরি ও স্যাচুরেটেড ফ্যাটের পরিমাণ বেড়ে যায়, যা দীর্ঘমেয়াদে বিপাকীয় স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই পরিমাণ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি চর্বি কম থাকা অংশ বেছে নেয়া ভালো।
অতিরিক্ত লবণযুক্ত খাবার
প্যাকেটজাত খাবার, প্রক্রিয়াজাত মাংস, ইনস্ট্যান্ট নুডলস, চিপস ও কিছু টিনজাত খাবারে সোডিয়ামের পরিমাণ বেশি থাকে। অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ উচ্চ রক্তচাপসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই এসব খাবার সীমিত রেখে তাজা ও কম প্রক্রিয়াজাত খাবার বেছে নেয়া ভালো।
লিভার সুস্থ রাখার জন্য কোনো একটি খাবারকে ‘ম্যাজিক ফুড’ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। পর্যাপ্ত শাকসবজি, ফল, পূর্ণ শস্য, স্বাস্থ্যকর চর্বি ও পরিমিত প্রোটিনের সমন্বয়ে সুষম খাদ্যগ্রহণ, নিয়মিত শরীরচর্চা, স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা এবং অ্যালকোহল এড়িয়ে চলাই লিভারের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যের জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
যাদের ফ্যাটি লিভার, হেপাটাইটিস, সিরোসিস বা অন্য কোনো লিভারের রোগ রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে খাদ্যতালিকা রোগের ধরন ও শারীরিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে ভিন্ন হতে পারে। তাই এমন ক্ষেত্রে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ অনুযায়ী খাদ্যাভ্যাস ঠিক করা উচিত।