মূলত বায়ুদূষণ ও ধূমপানের উচ্চ হারের কারণে রোগটি জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি ফুসফুসের একটি দীর্ঘমেয়াদি ও জটিল অবস্থা, যা ধীরে ধীরে শ্বাস-প্রশ্বাসের বায়ু চলাচলের প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে দেয়।
সিওপিডি আসলে কী
সিওপিডি মূলত কোনো একক রোগ নয়, বরং এটি ফুসফুসের একাধিক সমস্যার সমষ্টি। প্রধানত দুইভাবে সমস্যাটি তৈরি হয়। একটি হলো ব্রঙ্কাইটিস, অন্যটি এমফাইসিমা। ক্রনিক ব্রঙ্কাইটিসে ফুসফুসের ভেতরে বাতাস চলাচলের নালিগুলো দীর্ঘ সময় ধরে ফুলে থাকে এবং প্রচুর কফ তৈরি হয়। অন্যদিকে এমফাইসিমা অবস্থায় ফুসফুসের ভেতরের সূক্ষ্ম বায়ুথলিগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ফুসফুস পর্যাপ্ত অক্সিজেন রক্তে পৌঁছতে পারে না। এ সম্মিলিত অবস্থাই হলো সিওপিডি।
লক্ষণ
টানা কাশি ও কফ: কাশির সঙ্গে কফ নির্গত হয় এবং সারা বছরই খুসখুসে কাশি লেগে থাকে।
দ্রুত হাঁপিয়ে ওঠা: অল্প পরিশ্রম কিংবা সামান্য সিঁড়ি ভাঙলেও জোরে জোরে শ্বাস নিতে হয়।
বুকে শব্দ হওয়া: নিশ্বাস নেয়ার সময় বুকের ভেতর থেকে শাঁ শাঁ শব্দ হয়।
ঘন ঘন সংক্রমণ: সর্দি-কাশি এবং বুকে কফ জমার মতো সমস্যা লেগেই থাকে।
সিওপিডি খুব ধীরে ধীরে শরীরে বিস্তার লাভ করে। অনেক সময় রোগটি মারাত্মক পর্যায়ে যাওয়ার আগে রোগী বুঝতে পারেন না। রোগটি গুরুতর পর্যায়ে পৌঁছলে শারীরিক দুর্বলতা এবং দ্রুত শরীরের ওজন কমে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দেয়।
কেন হয় এ রোগ
এটি মূলত আমাদের জীবনযাত্রা ও পরিবেশের ওপর নির্ভর করে। এর প্রধান কারণগুলো হলো—
ধূমপান
সিওপিডি আক্রান্তদের প্রায় ৮০-৯০ শতাংশই ধূমপায়ী। বিড়ি-সিগারেটের ধোঁয়া ফুসফুসের বায়ুথলিগুলোকে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত করে। যারা পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হন, তারাও এ রোগের ঝুঁকিতে আছেন।
ঘরের ধোঁয়া ও রান্নার পদ্ধতি
বদ্ধ ঘরে লাকড়ি বা ঘুঁটে দিয়ে রান্নার ধোঁয়া সরাসরি ফুসফুসে প্রবেশ করে। গ্রামীণ নারীদের সিওপিডি আক্রান্ত হওয়ার এটি একটি বড় কারণ।
বায়ুদূষণ
শিল্পাঞ্চল বা বড় শহরগুলোর ধূলিকণা ও রাসায়নিক মিশ্রিত বাতাস ফুসফুসের দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহ সৃষ্টি করে।
পেশাগত
ইটভাটা, সিমেন্ট কারখানা বা জুট ও টেক্সটাইল মিলের ধুলোবালি ফুসফুসের মারাত্মক ক্ষতি করে।
এছাড়া জিনগত কারণেও সিওপিডি হতে পারে। অ্যালার্জিজনিত সমস্যা এবং ৪০ বছরের বেশি বয়সীদের এ রোগের ঝুঁকি অপেক্ষাকৃত বেশি।
জীবন বাঁচাতে করণীয়
সিওপিডি পুরোপুরি সারানো যায় না, তবে সুচিকিৎসার মাধ্যমে রোগের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রেখে স্বাভাবিক জীবনযাপন করা যায়। তাই সঠিক ব্যবস্থাপনা এবং সতর্কতা অবলম্বনই সুস্থ থাকার একমাত্র উপায়। এক্ষেত্রে নিম্নের পরামর্শগুলো দৈনন্দিন জীবনে মেনে চলুন—
ধূমপান বর্জন: রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখার প্রথম শর্ত হলো সব ধরনের তামাকজাত দ্রব্য বর্জন করা।
টিকা গ্রহণ: সিওপিডি রোগীদের সর্দি থেকেও নিউমোনিয়া হতে পারে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শে ইনফ্লুয়েঞ্জা ও নিউমোনিয়ার টিকা গ্রহণ করুন।
মাস্ক ব্যবহার: ধুলোবালি ও ধোঁয়া থেকে বাঁচতে বাইরে বের হলে মাস্ক ব্যবহার করুন।
পুষ্টিকর খাবার: শরীর দুর্বল হলে শ্বাসকষ্টের প্রকোপ বেড়ে যায়, তাই নিয়মিত পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করুন।
নিশ্বাসের ব্যায়াম: চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী বিশেষ শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম করলে ফুসফুসের কার্যকারিতা কিছুটা বাড়ে। নিয়মিত ব্যায়ামগুলো করতে পারেন।
ইনহেলারের সঠিক ব্যবহার: সিওপিডি নিয়ন্ত্রণে ইনহেলার বা ব্রঙ্কোডাইলেটর ওষুধ অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করে। ইনহেলার সরাসরি ফুসফুসের শ্বাসনালিতে পৌঁছে শ্বাস-প্রশ্বাসকে সহজ করে তোলে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত ও সঠিক পদ্ধতিতে ইনহেলার ব্যবহার করুন।
লেখক: সাবেক পরিচালক
জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল
মেডিসিন, অ্যাজমা ও বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ
ল্যাবএইড স্পেশালাইজড হাসপাতাল