রুবেলা প্রতিরোধে টিকা গ্রহণ জরুরি

অধ্যাপক ডা. মো. রফিকুল ইসলাম

‘জার্মান মিজেলস’ নামে পরিচিত রুবেলা ভাইরাসজনিত অতিসংক্রামক একটি রোগ।

এটি আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি-কাশির ড্রপলেটের সঙ্গে বাতাসে ছড়ায় এবং শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে অন্য সুস্থ মানুষকে সংক্রমিত করে। এছাড়া কোনো গর্ভবতী নারী এ ভাইরাসে আক্রান্ত হলে গর্ভফুলের মাধ্যমে গর্ভস্থ শিশুর শরীরেও এটি ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণত রুবেলা খুব জটিল কোনো রোগ নয় এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এমনিতেই সেরে যায়। তবে গর্ভাবস্থায় এতে সংক্রমিত হলে অনাগত শিশুর জন্য এর পরিণতি হতে পারে অত্যন্ত ভয়াবহ। পাশাপাশি শিশুরা এ ভাইরাসে আক্রান্ত হলে তাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা অনেক কমে যায়। তাই ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুরক্ষিত রাখতে রুবেলা ভাইরাস সম্পর্কে সঠিক ধারণা রাখা এবং এর প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।

লক্ষণ ও উপসর্গ

ভাইরাসটি প্রথমে শ্বাসনালিতে সংক্রমিত হয়, এরপর রক্তের মাধ্যমে দেহের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়ে। সংক্রমণের ১৪-২১ দিনের মধ্যে রোগটির বেশকিছু লক্ষণ ও উপসর্গ প্রকাশ পায়। যেমন—

 হালকা জ্বর, হাঁচি-কাশি ও নাক দিয়ে পানি পড়া।

 মাথাব্যথা ও গলাব্যথা।

 খাবারে অরুচি, বমিভাব ও দুর্বলতা।

 চোখ চুলকানো এবং চোখ-মুখ লাল হয়ে ফুলে যাওয়া।

 লাল বা গোলাপি ফুসকুড়ি ওঠা যা কানের পিছনে শুরু হয়ে পরবর্তী চার-ছয়দিনের মধ্যে মাথা, ঘাড় ও শরীরের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়ে।

 মাথা, ঘাড় ও কানের পেছনের গ্রন্থি ফুলে যাওয়া এবং ব্যথা হওয়া।

 শরীরে বিভিন্ন জয়েন্ট বা গিঁটে ব্যথা, বিশেষ করে— আঙুল, কব্জি ও হাঁটুতে ব্যথা।

 ত্বকে কালশিটে দাগ দেখা দেয়া।

আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে লক্ষণ দেখা দেয়ার এক সপ্তাহ আগে থেকে শুরু হয়ে লক্ষণ প্রকাশের পরবর্তী পাঁচদিন পর্যন্ত এ রোগ অন্যদের মধ্যে ছড়াতে পারে।

গর্ভাবস্থায় রুবেলা সংক্রমণের জটিলতা

গর্ভাবস্থায় রুবেলা ভাইরাসের সংক্রমণ গর্ভের শিশুর জন্য মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। গর্ভাবস্থার শুরুর দিকে এ ভাইরাসে আক্রান্ত হলে গর্ভপাতের ঝুঁকি অনেকাংশে বেড়ে যায়। এমনকি শিশু বেঁচে থাকলেও সে জন্মগত নানা স্বাস্থ্য জটিলতা নিয়ে পৃথিবীতে আসতে পারে। যেমন—

 শিশু স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক কম ওজন নিয়ে জন্ম নিতে পারে।

 চোখে ছানি পড়া, গ্লুকোমা, দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়া, চোখের গঠন ত্রুটিপূর্ণ হওয়া, এমনকি শিশু সম্পূর্ণ অন্ধও হতে পারে।

 শিশু আংশিক বা সম্পূর্ণ বধির হয়ে জন্মাতে পারে।

 জন্মগতভাবেই শিশুর হার্টে বা হৃদযন্ত্রে বিভিন্ন জটিলতা দেখা দিতে পারে।

 শিশুর মাথার আকার স্বাভাবিকের চেয়ে ছোট হতে পারে এবং সে বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিবন্ধকতা বা মানসিক ভারসাম্যহীনতা নিয়ে বড় হতে পারে।

 জন্মগতভাবেই শিশুর লিভার বা যকৃতে ত্রুটি, ফুসফুসের প্রদাহ এবং থাইরয়েডসহ অন্যান্য হরমোনজনিত নানা সমস্যা দেখা দিতে পারে।

রুবেলা ভাইরাসের কারণে সৃষ্ট এ জন্মগত ত্রুটিগুলোকে ‘কনজেনিটাল রুবেলা সিনড্রোম’ বা সিআরএস বলা হয়।

গর্ভধারণের প্রথম ২০ সপ্তাহের মধ্যে কোনো নারী রুবেলা আক্রান্ত রোগীর সংস্পর্শে এলে বা নিজের মধ্যে এর লক্ষণ দেখলে যত দ্রুত সম্ভব চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। জটিলতা এড়াতে চিকিৎসকের পরামর্শে জরুরি ভিত্তিতে ‘ইমিউনোগ্লোবিউলিন’ অর্থাৎ এক ধরনের অ্যান্টিবডি ইনজেকশন দিতে হবে। পাশাপাশি নিয়মিত আল্ট্রাসনোগ্রাফি ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে গর্ভের শিশুর শারীরিক বিকাশ পর্যবেক্ষণ করতে হবে।

টিকার মাধ্যমে রুবেলা প্রতিরোধ করুন সহজেই

রুবেলা প্রতিরোধের একমাত্র কার্যকর উপায় হলো যথাসময়ে হাম-মাম্পস-রুবেলা (এমআর/এমএমআর) টিকার দুই ডোজ গ্রহণ করা। বাংলাদেশ সরকারের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি অনুযায়ী, শিশুর বয়স নয় মাস হলে প্রথম ডোজ এবং ১৫ মাস হলে দ্বিতীয় ডোজ টিকা দেয়া হয়। কোনো কারণে এ সময়ে টিকা বাদ পড়লে পরবর্তী সময়ে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী দ্রুত তা নিয়ে নিতে হবে। যেসব নারী সন্তান ধারণের পরিকল্পনা করছেন, কিন্তু এখনো রুবেলার টিকা নেননি, তারা সন্তান নেয়ার অন্তত এক থেকে তিন মাস আগে চিকিৎসকের পরামর্শে রুবেলার টিকা নেবেন। তবে গর্ভাবস্থায় কোনোভাবেই এ টিকা নেয়া যাবে না।

সংক্রমণ এড়াতে মেনে চলুন কিছু নিয়ম

 আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শ এড়িয়ে চলুন। বিশেষ করে, শিশু ও গর্ভবতী মায়েদের ক্ষেত্রে এ বিষয়ে অতিরিক্ত সচেতন হওয়া অত্যন্ত জরুরি।

 আক্রান্ত ব্যক্তির ব্যবহৃত বাসন-কোসন, তোয়ালে, জামাকাপড় ও বিছানা আলাদা রাখুন।

 একটু পর পর সাবান পানি দিয়ে ভালোভাবে হাত ধুয়ে নিন।

 চোখ-নাক-মুখে হাত দেয়া থেকে বিরত থাকুন।

 হাঁচি-কাশির সময় টিস্যু ব্যবহার করুন এবং ব্যবহৃত টিস্যু নির্দিষ্ট ডাস্টবিনে ফেলুন।

 শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়াতে নিয়মিত সুষম ও পুষ্টিকর খাবার খান।

লেখক: মেডিসিন বিশেষজ্ঞ

ল্যাবএইড আইকনিক, কলাবাগান, ঢাকা

আরও