ফলে প্রচণ্ড শীত কিংবা তীব্র গরম উভয় ঋতুতেই শিশুরা অনেক বেশি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকে। শিশুদের শরীরের তাপমাত্রা বড়দের তুলনায় দ্রুত বাড়ে। ফলে অসহনীয় গরমে তারা ভীষণ অস্বস্তিবোধ করে, অস্থির হয়ে ওঠে এবং মেজাজ খিটখিটে হয়ে পড়ে। শিশু অনবরত ঘামতে থাকে, যার ফলে শরীর থেকে প্রয়োজনীয় পানি ও লবণ বেরিয়ে যায়। এ পানিশূন্যতার কারণে শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে, প্রচণ্ড মাথাব্যথা, বমি ও হিট স্ট্রোকের মতো ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে। সেই সঙ্গে প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়া, কোষ্ঠকাঠিন্য, ঘামাচি, জ্বর, ডায়রিয়া ও সর্দি-কাশির মতো শারীরিক সমস্যায় তারা ভুগতে থাকে। সঠিক সময়ে পর্যাপ্ত সতর্কতা অবলম্বন না করলে ভাইরাস জ্বর, নিউমোনিয়া এমনকি শ্বাসতন্ত্রের বিভিন্ন জটিল রোগ হওয়ার আশঙ্কাও থাকে। তাই এ গরমে শিশুর প্রয়োজন বাড়তি যত্ন।
শিশুর শরীরে পানিশূন্যতা রোধে বিশেষ সতর্ক থাকুন
গরমে শিশুর পানিশূন্যতা রোধে অভিভাবকদের বিশেষ খেয়াল রাখা প্রয়োজন। ছয় মাসের কম বয়সী শিশুদের বারবার বুকের দুধ খাওয়াতে হবে। এ সময়ে বুকের দুধের পর্যাপ্ততা বজায় রাখতে মাকেও নিজের স্বাস্থ্যের দিকে নজর দিতে হবে। তাকে নিয়মিত পুষ্টিকর খাবারের পাশাপাশি পর্যাপ্ত পানি, ডাবের পানি, দুধ ও ফলের রস পান করতে হবে।
অন্যদিকে ছয় মাসের বেশি বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে নিয়মিত খাবারের পাশাপাশি তরল খাবারের দিকে বাড়তি মনোযোগ দেয়া জরুরি। শিশুকে ঘনঘন ফুটানো ঠাণ্ডা পানি, ডাবের পানি বা ফলের রস পান করান। প্রস্রাবের পরিমাণ স্বাভাবিক আছে কিনা খেয়াল রাখুন। শিশুর কোষ্ঠকাঠিন্য কিংবা পায়খানার সঙ্গে যদি রক্ত যায়, তাহলে অবশ্যই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
অতিরিক্ত ঘাম কিংবা পেট খারাপ হলে সঠিকভাবে প্রস্তুত করা খাবার স্যালাইন খাওয়াতে পারেন। তবে শিশুর গরমের অস্বস্তি দূর করতে রাস্তা বা ফুটপাত থেকে কোনো ধরনের রঙিন পানীয় কিংবা আইসক্রিম কিনে দেয়া থেকে বিরত থাকুন। কারণ গরমে এসব খোলা ও অস্বাস্থ্যকর খাবার থেকে পানিবাহিত রোগ সংক্রমণের ঝুঁকি থাকে, যা শিশুর স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে।
শিশুর শরীর শীতল রাখুন এবং আরামদায়ক পোশাক নিশ্চিত করুন
প্রচণ্ড গরমে শিশুর শরীরে ঘামাচি ওঠার প্রবণতা বেড়ে যায়। এ সমস্যা রোধে শিশুকে নিয়মিত গোসল করানো প্রয়োজন, তবে খেয়াল রাখতে হবে যেন পানি খুব বেশি ঠাণ্ডা না হয়। গোসলের পাশাপাশি শিশুর শরীর ঠাণ্ডা রাখতে নরম ভেজা গামছা বা তোয়ালে দিয়ে মাথাসহ পুরো শরীর বারবার মুছে দিন। ঘামাচির সমস্যায় শিশুদের উপযোগী পাউডার ব্যবহার করতে পারেন। তবে পাউডার লাগানোর আগে শিশুর শরীর একটি নরম ভেজা কাপড় দিয়ে আলতো করে মুছে নিন। পোশাকের ক্ষেত্রে পরিষ্কার, হালকা রঙের এবং আরামদায়ক সুতির ঢিলেঢালা পোশাক নির্বাচন করা জরুরি। এ সময় শিশুর ত্বককে সুস্থ রাখতে মাঝেমধ্যে ডায়াপার খুলে রাখাই ভালো।
ঘরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখুন
শিশুকে আরামদায়ক রাখতে এ সময় ঘরের পরিবেশ ঠাণ্ডা রাখা জরুরি। তাই ঘরে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস চলাচল নিশ্চিত করুন। ঘরের ভেতর জানালা বা দরজায় ভেজা তোয়ালে ঝুলিয়ে রাখতে পারেন। এটি বাষ্পীভবনের মাধ্যমে ঘরের তাপমাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনে। ফ্যান বা এসি ব্যবহারের ক্ষেত্রে সহনীয় মাত্রা বজায় রাখুন এবং সতর্ক থাকুন যেন এসির ঠাণ্ডা বাতাস সরাসরি শিশুর গায়ে না লাগে। এছাড়া দিনের বেলা কড়া রোদ থেকে বাঁচতে পর্দা টেনে রাখুন। এতে ঘরের ভেতর সরাসরি সূর্যের তাপ প্রবেশ করতে পারবে না। ঘরের আসবাব গুছিয়ে রাখুন, যাতে বাতাস প্রবাহ ব্যাহত না হয়। মেঝে সবসময় পরিষ্কার রাখুন। প্রয়োজনে শীতল পাটি ব্যবহার করতে পারেন। ঠাণ্ডা ও পরিষ্কার মেঝে শিশুর শারীরিক অস্বস্তি কমাতে সহায়ক।
শিশুর চুলের বাড়তি যত্ন নিন : গরমে চুলের গোড়া ঘেমে যায় দ্রুত। সঙ্গে বাতাসে ওড়া ধুলাবালির কারণে ঘামে ভিজে চুল জড়িয়ে যায়। এটি নিয়মিত পরিষ্কার না করলে মাথার ত্বকে খুশকি, ঘামাচিসহ নানা ধরনের চর্মরোগ দেখা দিবে। তাই এ সময়ে শিশুর চুলেরও বাড়তি যত্ন নিতে হবে। গরমে শিশুর চুল ছোট করে রাখতে পারেন। বড় চুল হলে নিয়মিত যত্ন নিন। গোসল করার পর চুল ভালোভাবে মুছে নিয়ে চিরুনি দিয়ে আঁচড়ে দিন। এরপর চুল শুকিয়ে গেলে ভালোভাবে বেঁধে দিন। চুল ও মাথার ত্বক পরিষ্কার রাখতে শিশুদের উপযোগী শ্যাম্পু ব্যবহার করুন।
লেখক: নবজাতক, শিশু এবং কিশোর রোগ বিশেষজ্ঞ
ল্যাবএইড আইকনিক, কলাবাগান, ঢাকা