রুবেলা

রুবেলা নিয়ে প্রচলিত ১০টি ভুল ধারণা

রুবেলা নামটি শুনলেই অনেকের মনে হয় এটি শিশুদের একটি সাধারণ ভাইরাসজনিত রোগ।

হালকা জ্বর, শরীরে র‍্যাশ, কয়েক দিনের অসুস্থতা—ব্যস, এতটুকুই। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে ভিন্ন কথা। বিশেষ করে গর্ভবতী নারী ও গর্ভস্থ শিশুর ক্ষেত্রে রুবেলা এমন এক নীরব বিপদ, যা একটি শিশুর পুরো জীবনকে বদলে দিতে পারে জন্মের আগেই। ডব্লিউএইচও রুবেলাকে জন্মগত ত্রুটির অন্যতম প্রধান প্রতিরোধযোগ্য কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে। অথচ এ রোগ নিয়ে এখনো সমাজে নানা ভুল ধারণা প্রচলিত রয়েছে।

রুবেলা শুধু শিশুদের রোগ

এটি সবচেয়ে প্রচলিত ভুল ধারণাগুলোর একটি। বাস্তবে শিশুদের পাশাপাশি প্রাপ্তবয়স্করাও রুবেলায় আক্রান্ত হতে পারেন। বিশেষ করে যারা কখনো টিকা নেননি বা আগে রুবেলায় আক্রান্ত হননি, তাদের ঝুঁকি বেশি। অনেক ক্ষেত্রে প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে উপসর্গ আরো জটিলভাবে দেখা দিতে পারে। নারীদের মধ্যে জয়েন্টে ব্যথা বা সাময়িক আর্থ্রাইটিসও দেখা যেতে পারে।

রুবেলা আর হাম একই রোগ

অনেকেই রুবেলাকে ‘জার্মান মিজেলস’ নাম শুনে হামেরই আরেকটি ধরন মনে করেন। কিন্তু হাম ও রুবেলা সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি ভাইরাসজনিত রোগ। উপসর্গের কিছু মিল থাকলেও তাদের কারণ, জটিলতা ও রোগের ধরন আলাদা। চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এ দুই রোগকে এক করে দেখার কোনো সুযোগ নেই।

রুবেলা খুব সাধারণ রোগ, এতে ভয় পাওয়ার কিছু নেই

সাধারণ অবস্থায় রুবেলা তুলনামূলকভাবে মৃদু রোগ হতে পারে। কিন্তু একজন গর্ভবতী নারী আক্রান্ত হলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে গর্ভাবস্থার প্রথম দিকে সংক্রমণ ঘটলে গর্ভস্থ শিশুর মারাত্মক ক্ষতি হওয়ার ঝুঁকি থাকে। WHO-এর তথ্য অনুযায়ী, গর্ভধারণের শুরুর দিকে আক্রান্ত হলে মায়ের শরীর থেকে ভাইরাস ভ্রূণের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত বেশি।

শরীরে র‍্যাশ না হলে রুবেলা হয়নি

রুবেলার অন্যতম পরিচিত লক্ষণ হলো লালচে র‍্যাশ। কিন্তু সব রোগীর ক্ষেত্রে এ উপসর্গ দেখা যায় না। সিডিসির তথ্য অনুযায়ী, উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আক্রান্ত ব্যক্তির কোনো স্পষ্ট উপসর্গ নাও থাকতে পারে। কেউ কেউ এতটাই হালকা উপসর্গে আক্রান্ত হন যে বুঝতেই পারেন না তারা সংক্রমিত হয়েছেন।

রুবেলা এখন আর পৃথিবীতে নেই

অনেকের ধারণা টিকাদান কর্মসূচির কারণে রুবেলা পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। বাস্তবতা হলো, বিশ্বের বহু দেশে এখনো রুবেলা বিদ্যমান। WHO-এর তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোয়ও বিভিন্ন দেশে হাজার হাজার রুবেলা সংক্রমণের ঘটনা ঘটেছে।

এক ডোজই যথেষ্ট!

বিজ্ঞান বলছে উল্টো কথা। রুবেলা প্রতিরোধী টিকা অত্যন্ত কার্যকর। তবে টিকার একটি ডোজই যথেস্ট নয়। পুরোপুরি সুরক্ষিত থাকতে টিকার দুটি ডোজই গ্রহণ করতে হবে।

টিকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া রোগের চেয়ে বেশি বিপজ্জনক

টিকা নিয়ে ভয় বা সংশয় নতুন কিছু নয়। কিন্তু বাস্তবে রুবেলা টিকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সাধারণত খুবই মৃদু। হালকা জ্বর, সাময়িক র‍্যাশ, ইনজেকশনের স্থানে ব্যথা বা পেশিতে অস্বস্তির মতো কিছু উপসর্গ কয়েক দিনের মধ্যে সেরে যায়।

গর্ভবতী নারীর রুবেলা হলে শুধু মায়ের সমস্যা হয়

রুবেলার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বিপদটি হয় গর্ভস্থ শিশুর জন্য। গর্ভাবস্থায় আক্রান্ত মা ভাইরাসটি অনাগত সন্তানের শরীরে ছড়িয়ে দিতে পারেন। ফলে জন্মগত রুবেলা সিনড্রোম সিআরএস নামের গুরুতর অবস্থা তৈরি হতে পারে।

রুবেলা টিকা বন্ধ্যাত্ব সৃষ্টি করে

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়া সবচেয়ে ক্ষতিকর গুজবগুলোর একটি এটি। কিন্তু রুবেলা বা এমএমআর টিকার সঙ্গে বন্ধ্যাত্বের কোনো বৈজ্ঞানিক সম্পর্ক কখনো প্রমাণ হয়নি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কয়েক দশক ধরে কোটি কোটি মানুষ এ টিকা নিয়েছেন। আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থাগুলো টিকাটিকে নিরাপদ ও কার্যকর হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।

আমার আশপাশে তো রুবেলা নেই, টিকারও দরকার নেই

সংক্রামক রোগের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো সেগুলো সুযোগ পেলেই ফিরে আসতে পারে। কোনো এলাকায় দীর্ঘদিন রোগ না থাকলেও যদি টিকাদানের হার কমে যায়, তাহলে সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। আন্তর্জাতিক ভ্রমণ, অভিবাসন কিংবা স্থানীয় টিকাদানে ঘাটতি সবই নতুন প্রাদুর্ভাবের ঝুঁকি তৈরি করে।

রুবেলা নিয়ে অবহেলা শুধু একজন মানুষকেই নয়, একটি অনাগত শিশুর পুরো জীবনকেও ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে।

আরও