'কলুর বলদ' প্রবাদটির সঙ্গে কম-বেশি আমরা সবাই পরিচিত। আবার 'সংসারের ঘানি টানা'র উপমাও শুনেছি অনেকেই। এ দুটি পরিচিত কথার সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলার বিলুপ্তপ্রায় এক পেশাজীবী সম্প্রদায়, কলু। তেলবীজ থেকে ভোজ্য তেল উৎপাদনে নিয়োজিত পেশাজীবী সম্প্রদায়কে এ নামে ডাকা হয়।
বাংলার গ্রামীণ জনপদে এক সময় ভোর হতো ছন্দময় এক শব্দে। কাঠের ঘানির ক্যাঁচক্যাঁচানি আর বলদের ধীরস্থির পদচারণায় তৈরি হতো খাঁটি সরিষার তেল। এ শিল্পের কারিগরদের আমরা চিনতাম ‘কলু’ বলে। আজ ফিরে দেখা যাক সেই ঐতিহ্যের ইতিবৃত্ত, যা সময়ের চাকায় পিষ্ট হয়ে আজ বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে।
কলু পেশার আদি ইতিহাস
মধ্যযুগের মঙ্গলকাব্য থেকে শুরু করে ব্রিটিশ আমলের নথিপত্রেও এ পেশাজীবীদের সরব উপস্থিতি পাওয়া যায়। পুন্ড্রবর্ধনে এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ হয়েছিল প্রায় দু হাজার তিনশ বছর আগে। সেই দুর্ভিক্ষ মোকাবেলার জন্য মৌর্য সম্রাটস্থানীয় শাসনকর্তাকে নির্দেশ দিয়েছিলেন রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে ধান, তিল ও সরিষা পুন্ড্রনগরের জনসাধারণকে সরবরাহ করতে। তেলের ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায় সেখান থেকেই। কলু কেবল তেল উৎপাদনকারীই ছিলেন না, ছিলেন গ্রামীণ অর্থনীতির একটি শক্তিশালী স্তম্ভ।
কলু ও তেলি: পরিচয় ও সংজ্ঞা
‘কলু’ শব্দটি মূলত দেশজ, যার হিন্দি প্রতিশব্দ ‘কোলহু’। বাংলাদেশের নাটোর এবং পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম বা নদীয়া অঞ্চলে তাদের অনেক সময় ‘খলু’ নামেও ডাকা হতো। আভিধানিক অর্থে কলু বলতে তেল উৎপাদনকারী ও বিক্রেতা এক বিশেষ সম্প্রদায়কে বোঝায়। যদিও সামাজিকভাবে ‘কলু’ এবং ‘তেলি’ শব্দ দুটি সমার্থক হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তবে তাত্ত্বিকভাবে কলুরা তেল উৎপাদন (পেষণ) করে এবং তেলিরা তা বাজারে বিক্রি করে। তবে অনেক ক্ষেত্রে এ বিভাজন ঘুচে গেছে। কেননা, যারা উৎপাদন করেন, তারাই বিক্রির দায়িত্ব পালন করেন।
তেল নিষ্কাশনের চিরায়ত প্রযুক্তি: ঘানি
কলুরা সাধারণত সরিষা, তিল, তিসি, সয়াবিন, সূর্যমুখী, শুকনো নারিকেল ও তুলাবীজ থেকে তেল নিষ্কাশন করে। এ প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত প্রধান যন্ত্রটির নাম ‘ঘানি’। ভারত ও বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন ভিন্ন ধরনের ঘানি দেখা যায়। যেমন-
দুই বলদে টানা ঘানি: এটি মূলত বড় আকারের হয় এবং ঘরের বাইরে স্থাপন করা হয়। এতে কোনো নালিপথ থাকে না; তেল শুষে নেয়ার জন্য বিশেষ পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়।
এক বলদে টানা ঘানি: এটি আকারে ছোট এবং ঘরের ভেতরে স্থাপনযোগ্য। এতে নালিপথ থাকে, যা দিয়ে তেল সরাসরি পাত্রে (গাড়ু) জমা হয়। এই ঘানি চালানোর সময় গরুর চোখে ঠুলি ব্যবহার করা হয়।
চোখ বাঁধা বলদ মুষলটিকে কেন্দ্র করে চারদিকে ঘুরত। বলদের চোখ বেঁধে দেয়া হতো যাতে তারা ঘুরতে ঘুরতে মাথা ঘুরে পড়ে না যায়। তবে ব্যতিক্রমও আছে যেখানে গরুর চোখ বাঁধা হয়না।
মানুষের টানা ঘানি: ময়মনসিংহসহ কিছু অঞ্চলে এমন কলুও দেখা যায়, যারা পশুর বদলে নিজেরাই ঘানি টেনে তেল উৎপাদন করেন।
কৃষকরা সরিষা দিয়ে যেত, বিনিময়ে কলুরা তেল দেয়ার পর উদ্বৃত্ত ‘খৈল’ ও তেলের একটি অংশ পারিশ্রমিক হিসেবে পেত। এ খৈল নানান কাজে ব্যবহার করা হতো।
ঘানির গঠন ও যন্ত্রাংশ
কাঠের ঘানি তৈরিতে সাধারণত তেঁতুল, বাবলা বা শালের মতো শক্ত কাঠ ব্যবহার করা হয়। এর উল্লেখযোগ্য অংশগুলো হলো ঘনা, যা এর মূল যন্ত্র। জাট, লাঠি বা পেষণ দণ্ড। ডোঙ্গা, ঘানির উপরের অংশ যেখানে বীজ ঢালা হয়। চালকের বসার তক্তাকে বলা হয় কাতারি। আর যে পথ দিয়ে তেল বেরিয়ে আসে তা হলো নলি।
সামাজিক অবস্থান ও জীবনধারা
কলুদের সামাজিক জীবন কিছুটা বিচ্ছিন্ন। তারা সাধারণত গ্রামের এক প্রান্তে দলবদ্ধভাবে বসবাস করে। বাংলাদেশে কলু সম্প্রদায়ের অধিকাংশই মুসলিম, তবে কিছু হিন্দু পরিবারও এ পেশায় যুক্ত।
মুসলিম কলুরা সমাজের মূলধারার সাথে ধর্মীয় আচার পালন করলেও সাধারণ মুসলিমরা অনেক সময় তাদের ‘নিম্নবর্গীয়’ হিসেবে দেখে থাকে। তাদের বৈবাহিক সম্পর্ক সাধারণত নিজ সম্প্রদায়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে।
বর্ণপ্রথার প্রভাবে হিন্দু কলুদের নিম্নবর্ণের হিসেবে গণ্য করা হয় এবং উচ্চবর্ণের হিন্দুদের সঙ্গে তাদের সামাজিক ও বৈবাহিক সম্পর্ক সীমিত। এ সম্প্রদায়ের প্রধানকে বলা হয় ‘পরামানিক’।
অস্তিত্বের সংকটে আদি পেশা
আধুনিক যান্ত্রিক সভ্যতার দাপটে কলুদের এই ঐতিহ্যবাহী পেশা আজ বিলুপ্তির পথে। উৎপাদন ক্ষমতার পার্থক্য বিলুপ্তির অন্যতম কারণ। একটি পশুচালিত ঘানিতে সারাদিনে মাত্র ২০ কেজি সরিষা পেষা যায়, যেখানে যান্ত্রিক মিলে ১০০ কেজির বেশি উৎপাদন সম্ভব। অন্যদিকে যান্ত্রিক ঘানিতে তেলের অপচয় কম হয় এবং খরচ কম পড়ে। ফলে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরা যান্ত্রিক তেলের দিকেই ঝুঁকেছে। কাঁচামালের অভাব, প্রতিযোগিতাও এর পেছনে দায়ী। সরিষার দাম বৃদ্ধি এবং বাজারে সয়াবিন ও পাম তেলের সহজলভ্যতা কাঠের ঘানির তেলকে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে দিয়েছে। দেশের সর্বত্র বিদ্যুৎ ও আধুনিক মেশিনের প্রসারের ফলে কয়েক হাজার বছরের পুরনো এই কাঠের ঘানি এখন কেবল জাদুঘর বা প্রত্যন্ত অঞ্চলের স্মৃতি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পৈতৃক পেশা হারিয়ে অনেক কলু এখন অন্য পেশায় আত্মনিয়োগ করতে বাধ্য হচ্ছেন। ফলে বাংলার লোকসংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ ‘ঘানি’ এবং ‘কলু’ সম্প্রদায় ধীরে ধীরে ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নিচ্ছে।