‘হ্যালো’র ২০০ বছর: একটি শব্দের উৎপত্তি, বিশ্বজয় ও বিবর্তনের গল্প

‘হ্যালো’ শুধু একটি শব্দ নয়, এটি বলার ধরণ আপনার মনের অবস্থাও বুঝিয়ে দেয়। যদি কেউ শেষ বর্ণটি টেনে বলে ‘হ্যালোওওও?’, তার মানে সে প্রশ্ন করছে আপনি ঠিকমতো শুনছেন কি না। আবার ডিজিটাল যুগে চ্যাটিংয়ের সময় ‘হেই’ বলাটা অনেক সময় বন্ধুত্বের চেয়ে একটু বেশি কিছু বা ফ্লার্ট করার ইঙ্গিত দেয়

‘হ্যালো’—প্রতিদিন অজস্রবার শব্দটি আমরা ব্যবহার করি। ফোনে কথা বলা শুরু করতে, ই-মেইলের শুরুতে কিংবা কারও সঙ্গে দেখা হলে প্রথম সম্বোধন হিসেবে এ শব্দটিই আমাদের মুখে সবার আগে আসে। অতি পরিচিত শব্দটি কাগজে-কলমে ছাপার অক্ষরে প্রথম আসার বয়স ২০০ বছর পেরিয়েছে।

মুদ্রিত লেখায় বহুল ব্যবহৃত ও বন্ধুসুলভ সম্ভাষণটির ইতিহাস আশ্চর্যজনকভাবে খুব বেশি পুরনো নয়। আজ থেকে ঠিক দুই শতাব্দী আগে, ১৮২৬ সালের ১৮ জানুয়ারি, যুক্তরাষ্ট্রের কানেকটিকাট অঙ্গরাজ্যের একটি পত্রিকা দ্য নরউইচ কুরিয়ার-এ ‘হ্যালো’ শব্দটি প্রথমবারের মতো ছাপার অক্ষরে দেখা যায়। সেদিন পত্রিকার কলামের ভেতরে লুকানো ছিল এমন এক শব্দের নীরব সূচনা, যা পরে আধুনিক বিশ্বের বিশাল অংশের দৈনন্দিন সম্ভাষণে পরিণত হয়।

১৮৫০-এর দশকে শব্দটি আটলান্টিক পেরিয়ে ব্রিটেনে পৌঁছে লন্ডন লিটারারি গেজেট-এর মতো প্রকাশনায় ব্যবহৃত হতে থাকে। ধীরে ধীরে মুদ্রিত লেখায় এর ব্যবহার বাড়তে থাকে। অন্য ভাষার প্রচলিত সম্ভাষণের মতোই, ‘হ্যালো’ শব্দটিও ইংরেজিভাষী বিশ্বের একটি সাংস্কৃতিক পরিচয় বহন করে। তবে মুখে মুখে হ্যালোর আদি রূপগুলো ৬০০ বছর আগে থেকেই প্রচলিত।

হ্যালো, হিলো নাকি হোলা?

‘হ্যালো’ শব্দের জন্ম ইতিহাস নিয়ে ভাষাবিদদের মধ্যে মতভেদ আছে। ওল্ড হাই জার্মান শব্দ ‘হালা’ থেকে এর উৎপত্তি বলে অনেকে মনে করেন, যা মূলত ফেরিওয়ালা বা মাঝিদের ডাকার জন্য ব্যবহৃত হতো। আবার ১৫শ শতাব্দীর ফরাসি শব্দ ‘হোলা’ থেকেও এর যোগসূত্র পাওয়া যায়, যার অর্থ ছিল ‘থামো!’ বা ‘শোনো!’

আশ্চর্যের বিষয় হলো, এক সময় ‘হ্যালো’-এর অন্তত ডজনখানেক বানান প্রচলিত ছিল। বিখ্যাত লেখক চার্লস ডিকেন্স তার লেখায় সবসময় ‘হুল্লো’ ব্যবহার করতেন। আবার টেলিফোনের আবিষ্কারক আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেল চেয়েছিলেন ফোনে কথা বলার শুরুতে মানুষ ‘অহয়!’ বলুক। কিন্তু তার প্রতিদ্বন্দ্বী টমাস এডিসন ‘হ্যালো’ ব্যবহারের পক্ষে জোরালো সমর্থন দেন, কারণ টেলিফোনের যান্ত্রিক গোলযোগের মধ্যেও এই শব্দটি স্পষ্ট শোনা যেত। শেষ পর্যন্ত এডিসনের জয় হয় এবং ‘হ্যালো’ হয়ে ওঠে বিশ্বজনীন।

একটি শব্দ, হাজারো অভিব্যক্তি

ভাষাবিজ্ঞানী আলেসান্দ্রো দুরান্তি বলেন, ‘হ্যালো’ শুধু একটি শব্দ নয়, এটি বলার ধরন আপনার মনের অবস্থাও বুঝিয়ে দেয়। যদি কেউ শেষ বর্ণটি টেনে বলে ‘হ্যালোওওও?’, তার মানে সে প্রশ্ন করছে আপনি ঠিকমতো শুনছেন কি না। আবার ডিজিটাল যুগে চ্যাটিংয়ের সময় ‘হেই’ বলাটা অনেক সময় বন্ধুত্বের চেয়ে একটু বেশি কিছু বা ফ্লার্ট করার ইঙ্গিত দেয়। সংক্ষেপে ‘হাই’ বলাটা অনেক সময় পেশাদার বা কিছুটা গাম্ভীর্যপূর্ণ মেজাজ প্রকাশ করে।

ডিজিটাল যুগের ‘হ্যালো’

প্রযুক্তির ছোঁয়ায় আমাদের সম্ভাষণ জানানোর রীতি দ্রুত বদলে যাচ্ছে। এখন হোয়াটসঅ্যাপ বা মেসেঞ্জারে আমরা সবসময় ‘অনলাইন’ থাকি, তাই প্রতিবার কথা শুরুর আগে ‘হ্যালো’ বলার প্রয়োজন পড়ে না। দীর্ঘ শব্দের বদলে মানুষ এখন ছোট ‘হাই’ বা স্রেফ একটি হাত নাড়ানোর ইমোজি ব্যবহার করছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর যুগে হয়তো অদূর ভবিষ্যতে নতুন কোনো শব্দ ‘হ্যালো’র জায়গা করে নেবে।

বিবিসি অবলম্বনে

আরও