এরোস থেকে কিউপিড: কামনার দেবতার বিবর্তন

আসছে ১৪ই ফেব্রুয়ারি। চারদিকে লাল-গোলাপী আভা, চকোলেট আর হৃদপিণ্ড আকৃতির সব উপহারের মাঝে একটি বিশেষ অবয়ব আমাদের সবার চোখে পড়ে, পিঠে ডানা আর হাতে তীর-ধনুক নিয়ে উড়ে বেড়ানো এক আদুরে দেবশিশু। যাকে আমরা চিনি ‘কিউপিড’ নামে। কিন্তু আপনি কি জানেন, আজকের এই নিষ্পাপ শিশুটি একসময় ছিল গ্রিক পুরাণের সবচেয়ে শক্তিশালী এবং ভয়ংকর এক যুবক?

আদি রূপ: এক অজেয় যুবক

খ্রিস্টপূর্ব ৭০০ অব্দে গ্রিক সাহিত্যে কিউপিডের আদি নাম ছিল ‘এরোস’। গ্রিক শব্দ ‘এরোস’ মানেই হলো তীব্র কামনা। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রিচার্ড মার্টিন টাইমস ম্যাগাজিনে দেয়া এক বক্তব্যে বলেছিলেন, সেই সময়ে কিউপিড মোটেও কোনো দেবশিশু ছিলেন না, বরং ছিলেন এক সুদর্শন এবং অজেয় যুবক। প্রেমের দেবী আফ্রোদিতির এই পুত্র তার জাদুকরী তীরের আঘাতে দেবতা থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ—যাকে খুশি তাকে প্রেমে উন্মাদ করে দিতে পারত। তখনকার নাট্যকারদের লেখায় তাকে চিত্রিত করা হতো এক বিভীষিকা হিসেবে, কারণ তিনি কাউকে প্রেমে ফেললে তা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ট্র্যাজেডি বা বিপর্যয়ে রূপ নিত।

রূপান্তর: ভয়ংকর থেকে আদুরে শিশু

তাহলে সেই পেশিবহুল যুবক কীভাবে আজকের ছোট্ট শিশুতে পরিণত হলো? ইতিহাস বলছে, খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীর দিকে গ্রিক সমাজে নারীর সামাজিক অবস্থান পরিবর্তিত হতে শুরু করে। এরোসের অবারিত শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করার এক উপায় হিসেবে সাহিত্যে তাকে তার মা আফ্রোদিতির বাধ্য সন্তান হিসেবে দেখানো শুরু হয়। অর্থাৎ, সে আর নিজের খেয়ালখুশি মতো বিপর্যয় ঘটাবে না, বরং মায়ের আদেশে কাজ করবে। দেবতাকে ‘শিশুকরণ’ করার মাধ্যমে তার ভয়ংকর রূপটি মুছে ফেলে এক ধরনের সামাজিক স্বস্তি খোঁজা হয়েছিল। পরবর্তীতে রোমানরা যখন গ্রিক পুরাণ গ্রহণ করে, তারা এই ‘শিশু’ রূপটিকেই বেছে নেয় এবং নাম দেয় ‘কিউপিড’।

রেনেসাঁ ও আধুনিক বাণিজ্যিক বিপ্লব

মধ্যযুগের পর রেনেসাঁ পিরিয়ডে কারাভাজ্জিওর মতো বিখ্যাত চিত্রশিল্পীরা কিউপিডকে ডানাওয়ালা শিশু হিসেবে আঁকতে শুরু করেন, যা তাকে বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় করে তোলে। এরপর উনিশ শতকে যখন গ্রিটিংস কার্ড বা পোস্টকার্ডের প্রচলন শুরু হয়, তখন সেই শৈল্পিক কাজগুলোকেই কার্ডের প্রচ্ছদ হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করে কোম্পানিগুলো।

১৯১৬ সালে যখন বিখ্যাত কার্ড নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘হলমার্ক’ বাণিজ্যিকভাবে ভালোবাসা দিবসের কার্ড তৈরি শুরু করে, তখন তারা কিউপিডকে মানুষের হৃদয়ের কথা প্রকাশের এক ‘দূত’ হিসেবে উপস্থাপন করে। ধীরে ধীরে সেই তীর-ধনুক হাতে শিশুটি হয়ে ওঠে ভ্যালেন্টাইনস ডের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

কেন আজও কিউপিড প্রাসঙ্গিক?

আজকের দিনে কিউপিড আর কোনো ভয়ংকর শক্তির নাম নয়। হলমার্কের ইতিহাসবিদ সামান্থা ব্র্যাডবিয়ারের মতে, আধুনিক যুগে কিউপিড হলো সেই ‘ধাক্কা’ যা আমাদের প্রিয় মানুষের কাছে মনের কথা বলতে সাহস জোগায়। যখন কোনো কার্ডের পেছনে কিউপিডের ছবি থাকে, তখন মনে হয় যেন কেউ আমাদের উৎসাহ দিচ্ছে নিজের ভালোবাসা বা বন্ধুত্বের অনুভূতিগুলো অকপটে প্রকাশ করতে।

তাই এবার ভালোবাসা দিবসে যখন কার্ডে বা শোপিসে সেই ছোট্ট শিশুটিকে দেখবেন, মনে রাখবেন—এটি কেবল একটি ছবি নয়, বরং হাজার বছরের ইতিহাস আর কামনার এক বিবর্তিত শক্তির প্রতীক!

আরও