গত কয়েকদিনে ঢাকাসহ দেশের নানা এলাকায় মাটি কেঁপে উঠেছে একাধিকবার। হঠাৎ এ কম্পন মানুষের মনে তৈরি করেছে এক অদৃশ্য আতঙ্ক—যেন অজানা কোনো দানব ঘাপটি মেরে বসে আছে। ভূমিকম্প থেমে যাওয়ার পরেও অনেকের মনে হচ্ছে দুলুনি পুরোপুরি থামেনি, কিংবা বিছানা যেন নড়ছে বা ঘরটা আবার টলমল করছে। এ অদ্ভুত অনুভূতির একটি নাম আছে, একে বলা হয় 'ফ্যান্টম আর্থকোয়েক সেনসেশন'। এটি মূলত দেহের ভারসাম্যব্যবস্থা ও মনের আতঙ্ক–স্মৃতির মিলনে তৈরি হওয়া একটি মনস্তাত্ত্বিক ও স্নায়ুবৈজ্ঞানিক প্রতিক্রিয়া।
কেন এটি হয়?
আমাদের মস্তিষ্ক আর ভেস্টিবুলার সিস্টেম, যা কানের ভেতরে ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণ করে, এ দুটো মিলে আমাদের সংকেত দেয় আমরা স্থির নাকি নড়াচড়া করছি। ভূমিকম্পের সময় এ দুই অংশ একসঙ্গে জরুরি সতর্কতায় চলে যায়। কানের ভেতরের সংকেত বেড়ে যায়, পেশি শক্ত হয়ে থাকে, চোখ–কান–ত্বক প্রতিটি ইন্দ্রিয় নড়াচড়া বোঝার চেষ্টা করে। এ অতিরিক্ত সচেতনতা সেই মুহূর্তে জরুরি, এটি আমাদের বাঁচতে সাহায্য করে।
কিন্তু কম্পন থেমে যাওয়ার পরও স্নায়ুতন্ত্রের সেই ‘হাই অ্যালার্ট’ অবস্থা সহজে কমে না। তখন খুব ক্ষুদ্র অনুভূতিও যেমন হৃদস্পন্দন, উঁচু ভবনের স্বাভাবিক দোল, এমনকি শ্বাসের সামান্য ওঠানামা মস্তিষ্ক ভুল করে আবার ভূমিকম্পের সংকেত হিসেবে ধরে। তার সঙ্গে যোগ হয় স্মৃতি আর ভয়: মস্তিষ্ক প্রশ্ন তোলে,'আরেকটা কম্পন কি আসছে?' এ শারীরিক অতিসংবেদনশীলতা আর মানসিক আশঙ্কার মিলেই তৈরি হয় এই ফ্যান্টম আর্থকোয়েক সেনসেশন।
কতদিন থাকে?
বেশিরভাগ মানুষের ক্ষেত্রে এ অনুভূতি কয়েক ঘণ্টা থেকে কয়েক দিনের মধ্যেই কমে যায়। সময়ের সঙ্গে মস্তিষ্ক ধীরে ধীরে বুঝে ফেলে 'এখন আর মাটি কাঁপছে না'।
কিন্তু যারা ভয়াবহ কম্পন টের পেয়েছেন, বারবার আফটারশক দেখেছেন, অথবা চরম আতঙ্কের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছেন, তাদের ক্ষেত্রে এটি কয়েক সপ্তাহ স্থায়ী হতে পারে। খুব অল্পসংখ্যক মানুষের ক্ষেত্রে এ অনুভূতি কয়েক মাসও টিকে থেকে ঘুম, কাজ, মনোযোগ বা দৈনন্দিন কার্যক্রমকে ব্যাহত করতে পারে।
যখন দুলুনির অনুভূতির সঙ্গে তীব্র দুশ্চিন্তা, আতঙ্ক, মনোসংযোগে সমস্যা বা ঘুমের ব্যাঘাত যোগ হয়, তখন বুঝতে হবে মানসিক দিকটি—যেমন আকস্মিক মানসিক চাপ বা পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস আপনার দৈন্দিন জীবনকে ব্যাপক প্রভাবিত করছে কি না। এ পর্যায়ে বিশেষজ্ঞের সাহায্য প্রয়োজন।
কী করলে উপশম হতে পারে?
বাড়িতে বসেই সাধারণ কিছু পদ্ধতি অনুসরণ করা যায়, যেগুলো দেহ–মনের ভারসাম্য ফেরাতে সাহায্য করে—
- হালকা শরীরচর্চা অর্থাৎ হাঁটা, স্ট্রেচিং, ধীর গতির যোগব্যায়াম শরীরকে স্বাভাবিক নড়াচড়ার অনুভূতি ফিরিয়ে দেয় এবং মস্তিষ্ককে নতুন করে ভারসাম্য শেখায়।
• স্থির কোনো জিনিসে চোখ রাখা- গাছ, দরজার ফ্রেম বা দেয়ালের একটি বিন্দুর দিকে ৩০–৬০ সেকেন্ড তাকিয়ে থাকা মস্তিষ্কের ভুল 'নড়াচড়ার সংকেত' থামাতে সাহায্য করে।
• ক্যাফেইন কমানো- এগুলো মাথা হালকা লাগা ও দুশ্চিন্তা বাড়াতে পারে; কমালে দ্রুত উপশম পাওয়া যায়।
• পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও ঘুম- স্নায়ুতন্ত্রকে স্বাভাবিক করতে ঘুম খুব প্রয়োজনীয়। নিয়মিত ঘুমের অভ্যাস উপকার দেয়।
• ধীর শ্বাস–প্রশ্বাস ও গ্রাউন্ডিং- ৪ সেকেন্ডে শ্বাস নেওয়া ও ৬ সেকেন্ডে ছাড়ার মতো কৌশল, পায়ের তলার মাটি অনুভব করা, বা আশপাশের জিনিসকে জোরে বলে বর্ণনা করা (চেয়ারটা এখানে, জানালাটা বাঁ পাশে)
• বারবার খোঁজ নেওয়া কমানো- প্রতি মিনিটে খবর দেখা বা কম্পন টের পাওয়ার চেষ্টা করা মস্তিষ্ককে সতর্ক অবস্থায় আটকে রাখে। নির্দিষ্ট সময় ঠিক করে খবর দেখাই ভালো।
• মানুষের সঙ্গে কথা বলা- অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিলে আতঙ্ক কমে।
যদি ভূমিকম্পের পরও মনে হয় পৃথিবী নড়ছে, জেনে রাখুন, আপনার দেহ ঠিক তার কাজটাই করছে, শুধু একটু বেশি সংবেদনশীল হয়ে গেছে। বিশ্রাম, হালকা নড়াচড়া, সঠিক শ্বাস–প্রশ্বাস, পরিবারের সঙ্গ, আর প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞের সাহায্যে অধিকাংশ মানুষই দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠেন। আর যদি এ অনুভূতি আপনাকে দৈনন্দিন জীবন থেকে দূরে সরাতে থাকে, সাহায্য চাইতে দ্বিধা করবেন না,এটাই স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার সবচেয়ে সাহসী ও বাস্তবিক পদক্ষেপ।