প্রফেসর ভেলানদাই শ্রীকান্ত যখন ৬০ বছরে পা দিলেন, তখন তার ক্যারিয়ার মধ্যগগনে। তিনি একটি জাতীয় সুস্থ বার্ধক্য কেন্দ্রের পরিচালক। তার লেখা গবেষণাপত্র বিশ্বের নামকরা বিজ্ঞান সাময়িকীগুলোতে প্রকাশিত হয়।
কিন্তু জন্মদিন পেরোতেই কেউ একজন প্রফেসরকে জিজ্ঞেস করে বসলেন, ‘তো! এবার অবসরে যাচ্ছেন কবে?’ আর এই একটি প্রশ্নই তাকে স্তব্ধ করে দেয়।
প্রফেসর বুঝতে পারেন, বয়স বেড়ে যাওয়া মানেই সমাজ আপনাকে ‘কর্মে অক্ষম’ হিসেবে ধরে নিতে শুরু করে। সমাজ যেন তাকে মনে করিয়ে দিল, বয়স বেড়ে যাওয়া মানেই জীবনের শেষ।
তবে সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে অন্য কথা। বয়স বাড়া মানেই জীবন ফুরিয়ে যাওয়া নয়, বরং ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি মানুষের জীবনকে আরো প্রাণবন্ত করে তুলতে পারে।
ইয়েল স্কুল অব পাবলিক হেলথ এর প্রফেসর বেকা লেভি ও ড. মার্টিন স্লেড ৫০ থেকে ৯৯ বছর বয়সী ১১ হাজার মানুষের ওপর দীর্ঘ ১২ বছর ধরে একটি গবেষণা চালিয়েছেন। ফলাফল ছিল চমকপ্রদ। গবেষণাটিতে দেখা গেছে, বার্ধক্য নিয়ে যাদের দৃষ্টিভঙ্গি ইতিবাচক, তারা স্মৃতিশক্তি বা অংকের পরীক্ষায় তো ভালো করেছেনই, এমনকি তাদের হাঁটার গতিও অন্যদের চেয়ে বেশি ছিল। আর সবচেয়ে আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, ইতিবাচক চিন্তার অধিকারী ৪৪ শতাংশ অংশগ্রহণকারীর শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতা ১২ বছর আগের তুলনায় আরো উন্নত হয়েছে।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ড. জুলিয়া ল্যাপিন বলছেন, মনের জোর কেবল মানসিক প্রশান্তি দেয় না। এটি সরাসরি শরীরেও প্রভাব ফেলে। মানুষ যখন ইতিবাচক থাকে, তখন তারা সামাজিকভাবে সক্রিয় থাকে আর শরীরচর্চার প্রতি মনোযোগী হন।
অ্যাকটিভ হবার জন্য চারপাশের মানুষের উৎসাহ অনেক বেশি ইতিবাচক প্রভাব ফেলে
উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ৯৩ বছর বয়সী কোনো প্রতিবেশী যদি প্রতিদিন সমুদ্র সৈকতে হাঁটতে যান, তবে সেই দৃশ্য দেখে ৯২ বছর বয়সী অন্য একজনের মধ্যেও উদ্যম তৈরি হয়। একে বলা হয় ‘কিপিং আপ উইথ দ্য জোন্স’ বা একে অন্যকে দেখে অনুপ্রাণিত হওয়ার এক ইতিবাচক প্রতিযোগিতা।
বার্ধক্য মানেই কি অসুস্থতা? প্রফেসর শ্রীকান্ত বলছেন, বার্ধক্য মানেই রোগ নয়, এটি স্রেফ একটি সময় মাত্র। মানুষ ধরে নেয়, বয়স বাড়লেই ডিমেনশিয়া বা স্মৃতিভ্রম হবে, যা মোটেও সত্য নয়। আবার শরীরের কোথাও ব্যথা হলে অনেকেই ‘বয়স হয়েছে তাই ব্যথা’ বলে মেনে নেন। কিন্তু ইতিবাচক মানুষরা তা না করে ফিজিওথেরাপিস্টের শরণাপন্ন হন কিংবা ব্যায়াম শুরু করেন। আর এ ধরণের বাস্তবমুখী আচরণই তাদের অন্যদের চেয়ে আলাদা রাখে।
অন্যদিকে, সমাজের বয়স বৈষম্য দূর করা এখন সময়ের দাবি। বিভিন্ন বড় বড় কোম্পানির নিয়োগকর্তারা মনে করেন, বয়স বাড়লে কর্মক্ষমতা কমে যায়। ফলে তারা অভিজ্ঞ প্রার্থীদের বঞ্চিত করেন। অথচ এ প্রবীণরাই অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ। তাই তাদের মধ্যেই বেশি উন্নতির সক্ষমতা থাকে।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ প্রফেসর ব্রায়ান ড্রেপার জানিয়েছেন, ৬৫ থেকে ৮৫ বছর বয়সীদের মধ্যে বিষণ্নতার হার কম থাকে। মানুষ যখন অবসরে যায়, তখন জীবনের অনেক ক্ষেত্রে তাদের পরিস্থিতির উন্নতি ঘটে। তাই বাড়ন্ত বয়স ভয় না পেয়ে ইতিবাচক মন নিয়ে একে উদযাপন করাই সুস্থ থাকার আসল চাবিকাঠি।
তবে প্রশ্ন তো থেকেই যায়, বার্ধক্য নিয়ে ইতিবাচক থাকা কি কঠিন? গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষ যখন বার্ধক্য নিয়ে কোনো ইতিবাচক শব্দ বা ভাবনা দিয়ে দিন শুরু করে, তখন তার আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায়। জীবনটা আসলে কত সুন্দর কাটবে তা নির্ভর করে নিজের ব্যবহার করা চশমার লেন্সের ওপর। যদি চশমার লেন্সটি ইতিবাচকতার রঙে রাঙানো হয়, তবে শরীরের ক্ষয় ছাপিয়ে মনকে রাখবে সতেজ।
তাই জীবনকে উপভোগ করার জন্য ইতিবাচক মানসিকতার কোনো বিকল্প আছে কি!
—দ্য গার্ডিয়ান থেকে তথ্য নিয়ে পরিমার্জিত