ভূমিকম্প ও সাপের আচরণ: বৈজ্ঞানিক যোগসূত্র কতটা?

২০০৮ সালে চীনের সিচুয়ান ভূমিকম্পের আগে বহু সাপ শীতনিদ্রা ভেঙে মাটির ওপরে উঠে এসেছিল।

কিছু প্রাণী ভূমিকম্পের ১ থেকে ২০ ঘণ্টা আগেও অস্বাভাবিকভাবে অস্থির হয়ে ওঠে। গবেষকেরা এ আচরণকে বলেছেন দলবদ্ধ প্রতিক্রিয়া বা সোয়র্ম ইন্টেলিজেন্স। তবে তারাও জানিয়েছেন, এ ডেটা ভূমিকম্পের পূর্বাভাসের জন্য এখনো যথেষ্ট নয়।

সম্প্রতি ঢাকায় বহুতল ভবনে সাপের উপস্থিতি দেখা গেছে। এর পরপরই কয়েক দফায় ভূমিকম্প আঘাত হানে এ শহরে। এ দুটি বিষয় গবেষকদের মধ্যে একটি পুরনো প্রশ্ন জাগিয়ে তুলেছে। প্রশ্নটি হলো ভূমিকম্পনের আগে কি সাপ কোনো সংকেত দিতে পারে? এ প্রশ্ন নতুন নয়। তবে ঢাকার সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা আবারো আলোচনাটিকে সামনে এনেছে।

এর আগে, ২০০৮ সালে চীনের সিচুয়ান ভূমিকম্পের আগে বহু সাপ শীতনিদ্রা ভেঙে মাটির ওপরে উঠে এসেছিল। সে সময় বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এ ধরনের সংবাদও প্রকাশ করেছিল। আবার ২০১৬ সালে ইতালিতেও ভূমিকম্পের আগে পোষা সাপগুলো হঠাৎ অতিসক্রিয় হয়ে পড়ে। এ ঘটনাও নথিতে আছে।

বিজ্ঞানীরা বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, সাপসহ কিছু প্রাণী মাটির নিচের কম্পন টের পায়। তারা চাপ, গ্যাস নিঃসরণ বা তাপমাত্রার পরিবর্তনও খুব সংবেদনশীলভাবে টের পায়। সাপ সাধারণত মাটির নিচে গর্তে থাকে। তারা শরীরের নিচের অংশ দিয়ে কম্পন খুব সহজে গ্রহণ করে। তাই ভূমিকম্পের আগে পৃথিবীর টেকটোনিক প্লেটে সামান্য নড়াচড়া হলেও তারা অস্বাভাবিক আচরণ করতে পারে।

এ ব্যাখ্যার ভিত্তি আছে গবেষণাতেও। ২০০০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালটেক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ–জীববিজ্ঞানী জোসেফ এল কার্শভিংক তার গবেষণায় তুলে ধরেন, প্রাণীর দেহে বিশেষ রিসেপ্টর থাকতে পারে, যা ভূমিকম্পের আগের সূক্ষ্ম কম্পন বা বিদ্যুৎ চৌম্বকীয় পরিবর্তন টের পায়। তবে তিনি একইসঙ্গে সতর্ক করেন, এ আচরণ বিশ্বাসযোগ্য পূর্বাভাস নয়। কারণ এটি একেক পরীক্ষায় একেকরকম ফলাফল দেখিয়েছে। গবেষণাটি ক্যালটেক লাইব্রেরি রেকর্ডে প্রকাশিত হয়েছে।

এরপর ২০১৮ সালে জার্মানির জিএফজেড জার্মান রিসার্চ সেন্টার ফর জিওসায়েন্সেস এর গবেষক হেইকো ভয়িথ ১৬০টি ভূমিকম্প ও ৭২৯টি প্রাণীর আচরণ বিশ্লেষণ করেন। তাদের গবেষণায় প্রকাশিত হয় সিসমোলজিক্যাল রিসার্চ লেটার্সে এবং এর সারাংশ প্রকাশিত হয় সায়েন্সডেইলিতে। ভয়িথ বলেন, প্রাণীর আচরণ দিয়ে ভূমিকম্পের ‘পূর্বাভাস’ একটি আইডিয়া হতে পারে। তবে এটি স্পষ্ট নয়।

গল্পটা আরো এগোয় ২০২০ সালে। জার্মানির ম্যাক্স প্ল্যাংক ইনস্টিটিউট অব অ্যানিমাল বিহেভিয়ার ও ইউনিভার্সিটি অব কনস্টানজ এর বিজ্ঞানীরা গবেষক মার্টিন উইকেলস্কির নেতৃত্বে গরু, ভেড়া ও কুকুরের শরীরে সেন্সর বসিয়ে কয়েক মাস সময় নিয়ে পরীক্ষা চালান। তাদের গবেষণা প্রকাশিত হয় ইথোলজি জার্নালে ও সংবাদ হিসেবে প্রকাশ করা হয় সায়েন্সডেইলিতে।

সেখানে দেখা যায়, কিছু প্রাণী ভূমিকম্পের ১ থেকে ২০ ঘণ্টা আগেও অস্বাভাবিকভাবে অস্থির হয়ে ওঠে। গবেষকেরা এ আচরণকে বলেছেন দলবদ্ধ প্রতিক্রিয়া বা সোয়র্ম ইন্টেলিজেন্স। তবে তারাও জানিয়েছেন, এ ডেটা ভূমিকম্পের পূর্বাভাসের জন্য এখনো যথেষ্ট নয়।

এদিকে সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় বহুতল ভবনের ৮-৯ তলা পর্যন্ত সাপ উঠে এসেছিল। স্থানীয়দের কাছে যা স্পষ্টতই অস্বাভাবিক। তবে নগর বিস্তারের ফলে সাপের স্বাভাবিক আবাসস্থল কমে যাওয়া, গরমে পানির অভাব, ড্রেনেজ ব্যবস্থা নষ্ট হওয়া, বৃষ্টির পরে গর্ত ভেসে যাওয়া— এসবও তাদের হঠাৎ ওপরে উঠতে বাধ্য করতে পারে। আর একই সময়ে হালকা ভূমিকম্প হওয়ায় বিষয়টি আমাদের চোখে একসঙ্গে ধরা পড়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) বলছে, প্রাণীর আচরণ ভূমিকম্পসহ যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় বদলে যেতে পারে। কিন্তু আপাতত এটুকু মোটামুটি নিশ্চিত যে, সাপের এ আচরণ ভূমিকম্পের আগাম সংকেত নয়।

সব মিলিয়ে বিজ্ঞানীদের অবস্থান খুব পরিষ্কার, প্রাণীর আচরণ বদলাতে পারে। কিন্তু এটাকে ভূমিকম্পের আগাম বার্তা বলা বিজ্ঞানসম্মত নয়। আর ঢাকার সাম্প্রতিক ঘটনার ক্ষেত্রে আপাতত বলা যায়, বিজ্ঞানের কাছে এখনো বিষয়টি অসম্পূর্ণ সমীকরণ।

আরও