বিশ্বজুড়ে প্রায় ৬ হাজার ৭০০টি ভাষায় মানুষ কথা বলে। কিন্তু আপনি কি জানেন, প্রতি দুই সপ্তাহে একটি করে ভাষা হারিয়ে যাচ্ছে পৃথিবীর বুক থেকে! গবেষণার তথ্য এমনটাই বলছে। শুধু তাই নয়, এর সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে মানুষের ইতিহাস, সংস্কৃতি আর অগণিত প্রজন্মের জ্ঞানের ভাণ্ডার।
ইউনেসকোর হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী মানুষের মুখে প্রচলিত মোট ভাষার অন্তত ৪০ শতাংশই এখন বিপন্ন।অর্থাৎ একটা সময় আসবে, যখন এ ভাষাগুলো কেবল বইয়ের পাতা, আর্কাইভ, কিংবা স্মৃতির ভাঁজে টিকে থাকবে।
কেন হারিয়ে যাচ্ছে ভাষা?
পৃথিবীজুড়ে যেকটি ভাষা এখন বিপন্নের মুখে রয়েছে, তার সিংহভাগেরই বক্তা সংখ্যা খুবই সীমিত। অর্থাৎ খুবই কম সংখ্যক মানুষ এসব ভাষা ব্যবহার করছেন। কোনো কোনো ভাষায় কথা বলা মানুষের সংখ্যা ১০ জনে নিচে নেমে এসেছে। এসব ক্ষেত্রে দেখা যায়, বয়োজ্যেষ্ঠরা এখনো তাদের ভাষাকে ধরে রাখলেও নতুন প্রজন্মের কাছে তা অনাকর্ষণীয়, আবার ক্ষেত্রবিশেষে অচেনাও। বলে রাখা ভালো, ভাষার লিখিত রূপ বা সে ভাষায় কম সাহিত্য থাকাও এর বিলুপ্তিকে অনেকাংশেই ত্বরান্বিত করে।
এর পাশাপাশি রয়েছে বৈশ্বিক চাপ। ইংরেজি, ম্যান্ডারিন, স্প্যানিশ, হিন্দি বা আরবির মতো বহুল ব্যবহৃত ভাষাগুলো আধুনিক শিক্ষা, ব্যবসা, প্রযুক্তি আর চাকরির মূল চাবিকাঠি হয়ে দাঁড়িয়েছে। উন্নত জীবনের আশায় মানুষ যখন গ্রাম থেকে শহরে আসে, কিংবা বিদেশে পাড়ি জমায়, তখন নতুন পরিবেশ ও ভাষার কাছে মাতৃভাষা তার স্থান হারায়। বিবাহ, অভিবাসন, সাংস্কৃতিক মিশ্রণ—সব মিলিয়ে সংকুচিত হতে থাকে মাতৃভাষা।
আবার ভাষা হারিয়ে যাওয়ার জন্য টেলিভিশন, সিনেমা, ইন্টারনেট, সোশ্যাল মিডিয়াও একইভাবে বড় দায়ী। বিপন্ন ভাষাগুলোর জন্য প্রায় কোনো ডিজিটাল কনটেন্ট নেই—না সংবাদ, না সাহিত্য, না সিনেমা। ফলে তরুণ প্রজন্মের কাছে এগুলো হয়ে ওঠে অচল, অপ্রাসঙ্গিক।
কিছু হারিয়ে যাওয়া ভাষা-
১. আইয়াপা জোকে (Ayapa Zoque)— মেক্সিকোর ভাষাটির বর্তমানে মাত্র ১৫ জন বয়োজ্যেষ্ঠ বক্তা আছেন, যাদের বয়স ৬৭ থেকে ৯০-এর মধ্যে। শহরায়ন ও শিক্ষা এই ভাষার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
২. গংডুক (Gongduk)— এটি ভুটানের একেবারেই ছোট পরিসরের ভাষা; মাত্র এক থেকে দুই হাজার বক্তা আছেন।
৩. সিপ্রিয়ট ম্যারোনাইট অ্যারাবিক (Cypriot Maronite Arabic)— সাইপ্রাসে বসবাসকারী মারোনাইট খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের ব্যবহৃত এ ভাষা প্রায় ৯০০ বক্তা এখনো বেঁচে আছেন। তাদের সম্প্রদায় এরই মধ্যে এ ভাষা পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছে।
৪. চেরোকি (Cherokee)— এক সময় দক্ষিণ-পূর্ব আমেরিকার বিস্তৃত অঞ্চলে ব্যবহৃত হলেও এখন কেবল কয়েক হাজার মানুষই সাবলীলভাবে এ ভাষায় কথা বলতে পারেন।
৫. ইয়াকুন্টে (Yaakunte)— কেনিয়ার এ ভাষার বক্তা সংখ্যা নেমে এসেছে মাত্র ৯ জনে; তরুণ প্রজন্মর কেউই আর এ ভাষার দিকে আকৃষ্ট হচ্ছে না।
ভাষা ফিরিয়ে আনা যায়?
সব ভাষাই যে চিরদিনের জন্য হারিয়ে যায়, তা নয়। পুনর্জাগরণের গল্পও আছে। যেমন
১. ম্যান্স (Manx)— আয়ারল্যান্ড আর ব্রিটেনের মাঝখানে অবস্থিত আইলি অব ম্যান নামক দ্বীপে ১৯৭০-এর দশকে এ ভাষার শেষ মাতৃভাষী মারা যাওয়ার পরও ভাষাপ্রেমীরা হাল ছাড়েননি। আজ স্কুলশিক্ষা আর কমিউনিটি উদ্যোগে শিশুরা দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে ম্যান্স শিখছে।
২. কর্নিশ (Cornish) — যুক্তরাজ্যে প্রায় হারিয়ে যাওয়া এই ভাষাটিও ধীরে ধীরে ফিরছে বিদ্যালয়, স্থানীয় সম্প্রদায় আর সাংস্কৃতিক উৎসবের মাধ্যমে।
একটি ভাষা বিলীন হওয়া মানে কেবল শব্দ হারানো নয়। এর সঙ্গে হারিয়ে যায় হাজার বছরের লোককথা, কবিতা, সংগীত, ঔষধি গাছের নাম, কৃষি আর জীবনের অভিজ্ঞতা। ভাষার মৃত্যু মানে একেকটি সংস্কৃতির শিকড় ছিঁড়ে যাওয়া।
তবু আশার আলো রয়েছে। বিশ্বের নানা প্রান্তে মানুষ নিজের মাতৃভাষাকে আঁকড়ে ধরে রাখছে, নতুন প্রজন্মকে শেখাচ্ছে, আর প্রযুক্তিকে কাজে লাগাচ্ছে। কারণ ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়—এটি একটি জাতির পরিচয় আর ইতিহাস।