রূপকথা বনাম বাস্তবতা: সামুরাই বীরদের অজানা ইতিহাস

মধ্যযুগীয় জাপানের ‘সামুরাই’ শব্দটির সঙ্গে মিশে আছে অসীম সাহস, আনুগত্য আর ত্যাগের এক রোমাঞ্চকর আখ্যান। ‘শোগান’ থেকে শুরু করে ‘স্টার ওয়ার্স’—বিশ্ব চলচ্চিত্রের পর্দায় আমরা যে বর্মধারী যোদ্ধাদের দেখি, তারা যতটা না ঐতিহাসিক, তার চেয়ে বেশি কাল্পনিক। কিন্তু ব্রিটিশ মিউজিয়ামের নতুন এক প্রদর্শনী বলছে, সামুরাইদের প্রকৃত ইতিহাস আমাদের কল্পনার চেয়েও অনেক বেশি জটিল, বৈচিত্র্যময় ও বিস্ময়কর।

কুসংস্কারের বেড়াজালে বীরত্ব

১৮ শতকের ছাপচিত্র ‘উকিয়ো-ই’ প্রিন্ট থেকে আজকের ভিডিও গেম, টিভি, শো কিংবা চলচ্চিত্র—সামুরাইদের মতো এত বেশি মিথ বা রূপকথা আর কোনো গোষ্ঠীকে নিয়ে তৈরি হয়নি। ধারণা করা হয়, তারা ছিলেন আজন্ম যোদ্ধা ও মৃত্যুভয়হীন এক অনন্য জাপানি গোষ্ঠী।

তবে ব্রিটিশ মিউজিয়ামে তাদের নিয়ে হওয়া প্রদর্শনীর কিউরেটর রোসিনা বাকল্যান্ড বিবিসিকে জানান, সামুরাইরা কোনো একক বা অপরিবর্তিত গোষ্ঠী ছিল না। ১০ম শতাব্দীতে তারা মূলত রাজদরবারের ‘ভাড়াটে সৈন্য’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। পরবর্তীকালে তারা গ্রামীণ অভিজাত শ্রেণিতে রূপান্তরিত হয়।

মজার বিষয় হলো, আমরা যে ‘বুশিদো’ বা বীরত্বের কোডের কথা শুনি, শুরুর দিকে সামুরাইরা তা সবসময় মেনে চলত না। যুদ্ধক্ষেত্রে তারা সুযোগসন্ধানী ছিল; অতর্কিত হামলা বা প্রতারণা তাদের কৌশলের অংশ ছিল। তাদের মূল লক্ষ্য সম্মান নয়, বরং জমি এবং সামাজিক মর্যাদা অর্জন।

যখন ‘সংস্কৃতিই শক্তি’

সামুরাইদের উত্থানের মূলে ছিল রাজকীয় উত্তরাধিকার নিয়ে দ্বন্দ্ব। ১১৮৫ সালে মিনামোতো গোত্র নতুন শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে, যা সম্রাটের দরবারের সমান্তরালে পরিচালিত হয়। তবে শাসকরা দ্রুত বুঝতে পারেন যে, কেবল তলোয়ার দিয়ে রাজ্য চালানো সম্ভব নয়। তাই তারা কনফুসীয় দর্শনের ওপর ভিত্তি করে শাসন ব্যবস্থা সাজান। এই দর্শনে সামরিক শক্তির পাশাপাশি ‘সাংস্কৃতিক দক্ষতা’ ছিল অপরিহার্য।

ফলে সামুরাইরা কেবল যুদ্ধেই নয়, বরং চিত্রকলা, কবিতা, থিয়েটার এবং চা-চক্রের মতো মার্জিত শিল্পকলায় পারদর্শী হয়ে ওঠেন। ১৯ শতকের একটি সামুরাই চিত্রিত পাখার প্রদর্শন এ দাবির সপক্ষে শক্তিশালী প্রমাণ দেয়।

বৈচিত্র্য ও বিদেশী প্রভাব

সামুরাইরা যে কেবল নিজেদের ঐতিহ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, তার প্রমাণ মেলে তাদের বর্মে। ১৫৪৩ সালে জাপানে ইউরোপীয় আগ্নেয়াস্ত্র আসার পর পর্তুগিজ নকশায় সামুরাইদের বর্ম তৈরি শুরু হয়, যা বন্দুকের গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট করতে সাহায্য করত। এই অভিযোজন ক্ষমতা তাদের আধুনিকতার পরিচয় দেয়।

সামুরাই নারী: ঘরের ভেতরের শাসক

টোকুগাওয়া শোগুনাতের (১৬০৩-১৮৬৮) শান্তিপ্রিয় সময়ে সামুরাইদের ভূমিকা পাল্টে যায়। তারা তখন যোদ্ধার বদলে বনে যান আমলা, ট্যাক্স সংগ্রাহক বা পাহারাদার। এ সময় আঞ্চলিক লর্ডদের (দাইমিও) স্ত্রী-সন্তানদের এডো (বর্তমান টোকিও) শহরে কার্যত ‘জিম্মি’ হিসেবে রাখা হতো।

স্বামীদের অনুপস্থিতিতে এ সামুরাই নারীরাই বিশালাকার পরিবার ও ব্যবসা সামলাতেন। তারা কর্মচারী তদারকি, সন্তানের শিক্ষা ও আনুষ্ঠানিক আচার-অনুষ্ঠান রক্ষায় নেতৃত্ব দিতেন। প্রদর্শনীতে থাকা পোশাক, শিষ্টাচারবিষয়ক পুস্তিকা ও অন্যান্য সামগ্রী সে ইতিহাস তুলে ধরে। ইতিহাসে তোমো গোজেনের মতো নারী যোদ্ধাদের কথাও উল্লেখ আছে, যারা যুদ্ধক্ষেত্রে পুরুষদের সমান বীরত্ব দেখিয়েছেন।

ধ্বংস ও কাল্পনিক পুনর্জন্ম

১৮৬৯ সালে মেইজি যুগে সামুরাই প্রথা আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত হয়। ঠিক তখনই শুরু হয় ‘সামুরাই নস্টালজিয়া’। ১৯ শতকের শেষে নিতোবে ইনজোর লেখা ‘বুশিদো: দ্য সোল অব জাপান’ বইটি বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় হয়। থিওডোর রুজভেল্টের মতো বিশ্বনেতারাও বইটির ভক্ত ছিলেন। ২০ শতকে এ ভাবমূর্তিকে রাজনৈতিক প্রচারণার কাজেও ব্যবহার করা হয়।

বিশ্ব সংস্কৃতিতে প্রভাব

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সামুরাই নতুনভাবে চলচ্চিত্রে ফিরে আসে। আকিরা কুরোসাওয়া নির্মিত ‘সেভেন সামুরাই’ (১৯৫৪) চলচ্চিত্রটি হলিউডকে নতুন পথ দেখায়। এ সিনেমা থেকেই অনুপ্রাণিত হয়ে তৈরি হয় ‘দ্য ম্যাগনিফিসেন্ট সেভেন’ বা সার্হিও লিওনের স্প্যাগেটি ওয়েস্টার্ন ছবিগুলো। এমনকি ‘স্টার ওয়ার্স’-এর ডার্থ ভেডারের আইকনিক পোশাকটিও সরাসরি সামুরাই বর্ম থেকে অনুপ্রাণিত।

আরও