গত মাসে এয়ার ইন্ডিয়ার বিমান দুর্ঘটনার প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে, উড্ডয়নের পরপরই জ্বালানি নিয়ন্ত্রণের সুইচ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এতে ইঞ্জিনে জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায় এবং ইঞ্জিন থ্রাস্ট কমে যায়। ভারতের এয়ারক্রাফ্ট অ্যাক্সিডেন্ট ইনভেস্টিগেশন ব্যুরো শনিবার এই প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতে বলা হয়, ককপিট ভয়েস রেকর্ডারের রেকর্ডিংয়ে শোনা যায়, ফ্লাইটের শেষ মুহূর্তে এক পাইলট আরেক পাইলটকে জিজ্ঞাসা করেন—কেন জ্বালানি বন্ধ করে দিয়েছেন। জবাবে অন্য পাইলট জানান, তিনি তা করেননি।
প্রতিবেদনটি বিমানের ব্ল্যাক বক্স থেকে পাওয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। ব্ল্যাক বক্সে সাধারণত ককপিট ভয়েস রেকর্ডার এবং ফ্লাইট ডেটা রেকর্ডারের তথ্য মেলে। মূলত ককপিট ভয়েস রেকর্ডার ও ফ্লাইট ডেটা রেকর্ডার—দুটি যন্ত্রকে একসঙ্গে বলা হয় ব্ল্যাক বক্স। এটি বিমান দুর্ঘটনার কারণ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সরবরাহ করে।
ব্ল্যাক বক্স আসলে কমলা রঙের হয় যাতে ধ্বংসাবশেষের মধ্যে সহজেই তা খুঁজে পাওয়া যায়। ব্ল্যাক বক্স সাধারণত বিমানের লেজের দিকে বসানো থাকে, কারণ সেই অংশ তুলনামূলকভাবে দুর্ঘটনায় তুলনামূলক কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ককপিট ভয়েস রেকর্ডার বিমানের রেডিও বার্তা, পাইলটদের কথা, ইঞ্জিনের শব্দ প্রভৃতি রেকর্ড করে। এই সব শব্দের ভিত্তিতে ইঞ্জিনের গতি, কোনো সিস্টেমের ব্যর্থতা ইত্যাদি নির্ণয় করা সম্ভব।
পাইলট ও ক্রুর আলাপ এবং এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলের কথোপকথনও এতে সংরক্ষিত হয়। পরে বিশেষজ্ঞরা এই রেকর্ডিংয়ের ট্রান্সক্রিপশন করে। এতে প্রায় এক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে।
অন্যদিকে, ফ্লাইট ডেটা রেকর্ডার বিমানের উচ্চতা, গতি, দিকনির্দেশসহ অন্তত ৮৮টি বিষয়ের তথ্য রেকর্ড করে। আধুনিক বিমানে এই সংখ্যা হাজারেরও বেশি হতে পারে—যেমন ডানার ফ্ল্যাপের অবস্থান থেকে শুরু করে ধোঁয়া সনাক্তকরণের অ্যালার্ম পর্যন্ত। এই তথ্য দিয়ে তদন্তকারীরা একটি কম্পিউটার এনিমেশন তৈরি করতে পারেন, যা দেখায় বিমান কীভাবে ও কোথায় উড়ছিল।
বিমানের তথ্য রেকর্ডিং ডিভাইস তৈরির কৃতিত্ব অন্তত দুজনকে দেয়া হয়। ফ্রান্সের বিমান প্রকৌশলী ফ্রাঁসোয়া হুসানো ১৯৩০-এর দশকে আলোকচিত্র ফিল্মে বিমানের তথ্য সংরক্ষণের পদ্ধতি আবিষ্কার করেন।
অস্ট্রেলিয়ার বিজ্ঞানী ডেভিড ওয়ারেন ১৯৫০-এর দশকে ককপিট ভয়েস রেকর্ডারের ধারণা দেন। ১৯৫৩ সালে প্রথম কমার্শিয়াল জেট এয়ারলাইনার ‘কোমেট’ বিধ্বস্ত হলে তিনি ভাবেন, পাইলটদের কথোপকথনের রেকর্ড থাকলে তদন্তে অনেক সুবিধা হবে। ১৯৫৬ সালে তিনি প্রোটোটাইপ তৈরি করেন। পরে এটিকে বাণিজ্যিক বিমানে বাধ্যতামূলক করা হয়।
ব্ল্যাক বক্স নামকরণের রয়েছে বিভিন্ন ব্যাখ্যা। এয়ারবাসের তথ্যানুযায়ী, হুসানোর যন্ত্রটি আলোকরোধী বাক্সে রাখা হতো, এজন্য একে ব্ল্যাক বক্স বলা হয়।
অন্য ধারণা বলছে, দুর্ঘটনায় পুড়ে কালো হয়ে যাওয়ার কারণেও এই নাম হতে পারে। তাই রঙ কমলা হলেও ব্ল্যাক বক্স নামটিই থেকে গেছে। তাছাড়া, বিমান দুর্ঘটনার রহস্যময়তা বোঝাতেও এই নাম বেশি ব্যবহৃত হয়।
এপি অবলম্বনে