নেচার জার্নালে প্রকাশিত গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্য

প্রাণঘাতী তাপপ্রবাহ বাড়াচ্ছে জ্বালানি জায়ান্টদের কার্বন নিঃসরণ

গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বের শীর্ষ ১৪ জ্বালানি উত্তোলনকারী কোম্পানির প্রতিটির ঘটানো কার্বন নিঃসরণ আলাদা আলাদাভাবে ৫০টিরও বেশি তাপপ্রবাহ ঘটানোর জন্য যথেষ্ট ছিল। এ নিঃসরণ ছাড়া এসব তাপপ্রবাহ ঘটা কার্যত অসম্ভব ছিল। অর্থাৎ, গবেষণায় তাপপ্রবাহের জন্য এসব কোম্পানিকেই দায়ী করা হয়েছে সবচেয়ে বেশি।

গত এক-দেড় দশকে একের পর এক প্রাণঘাতি তাপপ্রবাহের মধ্য দিয়ে গেছে গোটা বিশ্ব। এর মধ্যে অর্ধেকই ঘটেছে জ্বালানি জায়ান্টগুলোর কার্বন নিঃসরণের কারণে। সুইজারল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, যুক্তরাজ্য, নেদারল্যান্ডস ফ্রান্স ও বেলজিয়ামের কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় এবং জলবায়ু গবেষণা প্রতিষ্ঠানের এক যৌথ গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণা পাওয়া ফলাফল নেচার জার্নালে ‘সিস্টেমেটিক অ্যাট্রিবিউশন অব হিটওয়েভস টু দ্য এমিশনস অব কার্বন মেজরস’ শীর্ষ প্রতিবেদনে প্রকাশ হয়েছে। খবর দ্য গার্ডিয়ান।

প্রাণঘাতি তাপপ্রবাহে বিশ্বের বৃহত্তম জীবাশ্ম জ্বালানি কোম্পানিগুলোর ভূমিকা নিরূপণে এখন পর্যন্ত এটিই সবচেয়ে বিস্তৃত গবেষণা। এর ফলাফল বিশ্বব্যাপী জলবায়ু সংকটের জন্য বৃহৎ জ্বালানি তেল উত্তোলন কোম্পানিগুলোকে জবাবদিহির আওতায় আনার আইনি লড়াইয়ে বড় ধরনের অগ্রগতির সুযোগ তৈরি করেছে বলে মনে করা হচ্ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বের শীর্ষ ১৪ জ্বালানি উত্তোলনকারী কোম্পানির প্রতিটির ঘটানো কার্বন নিঃসরণ আলাদা আলাদাভাবে ৫০টিরও বেশি তাপপ্রবাহ ঘটানোর জন্য যথেষ্ট ছিল। এ নিঃসরণ ছাড়া এসব তাপপ্রবাহ ঘটা কার্যত অসম্ভব ছিল। অর্থাৎ, গবেষণায় তাপপ্রবাহের জন্য এসব কোম্পানিকেই দায়ী করা হয়েছে সবচেয়ে বেশি।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, এক্সনমোবিলের জ্বালানি থেকে সৃষ্ট কার্বন দূষণ ৫১টি তাপপ্রবাহের সম্ভাবনা কমপক্ষে ১০ হাজার গুণ বাড়িয়েছে বলে দেখতে পেয়েছেন গবেষকরা। একই চিত্র সৌদি আরামকোর ক্ষেত্রেও।

বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে বিশ্বজুড়ে এখন আরো ঘনঘন ও তীব্র মাত্রার তাপপ্রবাহ দেখা যাচ্ছে। এর ফলে প্রতিবছর মৃত্যু হচ্ছে অন্তত ৫ লাখ মানুষের। গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ১৮০টি ‘কার্বন মেজর’ কোম্পানির মোট নিঃসরণ বিশ্বব্যাপী তাপপ্রবাহের তীব্রতা বৃদ্ধির প্রায় অর্ধেকের জন্য দায়ী। আর বাকি অংশের বেশিরভাগ দায় বন উজাড়ের কারণে ঘটা নিঃসরণ।

প্রসঙ্গত, বিশ্বের ১৮০টি বৃহৎ জ্বালানি ও সিমেন্ট উৎপাদনকারী কোম্পানিকে কার্বন মেজর বলে উল্লেখ করা হয়। এগুলোকে বিশ্বব্যাপী কার্বন নিঃসরণের জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী বিবেচনায় জবাবদিহির আওতায় আনার জন্য একটি ডাটাবেজ তৈরি করা হয়েছে, যা কার্বন মেজরস ডাটাবেজ নামে পরিচিত।

এ বিষয়ে গবেষকদের অন্যতম এবং সুইজারল্যান্ডের ইটিএইচ জুরিখ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর সোনিয়া সেনেভিরাতনে বলেন, ‘কার্বন নিঃসরণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর একক অবদান শনাক্ত করতে পারা এবং হিসাব কষে এর পরিমাণ বের করা কোম্পানিগুলোর সম্ভাব্য দায়ের পরিমাণ নির্ধারণে খুব কার্যকর হতে পারে।’

ফ্রান্সের জাতীয় বৈজ্ঞানিক গবেষণা কেন্দ্রের গবেষণা পরিচালক ড. ডেভিড ফারান্ডা বলেন, ‘এ গবেষণায় একটি নির্দিষ্ট জলবায়ুগত বিপর্যয়ের সঙ্গে সেসব কোম্পানিকে সরাসরি যুক্ত করেছে, যাদের কার্বন নিঃসরণ এ বিপর্যয়ের জন্য দায়ী। এটি এ সংক্রান্ত ভবিষ্যৎ আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ ও নীতি নির্ধারণের মূলভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।’

গবেষণাটির জন্য ‘অ্যাট্রিবিউশন’ নামের একটি বিশ্লেষণ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। এতে আবহাওয়ার তথ্য ও কম্পিউটার মডেল ব্যবহার করে বর্তমানে উষ্ণ হয়ে ওঠা বিশ্বকে জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো শুরুর আগের পৃথিবীর সঙ্গে তুলনা করা হয়।

বিজ্ঞানীরা প্রথমে নির্ধারণ করেন প্রতিটি কার্বন মেজরের নিঃসরণ কতটা তাপমাত্রা বাড়িয়েছে। এরপর এ বাড়তি তাপমাত্রা তাপপ্রবাহের সম্ভাবনা কতটা বাড়িয়েছে, সেটিও পরিমাপ করা হয়।

পরিবেশ আন্দোলন মেক পলিউটার্স পের মুখপাত্র ক্যাসিডি ডি পোলা বলেন, ‘এখন আমরা নির্দিষ্ট তাপপ্রবাহের দিকে আঙুল তুলে বলতে পারি যে এটা সৌদি আরামকো করেছে বা এটা এক্সনমোবিল করেছে। তাদের নিঃসরণই এমন তাপপ্রবাহ ঘটাচ্ছে, যা অন্যথায় হতো না। আমরা যখন এ নিয়ে কথা বলছি, তখন আমরা মানুষের মৃত্যু, ফসলহানি আর ভোগান্তির কথা বলছি—যেগুলো করপোরেট বোর্ডরুমের সিদ্ধান্তের কারণে ঘটেছে।’

ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিস গত জুলাইয়ে রায় দিয়েছে যে কোনো কোম্পানি জলবায়ুগত ক্ষতি ঠেকাতে ব্যর্থ হলে সেটিকে ক্ষতিপূরণ দিতে হতে পারে। এর আগেই মে মাসে জার্মানির একটি উচ্চ আদালত রায় দেন যে কার্বন নিঃসরণের কারণে জীবাশ্ম জ্বালানি কোম্পানিগুলোকে জবাবদিহি করতে হতে পারে।

ক্যাসিডি ডি পোলা বলেন, ‘আদালতের জন্য যে প্রমাণ অপেক্ষা করছিল, এটিই তা। এখন হিসাব মেটানোর সময় এসে গেছে। এখন এ দূষণকারীদের ঘটানো ক্ষতির জন্য মূল্য দিতে হবে।’

জ্বালানি কোম্পানিগুলোর নিঃসরণজনিত ক্ষতি গবেষণায় উঠে আসা ফলাফলের আরো ভয়াবহ বলে মনে করছেন ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের বিশেষজ্ঞ ড. ফ্রেডরিক অটো। তিনি বলেন, ‘এই গবেষণার ফলাফল প্রকৃত প্রভাবকে কমিয়ে দেখিয়েছে। বাস্তব ক্ষতি হয়তো আরো অনেক বেশি।’

এমনকি কার্বন মেজরদের তালিকার নিচের দিকের জীবাশ্ম জ্বালানি কোম্পানিগুলোর নিঃসরণও বিগত বছরগুলোয় তাপপ্রবাহের মাত্রা বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলেছে। এদের প্রত্যেকটির দূষণ অন্তত ১৬টি তাপপ্রবাহের সম্ভাবনা ১০ হাজার গুণ বাড়িয়েছে।

এ বিষয়ে যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ানের পক্ষ থেকে এক্সনমোবিল ও সৌদি আরামকোর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তবে কোম্পানিদুটি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।

আরও