কুকরের সঙ্গে মানুষের সহাবস্থান দীর্ঘদিনের। সবচেয়ে প্রভূভক্ত প্রাণী হিসেবে কুকুরের সুনাম আছে। এক টুকরো রুটির বিনিময়ে একনিষ্ঠ পাহারাদারের কাজ করে। বাকি খাদ্যের যোগাড় তারা নিজেরাই করে নেয়। কিন্তু সাস্প্রতিক সময়ে নগরে এ চিত্র বেশ পাল্টে গেছে। কুকুর এখন আর বিস্কুট বা রুটি খেতে চায় না। নগরের নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চলে তাদের নিয়মিত খাদ্য সরবরাহ করে ভলান্টিয়াররা। পশুপ্রেমীদের দেয়া খাবারে কুকুরের খাদ্যাভাস পাল্টে গেছে। আপাতদৃষ্টিতে বিষয়টিকে মানবিক মনে হলেও এ পরিবর্তন দীর্ঘমেয়াদে সংকটের জন্ম দিচ্ছে। আর এরইমধ্যে এ সংকটে ভুগছে ভারতের রাজধানী দিল্লি।
ভারতজুড়ে বর্তমানে কমপক্ষে ছয় কোটি নেড়ি কুকুর রয়েছে। যদিও এ হিসাব এক দশকের বেশি পুরোনো। তবে ধারণা করা হচ্ছে, সাম্প্রতিক সময়ে শুধু দিল্লিতেই প্রায় ১০ লাখ কুকুরের বাস। এ বিপুল সংখ্যক কুকুর শহরটিতে গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করেছে। বিশ্বে জলাতঙ্কে মৃত্যুর এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি ঘটে ভারতে।
আইনের টানাপোড়েন
পশ্চিমা দেশগুলোর মতো ভারতে কুকুর নিধন আইনত নিষিদ্ধ। দেশটির নিয়ম হলো—কুকুর ধরো, বন্ধ্যাকরণ করো, ভ্যাকসিন দাও আর ঠিক যেখান থেকে ধরা হয়েছে সেখানেই ফেরত দিয়ে আসো। কিন্তু বাস্তবে এই নিয়ম মানা হয় খুব কম।
২০২৫ সালের আগস্টে কুকুরের কামড়ে বেশ কিছু শিশুর মৃত্যুর পর ভারতের সুপ্রিম কোর্ট দিল্লির সব কুকুরকে আশ্রয়কেন্দ্রে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছিল। কিন্তু লক্ষ লক্ষ কুকুরের জন্য কোনো আশ্রয়কেন্দ্র না থাকায় এবং পশুপ্রেমীদের তীব্র আন্দোলনের মুখে মাত্র দুই দিনের মাথায় আদালত সে সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে।
সবশেষ গত ৭ জানুয়ারি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন যে, আট সপ্তাহের মধ্যে ভারতের ১৫ লাখ স্কুল ও কলেজ, হাসপাতাল ও গণপরিবহন এলাকা কুকুরমুক্ত করতে হবে। সেজন্য এলাকাগুলোয় শক্ত বেষ্টনী দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কিন্তু এ বিশাল পরিকাঠামো রাতারাতি তৈরি করা প্রায় অসম্ভব।
সহাবস্থানের সংকট: কেন কুকুররা আগ্রাসী হচ্ছে?
এ বিতর্ক কেবল জননিরাপত্তা বনাম প্রাণীকল্যাণের নয়; এটি মানুষ ও কুকুরের সম্পর্কের এক গভীর সংকটের প্রতিফলন। কুকুর একমাত্র প্রাণী যারা মানুষের সঙ্গে আফ্রিকা ছাড়িয়ে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছে। তারা মানুষের আচরণ, স্থান আর সংকেতের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ভারতের শহরে ‘মালিকহীন’ হলেও কুকুররা যেসব মানুষ নিয়মিত খাবার দেয়, তাদের এলাকা নিজের বলে ধরে নেয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, শহরের সচ্ছল এলাকাগুলোয় কুকুরদের পরিকল্পিতভাবে খাওয়ানো হয়। এর ফলে কুকুররা নির্দিষ্ট কিছু বাড়ির সামনে দলবদ্ধ হয়ে থাকে আর সেই এলাকাটিকে নিজেদের ‘টেরিটরি’ বা সীমানা মনে করে। আর রাতে যখন ময়লা সংগ্রাহক বা খেটে খাওয়া মানুষরা রাস্তায় বের হন, তখন কুকুররা তাদের ওপর চড়াও হয়। এটি কোনো অযৌক্তিক হিংস্রতা নয়, বরং যে মানুষটি তাকে খাওয়াচ্ছে তার প্রতি আনুগত্য ও সেই জায়গাটুকু রক্ষা করার এক আদিম প্রবৃত্তি।
দ্য কনভারসেশন অবলম্বনে