ফোবিয়া

আসছে ভালোবাসা দিবস, আপনিও কি অ্যানাপ্টাফোবিয়ায় আক্রান্ত?

আমাদের সমাজব্যবস্থা এমনভাবে গড়ে উঠেছে যেখানে একা থাকাটা যেন অনেকটা অপরাধের মতো। রাস্তাঘাটে, পারিবারিক বা সামাজিক অনুষ্ঠানে শুনতে হয় একই প্রশ্ন, “বিয়ে কবে করছ?” সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, আমাদের সংস্কৃতিতে নির্দিষ্ট বয়সের মধ্যে বিয়ে বা স্থায়ী সম্পর্কে জড়ানোর একটি সামাজিক চাপ থাকে। এই চাপ থেকেই তৈরি হয় গভীর অনিশ্চয়তা, ভয় যা মানুষকে ঠেলে দেয় অ্যানাপ্টাফোবিয়ার দিকে।

অধিকাংশ মানুষ চায় ভালোবাসতে এবং বিনিময়ে অকৃত্রিম ভালোবাসায় সিক্ত হতে। এমন কাউকে চায় যার সঙ্গে জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত ভাগ করে নেয়া যায়। আমরা সবাই এমন কাউকে খুঁজি যাকে ‘নিজের মানুষ’ বলতে পারি। ভালোবাসা দিবস এলে সেই আকাঙ্ক্ষা যেন আরো বেড়ে যায়। জীবনের প্রতিটি বাঁকে পাশে থাকার মতো কাউকে খুঁজে পাওয়া মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। কিন্তু এ ‘কাউকে’ পাওয়ার ইচ্ছা যখন তীব্র আতঙ্কে রূপ নেয়, তখন তাকে বলা হয় অ্যানাপ্টাফোবিয়া (Anuptaphobia) ।

অ্যানাপ্টাফোবিয়া কী?

অ্যানাপ্টাফোবিয়া হলো রোমান্টিক সম্পর্কে না থাকার প্রতি একটি অযৌক্তিক এবং তীব্র ভয়। অর্থাৎ অবিবাহিত বা একা থাকার আতংক। একা থাকার এ ভয় এতটাই প্রবল হতে পারে যে, একজন ব্যক্তি পুরোদমে প্যানিক অ্যাটাক বা উদ্বেগের শিকার হতে পারেন, যা তাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রকে প্রভাবিত করে। অ্যানাপ্টাফোবিয়া কোনো সাধারণ ভয় নয়। এটি একটি অযৌক্তিক এবং অনিয়ন্ত্রিত ভয় যা অনেকটা আচ্ছন্ন আচরণের (Obsessive behavior) পর্যায়ের। তাদের কাছে অবিবাহিত থাকার চিন্তা অসহ্য এবং অগ্রহণযোগ্য। সমাজ তাকে 'চিরকুমার' বা 'চিরকুমারী' বলবে—এ ভয়ে তারা প্রচণ্ড উদ্বেগের শিকার হতে পারেন। একজন অ্যানাপ্টাফোবিক ব্যক্তি কেবল একটি সম্পর্কে থাকার জন্যই সম্পর্কে জড়ান। অনেকে এমন সম্পর্কেও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হন, যেখানে অপর ব্যক্তির প্রতি তাদের কোনো ভালোবাসা বা টান নেই। এ ভীতি একজন ব্যক্তিকে ভুল মানুষের সঙ্গে সম্পর্কে জড়াতে বাধ্য করতে পারে। একবার সম্পর্কে জড়িয়ে পড়লে, তারা সম্পর্কটি ধরে রাখতে আপ্রাণ চেষ্টা করেন, এমনকি সেটি যদি টক্সিক হয় তবুও। পুরুষ এবং নারী উভয়ই এ ব্যাধিতে আক্রান্ত হতে পারেন।

অবিবাহিত থাকার আতঙ্ক কেন হয়?

আমাদের সমাজব্যবস্থা এমনভাবে গড়ে উঠেছে যেখানে একা থাকাটা যেন অনেকটা অপরাধের মতো। রাস্তাঘাটে, পারিবারিক বা সামাজিক অনুষ্ঠানে শুনতে হয় একই প্রশ্ন, “বিয়ে কবে করছ?” সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, আমাদের সংস্কৃতিতে নির্দিষ্ট বয়সের মধ্যে বিয়ে বা স্থায়ী সম্পর্কে জড়ানোর একটি সামাজিক চাপ থাকে। এ চাপ থেকেই তৈরি হয় গভীর অনিশ্চয়তা, ভয় যা মানুষকে ঠেলে দেয় অ্যানাপ্টাফোবিয়ার দিকে। আবার পরিবারে আগে থেকেই উদ্বেগজনিত রোগের ইতিহাস থাকলে এটি হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে। হীনমন্যতা থেকেও হতে পারে। শৈশবে বুলিং বা অবহেলার শিকার হলে অনেকের মনে হয় যে তারা ভালোবাসার যোগ্য নন, ফলে তারা যেকোনো মূল্যে একটি সম্পর্কের নিশ্চয়তা খোঁজেন।

অ্যানাপ্টাফোবিয়ার প্রভাব

অ্যানাপ্টাফোবিয়ার সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো, একা থাকার ভয়ে মানুষ ভুল বা 'টক্সিক' সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। আক্রান্ত ব্যক্তি সঙ্গীর ভালোবাসা না পেলেও কেবল 'সিঙ্গেল' না থাকার তাগিদে দিনের পর দিন মানসিক বা শারীরিক নির্যাতন সহ্য করে যান। তাদের কাছে সঙ্গীর অভাবের চেয়ে বিষাক্ত সম্পর্কও অনেক সময় শ্রেয় মনে হয়। অবস্থার তীব্রতার ওপর ভিত্তি করে এটি অন্যান্য গুরুতর মানসিক সমস্যা যেমন—উদ্বেগ (Anxiety), অবসেসিভ-কম্পালসিভ ডিসঅর্ডার (OCD) এবং মারাত্মক বিষণ্নতার (Depression) দিকে নিয়ে যেতে পারে।

অ্যানাপ্টাফোবিয়ার লক্ষণ

অ্যানাপ্টাফোবিয়ার লক্ষণগুলো মানসিক, আচরণগত এবং শারীরিক হতে পারে।

মানসিক আচরণগত লক্ষণ:

১. লজ্জাবোধ এবং আত্মবিশ্বাসের অভাব।

২. একা থাকার কথা ভেবে আতঙ্কিত হওয়া।

৩. মনোযোগের অভাব এবং খিটখিটে মেজাজ।

৪. প্রচণ্ড ঈর্ষাবোধ।

৫. খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে এক সম্পর্ক থেকে অন্য সম্পর্কে যাওয়া।

৬. দম্পতিদের আশেপাশে থাকতে অস্বস্তি হওয়া।

৭. অতিরিক্ত আঁকড়ে ধরার প্রবণতা (Clingy) হওয়া।

শারীরিক লক্ষণ:

১. হৃৎস্পন্দনের গতি বেড়ে যাওয়া এবং উচ্চ রক্তচাপ।

২. শ্বাসকষ্ট বা দ্রুত শ্বাস নেয়া।

৩. ঘাম হওয়া বা শরীরে কাঁপুনি।

৪. বমি বমি ভাব এবং মাথা ঘোরা।

৫. কানে ভোঁ ভোঁ শব্দ হওয়া।

অ্যানাপ্টাফোবিয়া থেকে মুক্তির উপায়

অ্যানাপ্টাফোবিয়া থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। বিশেষজ্ঞরা কিছু কার্যকরী পথের পরামর্শ দেন যেমন-

১. থেরাপি: 'টক থেরাপি'র মাধ্যমে মনের অবদমিত ভয়গুলো বের করে আনা সম্ভব। থেরাপিস্টের সাথে কথা বলে নিজের চিন্তার ধরন বদলানো যায়। ভয়কে জয় করার অন্যতম উপায় হলো তার মুখোমুখি হওয়া বা এক্সপোজার থেরাপি। একা থেকেও যে আনন্দময় জীবন কাটানো সম্ভব, সেটি ধীরে ধীরে অভ্যাসের মাধ্যমে আয়ত্ত করা। কগনিটিভ-বিহেভিওরাল থেরাপি (CBT) নেতিবাচক চিন্তা ধারা পরিবর্তন করে বাস্তবসম্মত এবং ইতিবাচক বিশ্বাস স্থাপনে সাহায্য করে।

২. আত্মউন্নয়ন ও মাইন্ডফুলনেস: যোগব্যায়াম এবং নিয়মিত ব্যায়াম মানসিক প্রশান্তি আনে। নিজের ভালোলাগার কাজ বা শখের প্রতি মনোযোগ দিলে আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি পায়।

৩. নিজের মূল্য বোঝা: মনে রাখা জরুরি যে, কোনো সম্পর্কই আপনার ব্যক্তিত্ব বা জীবনের পূর্ণতা নির্ধারণ করে না। আপনি একাও সম্পূর্ণ এবং মূল্যবান।

৪. কাউন্সেলিং ও সাপোর্ট গ্রুপ: একই ধরনের সমস্যায় আক্রান্ত অন্যদের সাথে অভিজ্ঞতা শেয়ার করা এবং বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেয়া বেশ কার্যকর।

সম্পর্ক জীবনের একটি অংশ, পুরো জীবন নয়। একা থাকা মানেই আপনি অসম্পূর্ণ নন। অ্যানাপ্টাফোবিয়া কাটিয়ে উঠতে পারলে আপনি কেবল একজন সঙ্গীই পাবেন না, নিজেকেও নতুন করে আবিষ্কার করতে পারবেন। মনে রাখবেন, ভুল সম্পর্কের চেয়ে একা থাকা অনেক বেশি স্বস্তির।

[ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব মেন্টাল হেলথ (NIMH) ও Klarity এর সহায়তায় লেখা]

আরও