ঈদ মানেই আনন্দ, ব্যস্ততা আর ঘরভর্তি অতিথি। এ সময়টায় অনেকেই নিজেদের পোষা বিড়ালের যত্নে কিছুটা আলসেমি করেন। কিন্তু হঠাৎ পরিবেশের পরিবর্তন, শব্দ আর মানুষের ভিড়ে বিড়াল সহজেই পড়ে যেতে পারে অস্বস্তিতে। তাই ঈদের সময়টাতেও প্রাণীগুলোর স্বাচ্ছন্দ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।
খাবারের বিষয়ে সতর্কতা
ঈদের বিশেষ খাবারে তেল, মশলা, চিনি বা পেঁয়াজ-রসুন বেশি থাকে, যা বিড়ালের জন্য ক্ষতিকর। তাই কোনোভাবেই এসব মশলা জাতীয় খাবার বিড়ালকে দেয়া যাবে না। ঘরের বড় ও অতিথিদেরও এ বিষয়ে সতর্ক রাখতে হবে, যেন তারা ভুল করে কিছু খেতে না দেন। বিড়ালের জন্য তার নিয়মিত খাবার বা সেদ্ধ মাংস আলাদা করে রাখতে হবে। উৎসবের আমেজে যাতে কোনোভাবে তার প্রোটিনের ঘাটতি না হয় সে খেয়াল রাখতে হবে।
খেয়াল রাখতে হবে উৎসবের আমেজে যেন কোনোভাবেই আদুরে বিড়ালের শরীরে পুষ্টি বা পানির অভাব না হয়। ছবি: মাহফুজা মিম
গরমে পানির ব্যবস্থা
এবারের ঈদ হচ্ছে বেশ গরম আবহাওয়ার মধ্যে। এ সময়টায় বিড়ালের শরীরে পানিশূন্যতা দেখা দিতে পারে। তাই সবসময় বিশুদ্ধ ও স্বাভাবিক তাপমাত্রার পানি তার কাছে রাখা জরুরি। পাশাপাশি আপনার বিড়ালটি পর্যাপ্ত পানি খাচ্ছে কি না, তাও খেয়াল রাখতে ভোলা যাবে না কিন্তু।
পোশাক ও সাজসজ্জা
অনেকে শখ করে ঈদে বিড়ালকেও পোশাক কিনে দিয়ে থাকেন। কিন্তু যেহেতু প্রাণীরা পোশাকে অভ্যস্ত না, তাই এতে তারা অস্বস্তি বোধ করতে পারে। এজন্য জোর করে কিছু পরানো ঠিক নয়। তারপরও স্বল্প সময়ের জন্য পোশাক পরানো হলেও বিড়ালের স্বাভাবিক চলাফেরা যেন ব্যাহত না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। তাদের পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেয়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
আবহাওয়া বদলের এ সময়টায় দুপুরের খাওয়া শেষে ভাতঘুম দিচ্ছে জোজো আর তুতুন। ছবি: মাহফুজা মিম
দরজা-জানালার নিরাপত্তা
অতিথি আসা-যাওয়ার সময় দরজা বারবার খোলা হয়। এ সময় বিড়াল ভয় পেয়ে কিংবা কৌতূহলবশত বাইরে চলে যেতে পারে। তাই দরজা-জানালা খোলা রাখার সময় সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে। সম্ভব হলে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করে পোষা বিড়ালটির দেখভালের দায়িত্ব ভাগ করে নেয়া যেতে পারে।
ছবি: মাহফুজা মিম
নিরাপত্তা
আপাতদৃষ্টিতে দেখতে শান্ত মনে হলেও চঞ্চলতা ও দুষ্টুমির বশে আপনার আদরের প্রাণীটি কিন্তু না বুঝেই লাফ দিতে পারে উঁচু বিল্ডিং থেকে। তাই তার নিরাপত্তার দিকে খেয়াল রাখার দায়িত্ব আপনার। পোষা বিড়ালের নিরাপত্তায় বাসার জানালায় নেট বা জালির ব্যবহার করা যেতে পারে। এতে করে বিড়ালের নিরাপত্তা যেমন নিশ্চিত হবে, তেমনি বাসাও মশার হাত থেকে সুরক্ষিত থাকবে।
অতিথিদের সংস্পর্শ ও সতর্কতা
ঈদের দিন বাড়িতে আসা অতিথিরা, বিশেষ করে শিশুরা অনেক সময় আদরের ছলে বিড়ালকে অতিরিক্ত টানাটানি বা কচলাকচলি করতে পারে। বিড়াল সাধারণত অতিরিক্ত স্পর্শ বা জোর করে কোলে নেয়া পছন্দ করে না। এতে তারা বিরক্ত হয়ে খামচি বা কামড় দিতে পারে। তাই অতিথিরা যেন অকারণে পোষা বিড়ালদের বিরক্ত না করে বা অস্বস্তিতে না ফেলে, সেদিকে নজর রাখতে হবে। বিড়ালকে তার নিজের মতো থাকতে দেয়া ও নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা তার মানসিক শান্তির জন্য জরুরি।
অতিরিক্ত গ্রুমিং ও গোসল থেকে বিরত থাকা
ঈদের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অংশ হিসেবে অনেকেই শখ করে বিড়ালকে গোসল করাতে চান। আবার গ্রুমিং করতে গিয়ে নখ বেশি ছোট করে কেটে ফেলেন। মনে রাখতে হবে, উৎসবের আমেজে এমনিতে বিড়াল চাপে থাকে, তার ওপর জোর করে গোসল করালে সে আরো আতঙ্কিত হয়ে অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে। আবার গ্রুমিং বা নখ কাটার সময় অসতর্কতায় বেশি কেটে ফেললে রক্তপাত বা ব্যথার মতো দুর্ঘটনাও ঘটতে পারে। তাই ঈদের সময় খুব বেশি প্রয়োজন না হলে বিড়ালকে নতুন করে গোসল দেয়া বা নখ কাটার প্রয়োজন নেই।
লিটার বক্সের পরিচ্ছন্নতা
ঈদের ব্যস্ততা ও অতিথি আপ্যায়নের ভিড়ে অনেক সময় বিড়ালের লিটার বক্স পরিষ্কারের কথা মনে থাকে না। কিন্তু নোংরা লিটার বক্স থেকে ছড়ানো দুর্গন্ধ যেমন ঘরের পরিবেশ নষ্ট করে, তেমনি বিড়ালও অস্বস্তিতে পড়ে বাইরে মলমূত্র ত্যাগ করতে পারে। তাই নিয়মিত বিরতিতে স্বাভাবিকের মতোই লিটার বক্স পরিষ্কার করতে হবে। আর সময় মতো লিটারও বদলে দিতে হবে, যাতে উৎসবের মাঝেও ঘর আর পোষা প্রাণী উভয়ই পরিচ্ছন্ন থাকে।
লিটার বক্স পরিষ্কার করে দেয়ার পর অতি আগ্রহে আবার তুতুনের মতো সেখানেই ঘুমিয়ে পরে কিনা খেয়াল রাখতে হবে। এক্ষেত্রে বয়স অনুযায়ী বিড়ালকে হালকা কুসুম গরম পানিতে ভেজা কাপড় দিয়ে মুছে অথবা 'স্যানিটাইজ' করে দেয়া যেতে পারে। ছবি: মাহফুজা মিম
ঘরের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও রাসায়নিক ব্যবহার
ঈদের আগে ও পরে ঘরে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ বাড়ে। এ সময় ব্যবহৃত জীবাণুনাশক বা সুগন্ধি জাতীয় স্প্রে বিড়ালের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। এছাড়া বিড়াল ঘ্রাণ সংবেদনশীল প্রাণী হওয়ায় এসব ব্যবহারের সময় বিড়ালকে দূরে রাখতে হবে।
স্বাস্থ্য ও আচরণ পর্যবেক্ষণ
ঈদের ব্যস্ততায় অনেক সময় বিড়ালের আচরণে পরিবর্তন চোখ এড়িয়ে যায়। খাওয়া কমে যাওয়া, বমি বা পাতলা পায়খানার মতো সমস্যা দেখা দিলে দ্রুত পশু চিকিৎসকের (ভেট) পরামর্শ নেয়া উচিত।
ভেটের কাছে নিয়মিত ফলোআপে মিকু। ছবি: মাহফুজা মিম
ঈদের ছুটিতে সময় দিতে হবে, ভালো থাকুক সঙ্গীটি
সবশেষে, ব্যস্ততার মাঝেও বিড়ালের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটানো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এতে সে স্বস্তিতে থাকে এবং মানসিক চাপ কমে। সামান্য যত্ন আর সচেতনতাই পোষা বিড়ালের ঈদকে নিরাপদ ও আনন্দময় করে তুলতে পারে।
আপনার বিল্ডিংয়ের সিঁড়িঘর বা এর আশেপাশে থাকা বিড়ালদের খেয়াল রাখতেও ভুলবেন না কিন্তু। ঈদের ছুটিতে মানুষ গ্রামের বাড়িতে যাওয়ায় কয়েকদিনের জন্য তাদের দায়িত্ব তো নেয়াই যায়। ছবি: নিজস্ব আলোকচিত্রী
ঈদ আমাদের মানুষের উৎসব। বোবা এ প্রাণীরা ঈদের আমেজ বুঝে না। তারা শুধু বোঝে আমাদের ভালোবাসা আর একটি নিরাপদ আশ্রয়। তাই আমাদের আনন্দের আতিশয্যে তারা যেন কোনোভাবেই আতঙ্কিত বা অবহেলার শিকার না হয়, সেদিকে সচেতন থাকা প্রয়োজন। আমাদের সামান্য সচেতনতা ও বাড়তি যত্নই পারে উৎসবের এমন দিনগুলোতে বোবা বন্ধুদের সুস্থ ও ফুরফুরে রাখতে। প্রাণীর প্রতি মমত্ববোধই হোক আমাদের ঈদের সার্থকতা।