মনের ভেতরের ‘আপসাইড ডাউন’: কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্য বুঝতে ‘স্ট্রেঞ্জার থিংস’

সিরিজের ভিলেন ভেকনা তাদেরই আক্রমণ করে যারা অতীতে কোনো অপরাধবোধ বা ট্রমার মধ্য দিয়ে গেছে। সে ভুক্তভোগীর কানে অনবরত তার ব্যর্থতার কথা বলতে থাকে। কিশোরদের মনেও অনেক সময় এক ধরনের আত্মসমালোচনার বিষ তৈরি হয় যা তাকে সারাক্ষণ বলতে থাকে—বা সব দোষ তোমার

নাটক, সিনেমা বা সিরিজের মতো শিল্প সাহিত্য শুধু মানুষকে কাঁদায়, হাসায় বা আনন্দই দেয় না। একটি ভালো চলচ্চিত্র দেশ ও সমাজকে পথ দেখায়, সেইসঙ্গে সমাজের তৃতীয় নয়ন খুলে দেয়। অনুভূতি-সহানুভূতির মতো আবেগকে আরো জাগ্রত করে পরস্পরকে কাছাকাছি আনে। এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ ‘স্ট্রেঞ্জার থিংস’।

জনপ্রিয় এ নেটফ্লিক্স সিরিজটি কেবল অতিপ্রাকৃত দানব বা আশির দশকের নস্টালজিয়ায় ঘেরা কোনো গল্প নয়। এটি আসলে বয়ঃসন্ধিকালের মানসিক টানাপোড়েন, ট্রমা ও একাকীত্বের প্রতিফলন। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এখনো কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলা কিছুটা ট্যাবু বা সংকোচের বিষয়। ঠিক সেই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে এ সিরিজের কাহিনীকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন অভিভাবক ও শিক্ষকরা। খুব সহজেই তরুণদের মনের জগতের খোঁজ নিতে পারেন তারা।

ভয়কে জয় করা

সিরিজে ‘আপসাইড ডাউন’ জগতটি হলো বাস্তব জগতের একটি অন্ধকার আয়না। যেখানে কেবল অন্ধকার আর নিস্তব্ধতা। এটি মূলত মানুষের মনের চেপে রাখা কষ্ট, লজ্জা ও ভয়ের প্রতিফলন। অনেক কিশোর-কিশোরী মনের ভেতরের কষ্ট কারো কাছে প্রকাশ করতে চায় না। তারা মনে করে এড়িয়ে চললে কষ্ট কমবে, কিন্তু বাস্তবে এতে মানসিক চাপ আরও বাড়ে।

আশপাশের কোনো কিশোর বয়সীকে এরকম গুটিয়ে যেতে দেখলে তাকে ‘আপসাইড ডাউন’-এর উদাহরণ দিয়ে জিজ্ঞেস করা যেতে পারে—সেও কি ভেতরে ভেতরে এমন কোনো অন্ধকার জগতের মুখোমুখি হচ্ছে? তাকে বোঝানো যেতে পারে, ভয়কে লুকিয়ে না রেখে তার মুখোমুখি হওয়াই হলো মুক্তির প্রথম ধাপ।

আত্ম-সমালোচনার দানব ‘ভেকনা’

সিরিজের ভিলেন ভেকনা তাদেরই আক্রমণ করে যারা অতীতে কোনো অপরাধবোধ বা ট্রমার মধ্য দিয়ে গেছে। সে ভুক্তভোগীর কানে অনবরত তার ব্যর্থতার কথা বলতে থাকে। কিশোরদের মনেও অনেক সময় এক ধরনের আত্মসমালোচনার বিষ তৈরি হয় যা তাকে সারাক্ষণ বলতে থাকে—বা সব দোষ তোমার।

এক্ষেত্রে মনের এ নেতিবাচক চিন্তা দূর করার দায়িত্ব বড়দের। তারা ‘স্ট্রেঞ্জার থিংস’ থেকে উদাহরণ দিয়ে বলতে পারে মনের এ নেতিবাচক ধারণাগুলো আসলে ভুল। বরং একটি 'বুলিং' বা দুষ্ট চিন্তার প্রভাব। ভেকনার মতো অদৃশ্য দানব তাকে ভয় দেখাচ্ছে।

বাস্তব জগত ও ‘গ্রাউন্ডিং’

ম্যাক্স যখন ভেকনার মরণফাঁদে আটকা পড়ে, তখন তার প্রিয় গান তাকে বাস্তবে ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে। একে মনোবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় 'সেন্সরি গ্রাউন্ডিং'। যখন কোনো কিশোর তীব্র দুশ্চিন্তা বা প্যানিক অ্যাটাকের শিকার হয়, তখন তাকে বর্তমান মুহূর্তে ফিরিয়ে আনা জরুরি। তাদের সঙ্গে বসে একটি 'ইমার্জেন্সি প্লে-লিস্ট' তৈরি করুন। তাদের শেখান যে যখনই খুব খারাপ লাগবে, তখন গান শোনা, নিজের চারপাশের পাঁচটি জিনিসের নাম বলা বা গভীর শ্বাস নেয়ার মাধ্যমে নিজেকে শান্ত করা সম্ভব।

বন্ধুত্বের রক্ষাকবচ

‘স্ট্রেঞ্জার থিংস’-এর মূল শক্তি হলো বন্ধুদের দল বা ‘দ্য পার্টি’। যখনই কেউ বিপদে পড়েছে, তার বন্ধুরা তাকে একা ফেলে যায়নি। অনেক সময় পড়াশোনার চাপে কিশোরদের সামাজিক জীবন বা বন্ধুদের সঙ্গে মেশামেশা পরিবার বা অভিভাবকদের কাছে গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে, ভালো সামাজিক সম্পর্ক মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য সবচেয়ে বড় ঢাল।

কিশোরদের ভালো বন্ধু নির্বাচনে সাহায্য করার পাশাপাশি সৃজনশীল আড্ডা বা দলগত কাজে উৎসাহিত করতে হবে। তাদের বোঝাতে হবে, একা লড়াই করার চেয়ে 'টিম' হয়ে লড়াই করা অনেক বেশি কার্যকর।

চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে

সিরিজের চরিত্র উইল যেমন দীর্ঘদিন ট্রমার মধ্যে ছিল, বাস্তবেও অনেক কিশোরের ক্ষেত্রে তেমনটা হতে পারে। যদি এ বয়সী কেউ সাধারণ কাজেও মন বসাতে না পারে, সারাক্ষণ আতঙ্কিত থাকে, দিনের পর দিন একা রাত জাগে তাহলে সেটি সাধারণ কোনো সমস্যা নাও হতে পারে। এক্ষেত্রে পেশাদার কাউন্সেলর বা থেরাপিস্টের সাহায্য নিতে দ্বিধা করা উচিৎ নয়।

দ্য কনভারসেশন অবলম্বনে

আরও