১৬ই ডিসেম্বর ১৯৭১, বিকেল চারটা একত্রিশ। রেসকোর্স ময়দানের সবুজ ঘাসে টেবিল পেতে লেখা হয় অপরাজেয় বাংলাদেশের অসামান্য দলিল। যৌথবাহিনীর কাছে পাকবাহিনীর আত্মসমর্পণের সেই মাহেন্দ্রক্ষণ নিয়ে প্রতিবেদন লিখেছিলেন অনেক বিদেশী সাংবাদিক।
স্বাধীনতা যুদ্ধে বাংলাদেশের বিজয় লাভের খবর গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করা হয় সেসময়ের আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে। উচ্ছ্বাসমাখা শিরোনাম আর পত্রিকার গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সেসব সংবাদ প্রকাশ করেছে ভারত, যুক্তরাজ্য, কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি ও মার্কিন গণমাধ্যম। এমনকি মার্কিন সরকার মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করলেও পাক বাহিনীর আত্মসমর্পন এবং বাংলাদেশের বিজয়কে মহিমান্বিত করে সংবাদ প্রকাশ করেছিল যুক্তরাষ্ট্রের ২২টি পত্রিকা।
দেশ স্বাধীনের পরদিন ভারতের সংবাদপত্রগুলোর শিরোনামজুড়ে ছিলো বাংলাদেশের বিজয়। ‘পাকিস্তান হ্যাজ স্যারের্ন্ডাড টু বাংলাদেশ’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশ করে ভারতের দ্য লিবারেশন টাইম।
‘বাংলাদেশ ফ্রিড’, ‘আনকন্ডিশনাল সারেন্ডার বাই পাক ট্রুপ’, ‘বাংলাদেশ লিবারেটেড’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশ করেছিল ভারতের ইংরেজি পত্রিকাগুলো। পাকবাহিনীর বর্বরতা আর বাঙালীর সাহসিকতার বর্ণনায় ‘রাহুমুক্ত বাংলাদেশ’ শিরোনামে প্রতিবেদন ছেপেছিল কলকাতা ভিত্তিক পত্রিকা দৈনিক যুগান্তর। এছাড়া আনন্দবাজারসহ ভারতের একাধিক বাংলাপত্রিকার প্রায় পুরোটা জুড়েই ছিলো বাংলাদেশের বিজয়ের উচ্ছাস।
১৬ই ডিসেম্বর ১৯৭১। বিবিসি বাংলা রেডিওতে প্রচারিত হয় বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের বিশেষ খবর। সিরাজুর রহমানের উপস্থাপনায় পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণ ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের সংবাদ পাঠ করেন সৈয়দ শামসুল হক। ব্রিটিশ দৈনিকগুলোতেও গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করা হয় সেই সংবাদ। ‘দ্য স্যারেন্ডার ডকুমেন্টস’, ‘টু মেন অ্যাট আ টেবিল’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছিল পাক বাহিনীর আত্মসমর্পণের সংবাদ।
বাংলাদেশের যুদ্ধে মার্কিন সরকারের সমর্থন না থাকলেও, যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ জনগণ ও সাংবাদিকদের সমর্থন ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতায়। ১৭ ডিসেম্বর ১৯৭১, বিজয়ের একদিন পর যুক্তরাষ্ট্রের ২২টি পত্রিকায় ৪৫ টি শিরোনামে ছাপা হয়েছিল বাংলাদেশের সংবাদ। তারমধ্যে সাতটি পত্রিকা প্রধান সংবাদ হিসেবে বাংলাদেশের বিজয়ের সংবাদ প্রকাশ করেছিলো। দ্য টাইমস এর মতো প্রথম সারির মার্কিন সংবাদপত্রগুলোর শিরোনামে ছিলো বাংলাদেশের বিজয়ের সংবাদ।
দ্য স্টেটসম্যান-এর শিরোনাম ছিল, ‘দ্য ওয়ার ইজ ওভার’। ভারতীয় সেনাবাহিনীর ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দিয়ে দ্য ইভনিং পোস্ট লেখে— ‘আফটার টুয়েলভ ডেইজ অব ইন্ডিয়ান অ্যাটাক নাউ ঢাকা স্যারেন্ডারস’। উইসকনসিনভিত্তিক কেনোশা নিউজ তাদের শিরোনামে লিখেছিল, ‘দেয়ার ইজ ওয়ান বাংলাদেশ নাউ’। বাংলাদেশের জন্মকথায় টেক্সাসের ব্রাউনউড বুলেটিনের শিরোনাম ছিল, ‘বাংলাদেশ ইজ আ রিয়েলিটি’।
এছাড়াও টেনেসির ডেইলি হেরাল্ড, ওয়াইওমিংয়ের ক্যাসপার স্টার-ট্রিবিউন, ক্যালিফোর্নিয়ার সান্তা মারিয়া টাইমস, ওয়াশিংটনের পোর্ট অ্যাঞ্জেলেস ইভনিং নিউজ এবং টেক্সাসের পুলিৎজার পুরস্কারপ্রাপ্ত ফোর্ট ওর্থ স্টার-টেলিগ্রাম—সব কটি আঞ্চলিক সংবাদমাধ্যমই বাংলাদেশের বিজয়ের খবর প্রকাশ করে।
পেনসিলভানিয়ার পুলিৎজারজয়ী দৈনিক দ্য ফিলাডেলফিয়া ইনকোয়ারার-এর প্রথম পাতায় জায়গা করে নেয় বাংলাদেশের বিজয়ের সংবাদ। এছাড়া ভেতরের এক পাতাজুড়ে লেখা হয়েছিল বাংলাদেশের কথা। সেদিন বাংলাদেশের বিজয় নিয়ে মোট সাতটি প্রতিবেদন ছেপেছিল পত্রিকাটি।
যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় দৈনিক দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের খবর প্রকাশ করে এভাবে— ‘ঢাকা ক্যাপচারড: গানস কুইট ইন বাংলা এরিয়া, বাট দ্য ওয়ার গোজ অন অ্যাট দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট’। ‘বাংলাদেশ ইজ বর্ন’- শিরোনামে প্রধান প্রতিবেদন প্রকাশ করে দ্য ম্যানহাটন মারকিউরি।
১৯৭১ সালের ১৭ ডিসেম্বর দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল বাংলাদেশের জন্ম নিয়ে একটি সম্পাদকীয় প্রকাশ করে। নিউইয়র্কভিত্তিক আন্তর্জাতিক এ দৈনিক প্রকাশিত সম্পাদকীয়টিতে স্বাধীন বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশা ও সংশয় প্রকাশ করে। সে প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল ‘বাংলাজ ডিম ফিউচার’।