আজ আমরা যতায়াত করি কার, বাস, রিক্সা, মোটরসাইকেলে—দ্রুত, আরামদায়ক, স্বাচ্ছন্দ্যময়। এমনি কি বাংলাদেশে মেট্রোও চলছে তিন বছর। কিন্তু ইবনে বতুতা থেকে শুরু করে জন ম্যাগনোলি, সম্রাট আকবরের বাহন কি ছিল জানেন?
পালকি, কালের চক্রে যা বিলুপ্ত। সেই সাথে বিলুপ্ত এর সাথে জড়িত পেশা মালঞ্চি, বেহারা বা পালকি বাহক। চলুন আজকে জানি বর্তমানে বাংলাদেশের অতীত ঐতিহ্যের নিদর্শন হিসেবেই পরিচিত পালকি ও তার বাহক নিয়ে।
তার আগে নতুন প্রজন্মের যারা এখনও জানে না বাংলার এই প্রাচীন বাহন সম্পর্কে তাদের বলি, বাংলা ও হিন্দিতে পালকি নামে পরিচিত এই যানকে অনেক জায়গায় ডুলি, শিবিকা ও বলা হয়। পালাঙ্কুয়িন নাম দিয়েছিল পর্তুগিজরা। পালকির উল্লেখ রয়েছে রামায়ণেও।
পালকি একটি প্রাচীন যানের নাম, যা একসময় অভিজাত শ্রেণির মানুষের যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম ছিল। ১ বা ২ যাত্রী বহনের জন্য ২, ৪ বা ৮ জন বাহক এই বাহনটি কাঁধে তুলে একস্থান থেকে অন্য স্থানে নিয়ে যেতেন।
পালকির আকার ও নকশা ছিল বৈচিত্র্যময়। সাধারণ পালকি থেকে শুরু করে আয়নাযুক্ত ও ময়ূরপঙ্খি আভিজাত্যপূর্ণ পালকি পর্যন্ত ছিল। বাহকরা নির্দিষ্ট ছন্দে পা ফেলে চলত, গাইত বিশেষ গানও। এই রীতি তারা শিখত ওস্তাদের কাছ থেকে।
এটি শুধু যাতায়াতের বাহনই নয়, একসময় বাংলায় বিয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল পালকি। পালকিকে অতীতের অ্যাম্বুলেন্সও বলা যায়, অসুস্থ রোগীও বহন করা হতো পালকি করে।
পালকি বাহকদের বলা হয় বেহারা বা কাহার। হাড়ি, মাল, দুলে, বাগদি, বাউড়ি প্রভৃতি সম্প্রদায়ের লোক পালকি বহন করে। উনিশ শতকের মাঝামাঝি দাসপ্রথা বিলোপের পর বিহার, উড়িষ্যা ও ছোটনাগপুর থেকে পালকি বাহকরা বাংলায় আসতে শুরু করেন। শুষ্ক মৌসুমে তারা এসে অস্থায়ী আবাস গড়তো আর বর্ষায় ফিরে যেত নিজেদের এলাকা ।
সতেরো ও আঠারো শতকে বাংলায় ইউরোপীয় বণিকেরা হাটে-বাজারে যাতায়াতের জন্য পালকি ব্যবহার করতেন। ভারতের গভর্নর জেনারেলও যাতায়াত করতেন পালকিতে চড়ে। এমনকি পালকি রাখত কোম্পানির সাধারণ কর্মচারীরাও। তবে ১৭৫৮ সালে কোর্ট অব ডিরেক্টরস সাধারণ কর্মচারীদের পালকি ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। কারণ পালকির ব্যয় বহন করতে গিয়ে কর্মচারীরা উপরি আয়ের নানা অবৈধ উপায় অবলম্বন করতে শুরু করে।
উনিশ শতকের প্রথমদিকে ডাক ও যাত্রী পরিবহণে চালু হয়েছিল ‘স্টেজ পালকি’। যাত্রীরা ডাকঘর থেকে স্টেজ পালকির টিকেট ক্রয় করত। মূলত সে যুগের পালকি ছিল এ যুগের রেন্ট-এ-কার বা উবার। উনিশ শতকের শেষ নাগাদ প্রচলিত ছিল এই প্রথা। সচ্ছল পরিবারের থাকত নিজস্ব পালকি যা তাদের ভৃত্যরাই বহন করত। আরপালকি ভাড়া করত সাধারণ মানুষ।
তবে উনিশ শতকের মাঝামাঝি স্টিমার, রেল ও সড়ক ব্যবস্থার উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে পালকির ব্যবহার কমতে থাকে। ইংরেজরা পালকিতে চড়া প্রায় বন্ধ করে দেয়। তবে স্থানীয় বাবু এবং অভিজাত শ্রেণির ব্যক্তিবর্গ পালকিই ব্যবহার করতেন উনিশ শতকের শেষাবধি। ১৯৩০-এর দশকে শহরাঞ্চলে রিক্সার প্রচলনই ছিল কফিনের শেষ পেরেক।
সময় বদলেছে, বাহন বদলেছ, রয়ে গেছে মানুষের যাত্রার গল্প। কখনও কাঁধে তুলে, কখনও চাকার ঘূর্ণিতে। এভাবেই কালের চক্রে হারিয়ে গেছে বাংলার একসময়ের জনপ্রিয় এক পেশা। আজ বাহন হিসেবে পালকি না থাকলেও রয়েছে আমাদের শিল্প, সাংস্কৃতি ও ঐতিহ্যে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শিলাইদহে তাঁর জমিদারি পরিদর্শনের সময় যে পালকি ব্যবহার করতেন তা আজও সংরক্ষিত রয়েছে কুঠিবাড়িতে।