ইতোকোর্তোরমিউত: পৃথিবীর প্রান্তসীমার বরফে ঢাকা বিচ্ছিন্ন জনপদ

উত্তর মেরুর কাছে অবস্থিত মাত্র ৩৭০ জন মানুষের গ্রামটিতে পৌঁছানোর একমাত্র উপায় হলো হেলিকপ্টার বা ছোট বিমান। তবে গ্রীষ্মের অল্প কিছু সময় যখন সাগরের বরফ গলে, তখন নৌকা করেও সেখানে যাওয়া যায়। গ্রামের উত্তর দিকে বিশ্বের বৃহত্তম ন্যাশনাল পার্ক আর দক্ষিণে বিশ্বের বৃহত্তম ফিয়র্ড সিস্টেম। এ দুই বিশালের মাঝখানে ছোট ছোট রঙিন ঘরগুলো যেন এক রুপকথার ছবি।

পৃথিবীর একবারে প্রান্তসীমা, যেখানে আটলান্টিক আর আর্কটিক সাগরের বরফ এসে মিশেছে—সেখানকার ছোট্ট জনপদ ইতোকোর্তোরমিউত। গ্রিনল্যান্ডের এ গ্রামটিকে বলা হয় পশ্চিম গোলার্ধের সবচেয়ে দুর্গম ও বিচ্ছিন্ন লোকালয়। বছরের নয় মাসই গ্রামটি বরফের চাদরে ঢাকা থাকে, বাইরের জগত থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। নিকটতম শহর থেকেও এর দূরত্ব ৮০০ কিলোমিটার!

ব্রিটেনের ফটোসাংবাদিক কেভিন হলের অভিজ্ঞতায় আমরা এ রহস্যময় জনপদের জীবনযাত্রা দেখব। উত্তর মেরুর কাছে অবস্থিত মাত্র ৩৭০ জন মানুষের গ্রামটিতে পৌঁছানোর একমাত্র উপায় হলো হেলিকপ্টার বা ছোট বিমান। তবে গ্রীষ্মের অল্প কিছু সময় যখন সাগরের বরফ গলে, তখন নৌকা করেও সেখানে যাওয়া যায়। গ্রামের উত্তর দিকে বিশ্বের বৃহত্তম ন্যাশনাল পার্ক আর দক্ষিণে বিশ্বের বৃহত্তম ফিয়র্ড সিস্টেম। এ দুই বিশালের মাঝখানে ছোট ছোট রঙিন ঘরগুলো যেন এক রুপকথার ছবি।

হিমশীতল অভিযান

ফটোগ্রাফার কেভিন হল যখন সেখানে পৌঁছান, তখন তাপমাত্রা ছিল হিমাঙ্কের নিচে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তিনি জানান, সেখানে টিকে থাকাটাই ছিল এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। পাঁচ দিন তাকে বরফের ওপর তাঁবুতে বা শিকারিদের ছোট কুঁড়েঘরে কাটাতে হয়েছে। যেখানে কোনো বিছানা নেই, পানি নেই, এমনকি হিটিং সিস্টেমও নেই। তীব্র তুষারঝড়ের মধ্যে বরফ ঠান্ডায় কুকুরে টানা স্লেজে চড়ে ভ্রমণ করা ছিল এক দুর্ধর্ষ অভিজ্ঞতা।

গ্রিনল্যান্ডের ইনুইট আদিবাসীদের জন্য কুকুরে টানা স্লেজ কেবল যাতায়াতের মাধ্যম নয়, এটি তাদের সংস্কৃতির অংশ। এ কুকুরগুলোকে বলা হয় ‘কিমিত’। হাজার বছর আগে সাইবেরিয়া থেকে আসা শক্তিশালী কুকুরগুলো ৪৫০ কেজির বেশি ওজন নিয়ে প্রতিদিন ২৫ কিলোমিটার বরফ পাড়ি দিতে পারে। স্লেজে চড়ে শিকার করতে যাওয়া ইনুইটদের কয়েক প্রজন্মের ঐতিহ্য।

ইতোকোর্তোরমিউতের বরফে প্রাগৈতিহাসিক যুগের ‘মাস্ক অক্স’ এর দেখা মিলবে। ৪০০ কেজি ওজনের এ বিশাল লোমশ পশুগুলো দেখতে যতটা রাজকীয়, মেজাজে ততটাই আক্রমণাত্মক। স্থানীয়দের কাছে এ পশুর মাংস এক পরম উপাদেয় খাবার। কেভিন জানান, দূর থেকে এই গয়ালসদৃশ পশুদের পাহাড়ে চড়তে দেখা এক বিরল দৃশ্য।

স্থানীয় গাইড আজে ডানিয়েলসেনের জীবনে শিকার কেবল পেশা নয়, এটি তার পরিচয়। গ্রিনল্যান্ডের আইন অনুযায়ী, শিকারিরা তাদের শিকার করা পশুর মাংস বা চামড়া বিক্রি করতে পারেন না। এগুলো কেবল নিজেদের খাবার ও পোশাকের জন্য ব্যবহার করা হয়। দানিয়েলসেনের বাবাও ছিলেন দক্ষ শিকারী। সে নিজেও বিশ্বাস করেন, তার সন্তানরাও শিকারের ঐতিহ্য ধরে রাখবে।

ইতোকোর্তোরমিউতের চারপাশের দৃশ্য যেন প্রকৃতির তুলিতে আঁকা বরফ ভাস্কর্য। সাগরের নীলচে বরফের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল সব আইসবার্গ বা হিমশৈল যেন প্রকৃতির নিজের হাতে গড়া ভাস্কর্য। আর রাতে যখন আকাশ পরিষ্কার থাকে, তখন দেখা মেলে ‘অরোরা বোরিয়ালিস’ বা উত্তর মেরুর আলোর নাচ। স্থানীয়রা একে বলে ‘আর্সারনেরিত’, স্থানীয়দের বিশ্বাস—এটি মৃত শিশুদের আত্মা, যারা ওয়ালরাস বা সিন্ধুঘোটকের মাথার খুলি দিয়ে ফুটবল খেলছে।

জীবন যেখানে থমকে আছে

পুরো গ্রামটি ঘুরে দেখতে মাত্র ৩০ মিনিট সময় লাগে। এখানে আছে একটি ছোট গির্জা, একটি পুলিশ স্টেশন, একটি সুপার মার্কেট আর একটি মাত্র গেস্টহাউস। সুপার মার্কেটে জিনিসের দাম আকাশচুম্বী, কারণ বছরে মাত্র দুবার জাহাজে করে এখানে রসদ আসে। অথচ কর্মসংস্থান নেই বললেই চলে। পড়াশোনা ও উন্নত ক্যারিয়ারের খোঁজে তরুণ প্রজন্ম এখন গ্রাম ছেড়ে শহরের দিকে চলে যাচ্ছে। ২০০৬ সাল থেকে এখানকার জনসংখ্যা প্রায় ৩৫ শতাংশ কমে গেছে।

জলবায়ু পরিবর্তন ও ভূ-রাজনীতির দ্বিমুখী সংকটের মুখে ইতোকোর্তোরমিউত। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে বরফ জমতে দেরিতে আর গলছে দ্রুত। ফলে ইনুইটদের শিকার ও যাতায়াত ব্যাহত হচ্ছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিনল্যান্ড কেনার আলোচনা শান্ত জনপদকটিকে আন্তর্জাতিক রাজনীতির কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।

আরও