টারমেসোস: আলেকজান্ডারও জয় করতে পারেনি যে নগরী

পাহাড়চূড়ায় অবস্থিত এ শহরকে ৩৩৩ খ্রিস্টপূর্বে দখল করতে এসেছিলেন আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট। কিন্তু বহু প্রচেষ্টা সত্ত্বেও তিনি সফল হননি। পরবর্তীতে তিনি শহরটিকে আখ্যা দেন ‘ঈগলের ঘাঁটি’ হিসেবে।

দক্ষিণ-পশ্চিম তুরস্কের সুউচ্চ পর্বতের চূড়ায় একসময় দাঁড়িয়ে ছিল এক শক্তিশালী নগরী—টারমেসোস। পাহাড়চূড়ায় অবস্থিত এ শহরকে ৩৩৩ খ্রিস্টপূর্বে দখল করতে এসেছিলেন আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট। কিন্তু বহু প্রচেষ্টা সত্ত্বেও নগরীর শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কারণে তিনি সফল হননি। পরবর্তীতে শহরটিকে ‘ঈগলের ঘাঁটি’ বিশেষণে আখ্যায়িত করেন আলেকজান্ডার। অজেয় সে নগরী এখন নিস্তব্ধ ধ্বংসাবশেষ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু তার নিস্তব্ধতাই জন্ম দিয়েছে এক বিস্ময়কর সৌন্দর্যের।

টারমেসোসে আজ আর কোনো মানুষ বসবাস করে না। এটি এক অসাধারণ প্রত্নতাত্ত্বিক রত্ন। এখানে ঘুরে বেড়ালে দেখা মেলে ভেঙে পড়া বিশাল সমাধি, মন্দির, দুর্গপ্রাচীর, ভূগর্ভস্থ বিশাল জলাধার, প্রাচীন বাজার ও পাথরের তৈরি এক চমৎকার থিয়েটার, যা পাহাড়চূড়ায় দাঁড়িয়ে ভূমধ্যসাগরের দিকে দৃষ্টি মেলে আছে। নির্জন পরিবেশে ভ্রমণকারীরা ইতিহাস, প্রকৃতি ও নীরবতার এক অনন্য সৌন্দর্য অনুভব করেন।

আন্টালিয়া শহর থেকে মাত্র ৪৫ মিনিট গাড়ি ভ্রমণ করলেই পৌঁছে যাওয়া যায় মাউন্ট গুল্লুক-টারমেসোস ন্যাশনাল পার্কে। এখানকার প্রবেশমূল্য মাত্র তিন ইউরো। তারপর আঁকাবাঁকা পাহাড়ি সড়ক ধরে গাড়ি চড়ে আরো ওপরে উঠতে হয়। যে জায়গাটি এখন সাধারণ পার্কিং লট, সেখানেই একসময় ছিল শহরের জমজমাট অগ্নিপর্বণ বাজার (আগোরা)। এখান থেকেই শুরু হয় টারমেসোস অভিযাত্রা।

শহরে প্রবেশের প্রথমেই চোখে পড়ে সমাধিসড়ক। সেখানে রয়েছে ধনী ও প্রভাবশালী বাসিন্দাদের সারি সারি সমাধি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দুর্বৃত্তরা প্রায় সব কবর ভেঙে ফেললেও, সমাধিফলকে খোদাই করা তরবারি, ঢাল কিংবা অন্যান্য প্রতীক এখনো অতীতের ইঙ্গিত বহন করে।

উপরে উঠতে উঠতে সামনে আসে শক্তিশালী নগরপ্রাচীর। খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ বা পঞ্চম শতকে নির্মিত এ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শহরটিকে প্রায় অজেয় করে তোলে। আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট তাই বারবার আক্রমণ করেও জয় করতে পারেননি এই ‘ঈগলের ঘাঁটি।’ পরবর্তীতে রোমানরা যুদ্ধ নয়, বরং রাজনৈতিক কৌশল ও প্রলোভনের মাধ্যমে শহরের নিয়ন্ত্রণ নেয়।

পাহাড়ি পথ ধরে আরো ওপরে উঠলে চোখে পড়ে শহরের জিমনেসিয়াম, যা ছিল সৈন্যদের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। পাশেই ছিল কুস্তি ও যুদ্ধকৌশল শেখার প্রাঙ্গণ। প্রমাণ পাওয়া যায়, টারমেসোসবাসীরা শিক্ষা, নগরজীবন ও সামরিক প্রশিক্ষণে যথেষ্ট অগ্রসর ছিল।

প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকতে টারমেসোসবাসীরা নির্মাণ করেছিল বিশাল ভূগর্ভস্থ জলাধার। পাথর কেটে বানানো এসব কক্ষ একসময় ১ হাজার ৫০০ টন পর্যন্ত পানি সংরক্ষণ করতে পারত। এর ফলে শত্রুর অবরোধ বা খরার সময়েও শহরের মানুষ টিকে থাকতে পারত।

সবশেষে পৌঁছানো যায় টারমেসোসের মহৎ থিয়েটারে। পাহাড়চূড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা এই থিয়েটার থেকে দেখা যায় চারপাশের মনোমুগ্ধকর প্রাকৃতিক দৃশ্য। প্রায় চার হাজার দর্শকের আসনবিশিষ্ট এ স্থাপনা শুধু নাট্যকলা নয়, বরং রাজনৈতিক প্রচারণারও কেন্দ্র ছিল। রোমানরা এটি ব্যবহার করত তাদের আধিপত্য দৃঢ় করতে।

২০২৫ সালে টারমেসোসে প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিক প্রত্নতাত্ত্বিক খনন শুরু হয়েছে। গবেষকরা এখন সমাধিসড়ক, হাদ্রিয়ান গেট ও প্রাচীন জলকাঠামো নিয়ে কাজ করছেন। আশা করা হচ্ছে এই খনন কাজ শহরের অজানা ইতিহাসের অনেক দিক উন্মোচন করবে।

সিএনএন অবলম্বনে

আরও