জলবায়ু সংকট মোকাবেলায় আশা জাগাচ্ছে কথাসাহিত্য

সাহিত্যের এক নতুন ধারা— ক্লাই-ফাই বা জলবায়ু কল্পকাহিনি— আমাদের সামনে তুলে ধরছে ভিন্ন এক চিত্র। ধ্বংস আর ডিস্টোপিয়ার বাইরে গিয়ে এইসব বইয়ে উঁকি দিচ্ছে আশা, মানুষ ও প্রকৃতির সহাবস্থান, আর টিকে থাকার সাহস ও শক্তি।

জলবায়ু পরিবর্তনের সংবাদে আমরা প্রায়ই হতাশ হয়ে পড়ি, শঙ্কিত হই ভবিষ্যত ভেবে। কিন্তু সাহিত্যের এক নতুন ধারা— ক্লাই-ফাই বা জলবায়ু কল্পকাহিনি— আমাদের সামনে তুলে ধরছে ভিন্ন এক চিত্র। ধ্বংস আর ডিস্টোপিয়ার বাইরে গিয়ে এইসব বইয়ে উঁকি দিচ্ছে আশা, মানুষ ও প্রকৃতির সহাবস্থান, আর টিকে থাকার সাহস ও শক্তি। এ বছর প্রথমবারের মতো ক্লাইমেট ফিকশন শাখায় কথাসাহিত্য পুরস্কার দেয়া হয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে কিছু বই পাঠককে শুধু সতর্কই করছে না, বরং বিশ্বাস করাচ্ছে-সংকট মোকাবেলায় সমাধানও আছে।

দ্য ওভারস্টোরি — রিচার্ড পাওয়ার্স

২০১৯ সালে পুলিৎজার জয়ী এ উপন্যাস প্রকৃতপক্ষে বৃক্ষলোকে এক প্রেমপত্র। অরণ্যের ছায়াঘন চাঁদোয়া মতোই ঔপন্যাসিক বুনেছেন নয়টি প্রধান চরিত্রের গল্প, যাদের জীবন গাছের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। যেমন দুর্বৃত্তদের কাটার হাত থেকে একটি বিশাল রেডউড গাছকে বাঁচাতে এক বছর ধরে গাছেই বসবাস করেন অলিভিয়া ও নিক। তাদের পরিবেশবাদী আন্দোলন অন্য চরিত্রদের সঙ্গে মেলবন্ধন ঘটায়, যদিও তার এক করুণ পরিণতি হয়। শেষ পর্যন্ত উপন্যাসটি মানুষ ও বৃক্ষের স্থিতিস্থাপকতার প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য।

গান আইল্যান্ড — অমিতাভ ঘোষ

বাঙালি কিংবদন্তি থেকে অনুপ্রাণিত ঘোষের এই বিশ্বভ্রমণ উপন্যাসে বারবার উঠে আসে পরিবেশ ধ্বংসের চিত্র: জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অভিবাসন, দাবানল, কিংবা সমুদ্রে ভেসে আসা মৃত ডলফিন। তবে এটি কোনো ডিস্টোপিয়া নয়, বরং জলবায়ু বাস্তবতা। তবু উপন্যাসটি আশাবাদী, কারণ ঘোষ আন্তঃসাংস্কৃতিক সহযোগিতার দিকটি তুলে ধরেছেন পরিবেশ সংকট মোকাবিলার উপায় হিসেবে। দুটি নারী চরিত্র — সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানী পিয়া ও ইতিহাসবিদ সিন্তা — আমাদের মনোবল জোগান। ঘোষ ২০১৯ সালে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন: ‘আমি আমার বইকে জলবায়ু কল্পসাহিত্য মনে করি না। বরং বাস্তবতা হলো কঠিন পরিস্থিতিতে মানুষ আনন্দ ও বিশ্বাস খুঁজে নেয়।’

প্যারেবল অব দ্য সোয়ার — অক্টাভিয়া ই বাটলার

বইটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৯৩ সালে। কাহিনি ২০২৪ থেকে ২০২৭ সালের ক্যালিফোর্নিয়ার প্রেক্ষাপটে রচিত, যেখানে অর্থনৈতিক ভাঙন ও জলবায়ু পরিবর্তনে অরাজক অবস্থা। বর্ণনাকারী লরেন ওলামিনা ভোগেন হাইপার-এমপ্যাথি সিনড্রোমে, অর্থাৎ অন্যের যন্ত্রণা তিনি তীব্রভাবে অনুভব করেন। তিনি প্রতিষ্ঠা করেন এক নতুন ধর্ম — আর্থসিড, যার মূল ধারণা হলো মানুষ ‘ঈশ্বরকে রূপ দিতে পারে’ ও পরিবর্তন ঘটাতে পারে। উপন্যাসজুড়ে ছড়িয়ে আছে আর্থসিডের ধর্মগ্রন্থ থেকে নেয়া শ্লোক: ‘বিশ্বাস কর্মকে সূচনা করে ও পরিচালনা করে — অথবা কিছুই করে না।’

ফ্লাইট বিহেভিয়ার — বারবারা কিংসলভার

অসুখী দাম্পত্য থেকে পালাতে ঘর ছেড়েছেন অ্যাপালাচিয়ান অঞ্চলের খামারি ডেলারোবিয়া। গন্তব্য তাঁর প্রেমিকের সঙ্গে দেখা করা। কিন্তু আচমকা থমকে দাঁড়ান — চোখের সামনে সমুদ্রের মতো বিস্তৃত কমলা রঙের রাজপ্রজাপতির ঝাঁক, যাদের পথচ্যুতি ঘটেছে জলবায়ু পরিবর্তনে। এই আবিষ্কার এলাকায় এক কীটতত্ত্ববিদকে টেনে আনে, আর তার সহায়তায় ডেলারোবিয়ার নিজের ভেতরেও ঘটে যায় এক পরিবর্তন।

এ সাম ফর দ্য ওয়াইল্ড-বিল্ট — বেকি চেম্বার্স

২০২১ সালে প্রকাশিত এই ক্ষুদ্র উপন্যাসের প্রেক্ষাপট ইউটোপিয়ান এক চাঁদ, পাঙ্গা। ধ্বংসাত্মক ‘ফ্যাক্টরি এজ’-এর পর মানবজাতি সরে এসেছে শিল্পসভ্যতা থেকে, বেছে নিয়েছে কৃষিভিত্তিক টেকসই জীবন। কাহিনির কেন্দ্রীয় চরিত্র, সন্ন্যাসী ডেক্স, ভ্রমণ করেন গ্রামেগঞ্জে, মানুষের জন্য তৈরি করেন ব্যক্তিগত পানীয় ও হয়ে ওঠেন শ্রোতা। কিন্তু অচিরেই ডেক্স নীরবতার খোঁজে রওনা হন বনে, যেখানে তার সাক্ষাৎ হয় এক রোবটের সঙ্গে — যার নাম স্প্লেন্ডিড স্পেকলড মস্ক্যাপ। রোবটটি খুঁজছে এক উত্তর: ‘মানুষের কী প্রয়োজন?’ এই স্নিগ্ধ উপন্যাস ‘হোপপাঙ্ক’ ধারার অন্তর্ভুক্ত, কারণ এতে অনুসন্ধান করা হয়েছে জীবনের অর্থ ও প্রকৃতি-প্রযুক্তির সঙ্গে মানবতার সম্পর্ক।

গার্ডিয়ান অবলম্বনে

আরও