কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়ার বিজ্ঞানীদের যৌথ সমীক্ষা

সাগরের পানিতে অক্সিজেনের মাত্রা কমছে, উধাও ‘জোম্বি ওয়ার্ম’

জোম্বি ওয়ার্ম হলো এক ধরনের হাড়ভুক কীট। মৃত তিমির হাড় ভক্ষণের মাধ্যমে জোম্বি ওয়ার্ম গভীর সাগরে এক ধরনের বাস্তুতন্ত্রের সুচনা করে। সংশ্লিষ্ট এলাকার খাদ্যজালকে টিকিয়ে রাখার পাশাপাশি গভীর সাগরে বা সাগরের তলদেশের স্বাস্থ্য নিরূপণের ক্ষেত্রে জোম্বি ওয়ার্ম গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবকের কাজ করে। বিজ্ঞানীদের মনে করছেন, প্রাণীটির অনুপস্থিতি ভবিষ্যতে আরো গভীর সংকটের ইঙ্গিতবাহী। বিশেষ করে প্রজাতির বিলুপ্তি ও দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সমুদ্রের বাস্তুতন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়ার মতো পরিস্থিতির আশঙ্কা করছেন তারা।

ভৌতিক সিনেমায় অদৃশ্য হুমকিগুলোকেই দেখানো হয় সবচেয়ে ভয়ংকর হুমকি হিসেবে। এমনই এক অদৃশ্য হুমকি অস্বস্তিতে ফেলে দিয়েছে পরিবেশ বিজ্ঞানীদের। তিমির যাতায়াত পথে ওসেড্যাক্স (Osedax) নামের এক প্রজাতির কীটের অনুপস্থিতি এখন তাদের বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে উঠেছে। প্রাথমিকভাবে পানিতে অক্সিজেনের পরিমাণ অস্বাভাবিক মাত্রায় কমে যাওয়াই ‘জোম্বি ওয়ার্ম’ নামে পরিচিত এসব কীটের অনুপস্থিতির জন্য দায়ী হিসেবে মনে করছেন তারা।

জোম্বি ওয়ার্ম হলো এক ধরনের হাড়ভুক কীট। মৃত তিমির হাড় ভক্ষণের মাধ্যমে জোম্বি ওয়ার্ম গভীর সাগরে এক ধরনের বাস্তুতন্ত্রের সুচনা করে। সংশ্লিষ্ট এলাকার খাদ্যজালকে টিকিয়ে রাখার পাশাপাশি গভীর সাগরে বা সাগরের তলদেশের স্বাস্থ্য নিরূপণের ক্ষেত্রে জোম্বি ওয়ার্ম গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবকের কাজ করে।

বিজ্ঞানীদের মনে করছেন, প্রাণীটির অনুপস্থিতি ভবিষ্যতে আরো গভীর সংকটের ইঙ্গিতবাহী। বিশেষ করে প্রজাতির বিলুপ্তি ও দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সমুদ্রের বাস্তুতন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়ার মতো পরিস্থিতির আশঙ্কা করছেন তারা।

কানাডাভিত্তিক সংস্থা ওশান নেটওয়ার্কস কানাডার (ওএনসি) জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী এবং ইউনিভার্সিটি অব ভিক্টোরিয়ার জীববিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ফাবিও দে লিওর নেতৃত্বে দেশটির ব্রিটিশ কলাম্বিয়া উপকূলে পরিচালিত এক গবেষণার ভিত্তিতে এমন পর্যবেক্ষণ দিচ্ছেন বিজ্ঞানীরা। কানাডার ব্রিটিশ কলাম্বিয়া অঙ্গরাজ্যভিত্তিক ইউনিভার্সিটি অব ভিক্টোরিয়ার পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব কুইন্সল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব হাওয়াই এবং ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া স্যান দিয়েগোর কয়েকজন বিজ্ঞানী এ গবেষণায় অংশ নেন। কানাডা ফাউন্ডেশন ফর ইনোভেশনের মেজর সায়েন্স ইনিশিয়েটিভ ফান্ড এবং যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশনের আংশিক অনুদানে এ গবেষণা পরিচালিত হয়েছে। জাতিসংঘের চতুর্দশ টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য ‘লাইফ বিলো ওয়াটারের’ সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এটি পরিচালনা করা হয়।

গবেষণার জন্য ওএনসির নেপচুন পর্যবেক্ষণব্যবস্থার অধীন বার্কলে ক্যানিয়ন মিড-ইস্ট ভিডিও ক্যামেরা প্ল্যাটফর্ম, বিভিন্ন মহাসাগরীয় সেন্সর এবং দূরনিয়ন্ত্রিত যান দিয়ে ধারণকৃত উচ্চমানের ভিডিও ব্যবহার করে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। পরীক্ষণ কার্যক্রমের জন্য গভীর সমুদ্রতলে হাম্পব্যাক তিমির হাড় স্থাপন করা হয় এবং ওই হাড়কে কেন্দ্র করে প্রাণের উপস্থিতি ও কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা হয়।

বছরের পর বছর পর্যবেক্ষণ চালিয়েও গবেষকেরা হাম্পব্যাকের হাড়ে একটিও জোম্বি ওয়ার্মের অস্তিত্ব পাননি। তিমির হাড় ভক্ষণ ও গভীর সমুদ্রের খাদ্যজাল টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে জোম্বি ওয়ার্মের ভূমিকা পরিবেশ বিজ্ঞানীদের মধ্যে বেশ সুপরিচিত।

ওসেড্যাক্স বা জোম্বি ওয়ার্ম একটি বেশ অদ্ভুত ধরনের প্রাণী। এদের মুখ, মলদ্বার বা কোনো পাচনতন্ত্র নেই। এরা মৃত তিমির হাড়ভক্ষণ করে গাছের শিকড়ের মতো এক ধরনের অঙ্গকে কাজে লাগিয়ে। এজন্য শিকড়ের মতো অঙ্গটিকে মৃত তিমির হাড়ের মধ্যে প্রবেশ করায় জোম্বি ওয়ার্ম। সেই শিকড়ের মধ্যে বসবাসকারী অণুজীব হাড় থেকে পুষ্টি আহরণ করে, যা পরে জোম্বি ওয়ার্মকে বাঁচিয়ে রাখে। এই পুষ্টি পুনর্ব্যবহার করে এবং অন্য প্রজাতির বসতি গড়ে ওঠার উপযোগী পরিবেশ তৈরি করে প্রাণীটি। এজন্য পরিবেশ বিজ্ঞানী মহলে ওসেড্যাক্স পরিচিত ‘বাস্তুতন্ত্র নির্মাতা’ বা ইকোসিস্টেম ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে।

ওএনসির হাই-রেজোলিউশন ক্যামেরার টানা ১০ বছরের ফুটেজ পর্যালোচনা করেও সাগরের তলদেশে স্থাপিত হাম্পব্যাক তিমির দেহাবশেষে জোম্বি ওয়ার্মের কোনো উপনিবেশ গড়ে ওঠার চিহ্ন পাওয়া যায়নি। প্রধান গবেষক ফাবিও দে লিও বলেন, ‘এত দীর্ঘমেয়াদি পরীক্ষায় এটি ছিল এক অসাধারণ পর্যবেক্ষণ। জোম্বি ওয়ার্মের এই অনুপস্থিতির সঙ্গে গবেষণার আওতাধীন এলাকায় সাগরের পানিতে অক্সিজেনের মাত্রা অস্বাভাবিকভাবে কমে যাওয়ার যোগসূত্র থাকতে পারে।

তিমির হাড়গুলো রাখা হয়েছিল বার্কলি ক্যানিয়নে, যা প্রশান্ত মহাসাগরের পৃষ্ঠ থেকে প্রায় এক হাজার মিটার নিচে। এলাকাটিতে স্বাভাবিকভাবেই অক্সিজেনের পরিমাণ সাগরের অন্যান্য এলাকার চেয়ে কম। এছাড়া এটি হাম্পব্যাক ও গ্রে হোয়েলের পরিযানপথের মধ্যে পড়ে।

প্রাকৃতিক কারণে কিংবা জাহাজের ধাক্কায় অথবা মাছ ধরার জালে আটকে তিমি মারা গেলে তাদের দেহ সমুদ্রতলে তলিয়ে যায়। বিষয়টিকে বলা হয় ‘হোয়েল ফল’। একটি হোয়েল ফলের ঘটনা সাগরের তলদেশে হঠাৎ করেই সেখানকার প্রাণীদের জন্য বিপুল খাদ্যের জোগান তৈরি করে। এতে মৃত তিমির দেহাবশেষকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে এক নতুন বাস্তুতন্ত্র ও সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য। তিমির পরিযানপথে অবস্থিত বার্কলি ক্যানিয়নে জোম্বি ওয়ার্মের অনুপস্থিতি এক অতিমাত্রায় অস্বাভাবিক ঘটনা। বিষয়টি থেকে উত্তর-পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরসহ বিভিন্ন অঞ্চলের সাগরের তলদেশে অক্সিজেনের মাত্রা কমে যাওয়ার কারণে বাস্তুতন্ত্র ব্যাহত হওয়ার ইঙ্গিত পাচ্ছেন বিজ্ঞানীরা।

ওএনসির আরেকটি হোয়েল ফল এলাকায় চলমান গবেষণা থেকে প্রাথমিক তথ্যেও একই ইঙ্গিত মিলেছে বলে জানিয়েছেন তারা।

বিজ্ঞানীদের ভাষ্যমতে, তিমির হাড় ভাঙার মতে সংশ্লিষ্ট এলাকায় এক ধরনের পরিবেশগত উত্তরাধিকার প্রক্রিয়া বা ইকোলজিকাল সাক্সেশন শুরু করে জোম্বি ওয়ার্ম। এক্ষেত্রে একেকটি প্রাণীর উপস্থিতি বা প্রাচুর্য খাদ্য সরবরাহ চেইনে এর ওপর নির্ভরশীল আরেকটি প্রজাতির উপস্থিতিকে নিশ্চিত করে। তিমির হাড় ভক্ষণের মধ্য দিয়ে এ প্রক্রিয়াটিকেই শুরু করে জোম্বি ওয়ার্ম। এ প্রক্রিয়ায় তিমির দেহে জমা পুষ্টি ব্যবহারের সুযোগ পায় অন্য আরো অনেক প্রাণী।

বিষয়টির ব্যাখ্যা করে ফাবিও দে লিও বলেন, ‘হোয়েল ফলগুলো সাগরের তলদেশে প্রাণবৈচিত্রে ভরপুর দ্বীপের মতোই ভূমিকা রাখে। জোম্বি ওয়ার্মের অনুপস্থিতির মধ্যে দিয়ে আমরা সম্ভবত প্রজাতিগত বিলুপ্তির কথাই বলছি।

পূর্ণবয়স্ক ওসেড্যাক্স সাধারণত তিমির হাড়েই বাস করে। এগুলোর লার্ভা আবার সমুদ্রস্রোতের মাধ্যমে বহু দূরে ভেসে গিয়ে কখনো কখনো শত শত কিলোমিটার দূরে নতুন হোয়েল ফলে বসতি গড়ে তোলে।

এসব আবাসস্থলগুলো হারিয়ে গেলে ঠিকমতো কাজ না করলে হোয়েল ফলগুলোর মধ্যে সংযোগ ভেঙে পড়বে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর ফলে পুরো অঞ্চলে ওসেড্যাক্স প্রজাতির বৈচিত্র্য কমে যেতে পারে।

শুধু তিমির হাড় নয়, অনেক ক্ষেত্রে ডুবে যাওয়া কাঠের জাহাজ বা স্তুপও এমন স্বতন্ত্র বাস্তুতন্ত্র গড়ে তোলে। বিজ্ঞানীরা বার্কলি ক্যানিয়নেই ডুবিয়ে রাখা কাঠের নমুনায় কাঠ-খাদক জাইলোফাগা (Xylophaga) প্রজাতীর উপস্থিতি পেয়েছেন ঠিকই, তবে সাগরের তলদেশের অন্যান্য অক্সিজেনসমৃদ্ধ এলাকার তুলনায় এগুলোর উপনিবেশ গড়ে ওঠার মাত্রা ছিল বেশ ক্ষীণ ও ধীরগতির।

এই ধীরগতির উপনিবেশ গঠন কার্বন ভাঙনের প্রক্রিয়া বিলম্বিত করতে পারে এবং জাইলোফাগার গর্তে বসবাসকারী অন্যান্য বহু প্রজাতির আবাসস্থল নির্মাণের সুযোগও কমিয়ে দিতে পারে।

গবেষণায় সহনেতৃত্বের ভূমিকায় ছিলেন ইউনিভার্সিটি অব হাওয়াইয়ের প্রফেসর এমেরিটাস ক্রেগ স্মিথ। তিনি বলেন, উষ্ণায়নের ফলে সাগরের তলদেশে অক্সিজেন ঘাটতিপূর্ণ এলাকা বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি উত্তর-পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলে এসব হোয়েল ফল ও উড ফল বাস্তুতন্ত্রগুলোর জন্য বেশ খারাপ খবর।’

আরও