বেশি দামে টি-শার্ট কিনে দায়মুক্তি ‘কতটা নৈতিক’?

ফ্যাশন রেটিং প্লাটফর্ম গুড অন ইউ-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা গর্ডন রেনফ জানান, তাদের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দাম কখনোই নৈতিক উৎপাদনের নির্ভরযোগ্য সূচক নয়। অনেক বিলাসবহুল ব্র্যান্ড উচ্চমূল্য রাখলেও শ্রমিকদের যথাযথ সুবিধা বা পরিবেশগত দায়িত্ব নিশ্চিত করার প্রমাণ দেখাতে পারে না

আধুনিক আউটফিটে টি-শার্ট বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ পোশাক হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। তবে এক-একটি টি-শার্ট তৈরিতে যে পরিমাণ শ্রম বা পরিবেশের ওপর প্রভাব পড়ে, তা ভোক্তার ওপর এক ধরনের নৈতিক চাপ তৈরি করে। অনেক সময় বেশি দামের সঙ্গে ভোক্তাদের দায়িত্বশীলতা মিলিয়ে দেখা হয়। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দাম বেশি হলেই ভালো মানের কাপড়, শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি বা পরিবেশবান্ধব উৎপাদনের নিশ্চয়তা দেয়— এমন ধারণার বাস্তবতা নয়।

ফ্যাশন বিশেষজ্ঞদের মতে, নৈতিকভাবে তৈরি পোশাক কিনতে হলে শুধু দামের দিকে তাকালেই হবে না। বরং এর পেছনের উৎপাদন-ব্যবস্থাকে আরো গভীরভাবে বুঝতে হবে।

ফ্যাশন শিল্পে সরবরাহ চেইন ও শ্রমনীতি নিয়ে গবেষণা করছেন এমন বিশেষজ্ঞরা প্রায় একমত, ‘অর্থ দিলেই বিবেকের দায়মুক্তি কেনা যায়’—এটি একটি ভ্রান্ত ধারণা।

দাম কি সত্যিই নৈতিকতার নির্দেশক?

ফ্যাশন রেটিং প্লাটফর্ম গুড অন ইউ-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা গর্ডন রেনফ জানান, তাদের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দাম কখনোই নৈতিক উৎপাদনের নির্ভরযোগ্য সূচক নয়। অনেক বিলাসবহুল ব্র্যান্ড উচ্চমূল্য রাখলেও শ্রমিকদের যথাযথ সুবিধা বা পরিবেশগত দায়িত্ব নিশ্চিত করার প্রমাণ দেখাতে পারে না।

লিডস বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্যাশন ডিজাইন বিশেষজ্ঞ এলিনর স্কটের মতে, একটি পণ্যের উচ্চমূল্যের পেছনে অনেক সময় ব্র্যান্ডিং, মার্কেটিং ও খুচরা বিক্রেতার মুনাফার অংশ থাকে—কিন্তু তা শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি বা পরিবেশবান্ধব উৎপাদনে প্রতিফলিত নাও হতে পারে।

এমনকি গবেষণায় দেখা গেছে, টি-শার্টের দাম এবং তার স্থায়িত্বের মধ্যে সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই। পরীক্ষিত শীর্ষ ১০টি টি-শার্টের মধ্যে ছয়টির দাম ছিল ১৫ পাউন্ডের নিচে, যা অনেক দামি পণ্যের তুলনায়ও ভালো পারফর্ম করেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নৈতিক ফ্যাশনের মূল সমস্যা হলো আসল খরচ কোথায় যাচ্ছে তা বোঝা। অনেক সময় সস্তা পোশাকের ক্ষেত্রে এ খরচ শ্রমিকদের বেতন ও পরিবেশের ক্ষতির মাধ্যমে ‘লুকানো’ থাকে

খুব সস্তা পণ্য কি নিরাপদ?

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দেন, এর মানে এই নয় যে সবচেয়ে সস্তা টি-শার্ট কিনলেই সমস্যা নেই। বরং একটি নির্দিষ্ট দামের নিচে গেলে নৈতিক উৎপাদন প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

গর্ডন রেনফের মতে, খুব কম দামের টি-শার্ট সাধারণত ন্যায্য মজুরি এবং পরিবেশগত দায়িত্বের খরচ বহন করতে পারে না। বিশেষ করে ৩ বা ৫ পাউন্ডের টি-শার্টগুলোয় শ্রমিকদের ন্যায্য আয় নিশ্চিত করা প্রায় অসম্ভব।

বেটার কটন ইনিশিয়েটিভের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এলি গ্যাফনি বলেন, একটি পণ্যের ন্যূনতম নৈতিক উৎপাদনমূল্য নির্ধারণ করা কঠিন। কারণ বড় কোম্পানির ক্রয়ক্ষমতা ও উৎপাদন কাঠামো ভিন্ন হয়।

তার মতে, যদি দাম অস্বাভাবিকভাবে কম মনে হয়, তাহলে সেটি সন্দেহজনক হওয়াই স্বাভাবিক।

সাশ্রয়ী দামে নৈতিক ব্র্যান্ড কি আছে?

সব নৈতিক পণ্যই যে অতিমূল্যের, তা নয়। কিছু ব্র্যান্ড তুলনামূলক কম দামে নৈতিক উৎপাদনের চেষ্টা করছে।

উদাহরণ হিসেবে যুক্তরাজ্যের ব্র্যান্ড ইয়েস ফ্রেন্ডসের কথা বলা যায়, যাদের টি-শার্টের দাম প্রায় ১২ পাউন্ড থেকে শুরু। তারা বড় আকারের উৎপাদন, কম প্রফিট মার্জিন এবং সরাসরি বিক্রির মাধ্যমে দাম নিয়ন্ত্রণে রাখে।

সত্যিকারের খরচ কোথায়?

বিশেষজ্ঞদের মতে, নৈতিক ফ্যাশনের মূল সমস্যা হলো আসল খরচ কোথায় যাচ্ছে তা বোঝা। অনেক সময় সস্তা পোশাকের ক্ষেত্রে এ খরচ শ্রমিকদের বেতন ও পরিবেশের ক্ষতির মাধ্যমে ‘লুকানো’ থাকে।

একই সঙ্গে দেখা গেছে, কিছু তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী ব্র্যান্ড উচ্চ-রেটেড নৈতিক ব্র্যান্ডগুলোর চেয়েও ভালো স্কোর অর্জন করতে পারে, যা প্রমাণ করে যে দাম সবসময় মানদণ্ড নয়।

কীভাবে বুঝবেন কোনটি ভালো নির্বাচন?

বিশেষজ্ঞদের মতে, কিছু নির্দেশক বিবেচনা করা যেতে পারে। অতিরিক্ত সস্তা দাম হলে সতর্ক হওয়া, ব্র্যান্ডের উৎপাদন নীতি যাচাই, জৈব বা সার্টিফাইড কটন ব্যবহার হচ্ছে কি না দেখা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—দীর্ঘস্থায়ী ব্যবহারের উপযোগিতা।

ব্যবহৃত পোশাক: সবচেয়ে নিরাপদ বিকল্প?

গবেষকদের মতে, সবচেয়ে কার্যকর এবং পরিবেশবান্ধব উপায়গুলোর একটি হলো সেকেন্ডহ্যান্ড বা ব্যবহৃত পোশাক কেনা। এতে নতুন উৎপাদনের চাহিদা কমে যায়, ফলে পরিবেশ ও শ্রমিক—উভয়ের ওপর চাপ হ্রাস পায়। পাশাপাশি এটি সাধারণত বেশি সাশ্রয়ীও।

দ্য গার্ডিয়ান অবলম্বনে

আরও